মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পরীক্ষা, ফলাফল আর আত্মহননের গ্লানি

আপডেট : ১২ মে ২০২৪, ০৫:২৯ পিএম

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে লেখাটা শুরুর আগেই জানতে পারলাম সৈয়দপুরে এক পরীক্ষার্থী আশানুরূপ ফলাফল না হওয়ায় আত্মহত্যা করেছে। মনটা তীব্র বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। যদিও আমাদের সময়ে শোকের আয়ু কেবল এক ইস্যু থেকে আরেক ইস্যু, তবুও এইরকম নির্মম একটা ঘটনা এখনো আমাদের হতবিহ্বল করে দেয়। অপরাধী করে, এক প্রবল হাহাকারের শূন্যতায় ভরিয়ে তোলে।

পড়াশোনা, জ্ঞানবুদ্ধি ইত্যাদির যদি একটা উদ্দেশ্য বলতে হয়, তবে তা হচ্ছে অন্য মানুষের প্রতি, প্রাণের প্রতি, প্রকৃতির প্রতি  মমত্ববোধ। এই উপমহাদেশের অন্যতম পণ্ডিত, সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ নামক জ্ঞানের এক দুর্দান্ত শাখার অগ্রণী রণজিৎ গুহ তার শতবর্ষীয় জীবন অবসানের কিছুদিন আগে এক লেখায় ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন। সকল যুক্তি, সকল প্রজ্ঞা আর জ্ঞানের আলাপ শেষ করে যেই মূল কথাটি থাকে, তা হচ্ছে তোমার কি মায়া লাগে না?

আশঙ্কা হয়, সৈয়দপুরের সেই শিশুটির মতো আরো অনেকেই হয়তো আজকের দিনে পরীক্ষা ফলাফলের চাপে এই নিদারুণ কাজটি করে বসতে পারে। বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো কি ভাবে যখন তারা গলায় দড়ি দেয়, বিষ খায় কিংবা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় জীবনকে বিদায় জানায়? কতোটা অভিমান, কতোটা গ্লানি ওদের ছোট্ট বুকে ভর করে? অতোটা ভার কি এই পুরো দুনিয়া বইতে পারে?

মহাদার্শনিক নীটশে এক বেতো ঘোড়ার দূর্দশা দেখে নিজেদের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। উবারমানস বা অতিমানব দর্শনের এই ‘নিষ্ঠুর’ মানুষটিও যখন নিজের সূক্ষ বিবেকবোধের মুখোমুখি হন, এক প্রলয় ঘটে যায়। সৌভাগ্য যে মানুষ সেই অবর্ণনীয় বিপর্যয়ও কাটিয়ে উঠতে পারে।

আমরাও এই শিশুটির আত্মহননের প্রবল অপরাধবোধ আর গ্লানি হয়তো কাটিয়ে উঠব। তবে সেই কাটিয়ে উঠতে গিয়ে যাতে ভুলে না যাই এই কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি। 

পরীক্ষায় পাস না করা কোনো ঘটনা না। রবীন্দ্রনাথ স্কুল পালাতেন, নজরুল স্কুলে পড়েননি, বিল গেটস বা মার্ক জুকারবার্গ ড্রপ আউট এই ধরনের ছেঁদো মোটিভেশনাল আলাপ থেকেও সতর্ক থাকা জরুরি। আমাদের যে সমাজব্যবস্থা তাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী আর তাদের লালনকারী রাজনীতিবিদরা সবচেয়ে উঁচুস্থানে থাকলেও নায়ক, গায়ক, খেলোয়াড় কিংবা কোটি কোটি টাকা কামানো ইউটিবাররা সাফল্যর ঝলকে তারকা হলেও মনে রাখতে হবে লেখাপড়ায় ভালো করাই উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে উঠার সবচেয়ে নিরাপদ তরিকা।

যখন থেকে লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার হলো, তখন থেকেই লেখাপড়া জানা লোকদের চাকরি বাকরির উপায় বের হয়। লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে এই বাক্যটা ভীষণরকম সমস্যাজনক হলেও লেখাপড়া সামাজিক নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করার বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা উপাদান।
 
ফলে শিশুদের লেখাপড়া বিমুখ করে তোলা অত্যন্ত বালখিল্য একটি আচরণ। আমাদের শিক্ষ্যব্যবস্থার ত্রুটির কারণে শিশুরা এর শিকার, কিংবা প্রমথ চৌধুরী ফরাসি এক মনীষীর উদাহরণে যেমনটা বলেছিলেন, ফ্রান্স তার ফাঁকিবাজদের কারণেই রক্ষা পেয়েছিল;  এই কথাগুলো অসত্য নয়। কিন্তু সেগুলো ঠিক করার জন্যও দেশের ভবিষ্যত নাগরিকদের শিক্ষা অর্জন জরুরি। কাঠামোগতভাবেও ভালো ফলাফল করা তাদের সাহায্য করবে এমন জায়গায় পৌঁছতে যেখানে এইসব অসংগতি তারা দূর করতে পারবে। সর্বোপরি, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ভালো নয় ফলে পড়ালেখা বন্ধ করে দিতে হবে, ফলাফলের মূল্য নাই এই আলাপগুলোও অত্যন্ত অর্বাচীন।

শিশুদের একই সাথে বোঝাতে হবে জীবন অনেক বড়। হাজার মাইলের দৌড়ের রেসের মতো, এতে প্রথম ধাপে অনেকটা পিছিয়ে পড়াই সব শেষ কথা না। আর ভালো ফলাফল বনাম প্রকৃত শিক্ষা নিয়ে যে যুগ যুগ ধরে অজস্র বিতর্ক চলছে সেগুলো তো আছেই। কিন্তু সব ছাপিয়ে আমাদের মাথায় রাখতে হবে, আমরা যাতে আমাদের মমত্ববোধ হারায়ে না ফেলি। এতটা ভয়ঙ্কর না হয়ে উঠি যাতে শিশুরা জীবন শুরুর আগেই একে শেষ করার মতো সিদ্ধান্ত নেয়ার চিন্তা করে।

 
ফলাফলের দৌড়ে এগিয়ে থাকা জরুরি। কিন্তু যারা পিছিয়ে আছে তাদের যত্ন নেয়াটা মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। নৃতাত্ত্বিক মার্গারেট মিডের এক ছাত্র তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, মানুষের সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য কি? তিনি একটা ফসিলের হাড়ে থাকা বড়সড় চিড় দেখিয়ে বলেছিলেন- এটা।

সেই হাড়টা যার ছিল তিনি বড়সড় কোনো আঘাত পেয়ে নিশ্চিতভাবেই চলৎশক্তি হারিয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেই আঘাতের পরেও তিনি বহুদিন বেঁচে ছিলেন? কিভাবে? আদিম মানুষের প্রচণ্ড কষ্টকর দুনিয়াতেও তার আপনজনেরা আমৃত্যু তাকে বইয়ে বেড়িয়েছিল। তাকে স্নেহভরে খেতে দিত, সেবা করত, হিংস্র পশুদের হাত থেকে রক্ষা করত। এই মমত্ববোধ, এই যূথবদ্ধ মায়া, আমাদের সবচাইতে দুর্বল আপনজনদের রক্ষা করাই আমাদের সবচেয়ে বড় গৌরবের জায়গা। আমাদের সম্মিলিত চাপে যখন একটা শিশু আত্মহনন করে তখন সেই গৌরবে ভীষণ একটা ধাক্কা খায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত