চিকিৎসকরা উচ্চ রক্তচাপকে নীরব ঘাতক হিসেবে অভিহিত করেন। উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদরোগ, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, কিডনি জনিত সমস্যার মতো জটিল সব রোগ দেখা দিচ্ছে মানুষের। দিনের পর দিন উচ্চ রক্তচাপ জনিত সমস্যায় ভুগলেও আক্রান্ত ব্যক্তি তা জানেন না। যখন রক্তচাপের ফলে ডায়াবেটিস, স্ট্রোকের মতো রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় তখন দেখা যায় আক্রান্ত ব্যক্তির দীর্ঘদিন ধরে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিলেন।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন ৪ কোটি মানুষ। দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ধরা হলে প্রতি ৪ জনের ১ জন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। আমাদের দেশের পরিবারের আকার বিবেচনা করলে গড় সদস্য সংখ্যা ৪ জনের বেশি। সে হিসেবে দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপের রোগী।
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার জুনাইদ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার ছোট চাচা সকাল বেলা হঠাৎ করে বাড়িতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যান। তাকে প্রথমে সদর হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নেওয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। চিকিৎসকরা জানান তার রক্তচাপ দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত ছিল, ফলে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। চাচা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন এটা আমরা জানতাম, কিন্তু মাঝেমধ্যে তিনি ওষুধ খেলেও বেশীরভাগ সময়ই ওষুধ বন্ধ রাখতেন।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই কোনো ওষুধ সেবন করে না। তবে বাস্তবে এর চেয়েও বেশী মানুষ ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকেন বা মাঝেমধ্যে বন্ধ রাখেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের মধ্যে বাংলাদেশে মাত্র ৩৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নেন। নিয়মিত ওষুধ না খাওয়ার কারণে ৮৫ শতাংশেরই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই।
এমন বাস্তবতায় আজ শুক্রবার দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস-২০২৪। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সঠিকভাবে রক্তচাপ মাপুন, নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং দীর্ঘজীবী হোন’। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা, বিনামূল্যে রক্তচাপ নির্ণয় ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।
আমাদের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটেছে। ফাস্টফুড ও বিভিন্ন ধরনের পানীয়র ওপর তরুণ প্রজন্মের নির্ভরতা বাড়ছে। অথচ এসব খাবারে মাত্রাতিরিক্ত লবণ ব্যবহার করা হয়। খাবারে বাড়তি লবণ উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের বাজারে বিক্রি হওয়া পটেটো, চানাচুর ও ফাস্টফুড জাতীয় খাবারে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ লবণ ব্যবহার করা হয়।
এদিকে দেশের শহরাঞ্চলে ফাঁকা জায়গা কমছে, হাঁটাহাঁটির পর্যাপ্ত জায়গা না থাকার কারণে মানুষ ঘরে বেশী সময় কাটাচ্ছে। অথচ নিয়মিত হাঁটাহাঁটি ও শরীরচর্চার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপসহ নানা অসুখ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
শুধু বয়স্কদের উচ্চ রক্তচাপ হয় মানুষের মধ্যে এমন বড্ডমূল ধারণা থাকলেও চিকিৎসকরা বলছেন যেকোনো বয়সেই উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বয়স হলে রক্তচাপ একটু বেশিই থাকে, এ জন্য চিন্তার কিছু নেই, এমন ধারণাও সঠিক নয়। উচ্চ রক্তচাপ যে বয়সেই ধরা পড়ুক চিকিৎসা নিতে হবে। উচ্চ রক্তচাপের বংশগত ধারাবাহিকতা আছে, যদি বাবা-মায়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকে তবে সন্তানেরও উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি নিকটাত্মীয়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও অন্যদের রক্তচাপের ঝুঁকি থাকে।
এছাড়াও অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, ধুমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার খেলে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। অধিক ওজন এবং অলস জীবনযাত্রা, খেলাধুলা, ব্যায়াম বা কায়িক শ্রমের অভাবে অল্প বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা বাড়ছে।
ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপের কোন প্রাথমিক লক্ষ্মণ দেখা যায় না। এটাই উচ্চ রক্তচাপের সবচাইতে খারাপ দিক। নিয়ন্ত্রণ করা না হলে উচ্চ রক্তচাপ ভয়ংকর পরিনতি ডেকে আনতে পারে। যদিও অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপের রোগীর বেলায় কোন লক্ষ্মণ থাকে না, তবুও নীরবে উচ্চ রক্তচাপ শরীরের বিভিন্ন অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ জন্যই উচ্চ রক্তচাপ কে বলা হয় নীরব ঘাতক। অনিয়ন্ত্রিত এবং চিকিৎসাবিহীন উচ্চ রক্তচাপ থেকে মারাত্মক শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত না থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ ৪টি অঙ্গে মারাত্মক ধরনের জটিলতা হতে পারে। যেমন- হৃৎপিণ্ড, কিডনি, মস্তিষ্ক ও চোখ।
তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃদযন্ত্রের মাংসপেশি দুর্বল হয়ে হৃদযন্ত্র রক্ত পাম্প করতে পারে না এবং এই অবস্থাকে বলা হয় হার্ট ফেইলিওর। রক্তনালি সংকুচিত হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি বিকল হয়ে কার্যকারিতা হারাতে পারে। এছাড়া মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক হয়ে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে এবং চোখের রেটিনাতে রক্তক্ষরণ হয়ে অন্ধত্ব বরণ করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি এবং বড় ধরনের জটিলতা এড়াতেই ওষুধ দেওয়া হয়।
প্রখ্যাত কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাক্তার সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিডনি সমস্যা নিয়ে যেসব রোগী আমার কাছে চিকিৎসা নিতে আসেন তাদের একটা বড় অংশ খাবারে মাত্রাতিরিক্ত লবণ খান। কেবলমাত্র পরিমিত লবণ খাওয়া ও ফাস্টফুড জাতীয় খাবার বর্জন করা গেলে দেশের কিডনি রোগীর সংখ্যা অনেক কমে আসত।
