বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

এভারেস্ট বিজয় কতটা গৌরবের?

আপডেট : ১৯ মে ২০২৪, ০৮:১২ পিএম

সত্যজিৎ রায় তার ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ সিনেমায় নায়কের বয়ানে প্রশ্ন তুলেছিলেন, চাঁদে যাওয়া বেশি জরুরি নাকি ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিরোধ? কোনটা মানবসভ্যতার জন্য আবশ্যক? সসীম সম্পদের দুনিয়ায় লাখো ক্ষুধার্ত মানুষের বদলে মহাকাশ গমনের প্রযুক্তি কি আদৌ জরুরি? এই প্রশ্ন তুলেছেন বহু মনীষী। কটাক্ষ করে গান বেধেছেন নাগরিক কবিয়াল কবির সুমন। 

অবশ্য সভ্যতার ইতিহাস খুব আলোকিত কিছু না। আজকের দিনে পশ্চিমা দুনিয়া এত উন্নত হলো, বাকি সবাইকে শাসন করছে এর প্রধান কারণ সামষ্টিক সহিংসতা। যেই সহিংসতার জোরে কলম্বাস লাখো লাখো মেসোআমেরিকানদের মেরেছিলেন, আর মায়া আজটেকদের মতো পুরনো ও সমৃদ্ধ সভ্যতা যে অঞ্চলে ছিল তাকে ইউরোপ বহুবছর আখ্যা দিত ‘নতুন দুনিয়া’ আবিষ্কার হিসেবে।

ওপরের কথাগুলো মাথায় আসলো বাংলাদেশের আরো একজন উদ্যমী তরুণ এভারেস্টের শীর্ষে আরোহণ করার পর এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমের উচ্ছ্বাসে। বারবার বলা হচ্ছে আমাদের একজন তরুণ এভারেস্ট ‘জয়’ করার গৌরব অর্জন করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে ওঠাটা কতটা গৌরবের। এই অর্জনের সঙ্গে জাতিগত গৌরবের সম্পর্ক কতটা?

আমাদের ভাবনা এখন কলম্বাসদের মতো খুনেদের থেকে অনেকদূর এগিয়েছে। শক্তির জোরে প্রকৃতি কিংবা জনমানুষকে দখল করা কোনো  গৌরব না তা আমরা বুঝতে পারি। মানুষের বেপরোয়া আচরণে পাহাড় থেকে সমুদ্র, মাছ থেকে পাখি পর্যন্ত সবাই ভীষণ হুমকির মুখে আছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। 

মানুষের ক্ষমতার সীমা নেই। একদা মানুষ ভেলায় চেপে মহাসাগর পার হত। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ নামে যে ভুখণ্ড আমরা চিনি তা এইসব সাহসী মানুষদের কল্যাণেই প্রথম মানুষের স্পর্শ পায়। পৃথিবীর এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে মানুষের পা পড়েনি। আমাদের রক্তে অ্যাডভেঞ্চারের নেশা। এই নেশা মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে পৃথক করেছে। কিন্তু একইসাথে আমরা এ-ও শিখেছি যে প্রকৃতি ‘জয়’ করার ব্যাপার না। আমাদের একটাই দুনিয়া, সেই দুনিয়াকে রক্ষা করতে হলে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে চলাটা শিখতে হবে। আমাদের প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করা শিখতে হবে। শিখতে হবে মানুষের বিপুল সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখা। আমাজনের জঙ্গল হোক কিংবা নেপালের দুর্গম পাহাড়, সেইসব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রক্ষা করতে হবে। সেসব অঞ্চলে লাখো বছর ধরে যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যারা প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করার কৌশল শিখেছে, তাদের সুরক্ষা করতে হবে।

এখানেই চলে আসে এভারেস্টের প্রশ্ন। তেনজিং নোরগেরা যখন এভারেস্টের চূড়ায় উঠেছিলেন তা ছিল মানুষের রেকর্ডেড ইতিহাসের প্রথম চূড়ায় উঠা। নানা রেকর্ডের নেশায় মত্ত মানুষের কাছে তখন তা ছিল এক বিশাল ব্যাপার। মানুষের ক্ষমতা যে অসীম, অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ এই গৌরবে বুঁদ হয়েছিলেন। এরপর থেকে প্রতিযোগিতা চলে নানা দেশের পতাকা সেখানে স্থাপন করার।

এরপর প্রযুক্তির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। হাজারে হাজারে মানুষ সেখানে উঠেছেন। প্রথম নারী, প্রথম শারীরিক প্রতিবন্ধী, প্রথম দৃষ্টিহীন মানুষ, প্রথম অপ্রাপ্ত বয়স্ক ইত্যাদি অগণিত রেকর্ড হয়েছে। এভারেস্টে উঠা ডালভাত না হলেও বহুসংখ্যাক মানুষ উঠেছেন। এর ধারায়, বহু পরে হলেও প্রথম বাংলাদেশির রেকর্ডও হয়ে গেছে। রেকর্ডের এই উদ্দাম নেশা খুবই উত্তেজক হলেও সব নেশাই যে ভালো নয় তা বলাই বাহুল্য। 

এরচেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে এভারেস্টে ওঠার নেশায় এই পর্বতে যে নিদারুণ দৃশ্য তৈরি হয়েছে। প্রতিবছর এভারেস্টে উঠার সময় বা নেমে আসার সময় বিপুল সংখ্যাক আরোহী মারা যান। এভারেস্টের বরফেই তাদের দেহ পড়ে থাকে। বিপুল ঠাণ্ডায় সেই দেহগুলোতে পচন ধরে না। বিদেশি এক সংবাদমাধ্যম একদা তাই এভারেস্টকে বলেছিল পৃথিবীর উচ্চতম গোরস্থান। আরোহীরা এই গোরস্থান বেয়েই উঠে চলেন অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়।

নেপাল সরকার অবশ্য এভারেস্টে উঠার ব্যাপারে অনেক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। নানারকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এখন এভারেস্টে উঠা যায় না। এজন্য আরোহীদের নেপাল সরকারকে প্রচুর অর্থ দিতে হয়। সে দেশের কোষাগারের জন্য এই অর্থ জরুরি। অবশ্য এর বিনিময়ে প্রচুর শেরপাকে মরতে হয়। কিন্তু গরীব, প্রান্তিক মানুষদের জন্য তো রমরমা ব্যবসা বন্ধ করার চিন্তাও করা যায় না। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো সচরাচর করেও না। এর ফলে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে এভারেস্ট ‘জয়ের’ নেশা বাড়ছেই। মানুষের যে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি তাতে এই নেশা থামানো মুশকিল। 

সত্যি বলতে, যারা ভীষণ ঝুকি নিয়ে পর্বতে চড়েন তারা দারুণ মানুষ। বিপুল পরিমাণ মানসিক জোর ও আত্মবিশ্বাস না থাকলে এই কাজটি করা কঠিন। ফলে আমাদের তরুণ বাবর আলী যে উদাহরনটি স্থাপন করলেন, সে কারণে তার সাহস ও প্রতিজ্ঞাকে স্যালুট করতেই হবে। কিন্তু বাবর আলীর মতো অসাধারণ মানুষদের এই উদাহরণ তরুণদের যদি উদ্দীপ্ত করে, তা কি খুব ভালো কিছু কিনা এ নিয়েই প্রশ্ন। কেবল আত্মশ্লাঘার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয়ে প্রায় মৃত্যুর ঝুঁকি নেয়া ঠিক কিনা তাই প্রশ্ন। এমনকি আমাদের দেশেও আমরা দেখি দুর্গম পাহাড়ে উঠার নেশায় মত্ত কিছু মানুষ। তাদের এই সাহসকে শ্রদ্ধা। একইসাথে এই নেশা পাহাড়ে কিংবা প্রাকৃতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় হাজারে হাজারে মানুষের যাওয়ার ঢল, এইসব স্থানের স্বাভাবিকত্ব বিনষ্ট করার হুমকিও নিয়ে আসে।

পাহাড়ি জনগণের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্লাস্টিকের প্যাকেট ফেলে আসা, উদ্দাম মদ্যপান আর নারীসঙ্গকেই অনেক শহুরে ‘ফ্যাশন’, ‘এক্সোটিক টুরিজম’ বলে ভাবে। আধুনিক যুগে, প্রাণ প্রকৃতি আর বৈচিত্র্য রক্ষার তাগিদে এ ধরনের পর্যটনও সীমিত করা জরুরি।
 
এভারেস্টের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে আরোহণ একজন ব্যক্তির জীবনে দারুণ একটা অর্জন বলে বিবেচিত হতে পারে, কিন্তু একে জাতীয় অর্জন বলে লাখো লাখো তরুণকে উদ্দীপ্ত করাটা প্রশ্নবোধক। আমাদের অসীম সাহসী বাবর আলীরা প্রশ্নহীনভাবে জাতীয় গৌরব হয়ে উঠুন এইটাই কাম্য।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত