সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ইরানের বিমান মান্ধাতা আমলের, বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটি ষাটের দশকের

আপডেট : ২০ মে ২০২৪, ০১:৩৪ পিএম

গতকাল রোববার হেলিকপ্টার বিধ্বস্তে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দোল্লাহিয়ান, পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের গভর্নর মালেক রহমাতিসহ হেলিকপ্টারে থাকা সবাই নিহত হয়েছেন।

হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের পেছনে খারাপ আবহাওয়াই ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। মেঘ, ঘন কুয়াশা এবং কম তাপমাত্রাই হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলছেন বিমান বিশেষজ্ঞরা।

তবে খারাপ আবহাওয়ার পাশাপাশি আলোচনায় উঠে এসেছে ইরানের বিমান খাত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি বলছে, ইরানের বিমান খাত ও এর নিরাপত্তার রেকর্ড খারাপ। কারণ কয়েক দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বর্তমান সময়েও অন্যান্য দেশের তুলনায় দুর্বল রয়ে গেছে ইরানের এ খাতটি।

প্রেসিডেন্টকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি বেল-২১২ মডেলের বলে জানা গেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। তবে বিধ্বস্ত হওয়া হেলিকপ্টারটি ছিল ষাটের দশকের। সামরিক বিশ্লেষক সেড্রিক লেইটনের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের কাছে এমন কোনো হেলিকপ্টার বিক্রি করেনি যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া এই নিষেধাজ্ঞার কারণে নিজেদের বিমান বহরকেও উন্নত করতে পারেনি ইরান।

ইরানের গণমাধ্যম বলছে, ১৯৯০ এর দশক থেকে বেসামরিক বিমানের সংকটে ভুগছে ইরান। নিষেধাজ্ঞার কারণে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে নতুন বিমান বা খুচরা যন্ত্রাংশ কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে দেশটিতে।

মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে পুরানো বিমান লিজ বা খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে থাকে দেশটি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ইরানের বিমান বহরের প্রযুক্তিগত অবস্থা ক্রমাগত অবনতি হয়েছে। ক্রমশ পুরাতন এবং অবিশ্বস্ত হয়ে পড়েছে ইরানের বিমান ও নৌ বহর।

দেশটির বিমানের গড় বয়স বর্তমানে ২৫ বছরের বেশি এবং তাদের অনেকেরই বড় ধরনের মেরামতের প্রয়োজন রয়েছে।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে, ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ মোহাম্মদী-বখশ বলেছিলেন যে ইরানের বর্তমানে ৫৫০টি বিমানের প্রয়োজন থাকলেও দেশটিতে মাত্র ১৮০টি বিমান রয়েছে।

যার কারণে চলতি বছরেই অবনতিশীল বিমান বহর সামাল দিতে এবং আধুনিক বিমান অর্জনের লক্ষ্যে তালেবানদের কাছ থেকে একটি ২৯ বছরের পুরনো বিমান কিনে ইরান। ইরানের সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ইউরোপীয় এয়ারবাস, ইরানের কাছে ১০০ বিমান বিক্রির জন্য একটি বড় চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করার মাত্র দুই মাস পরে প্লেন কেনার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

বিবিসি জানায়, অতীতে ইরানে সংস্কারপন্থী সরকার থাকাকালীন তারা পশ্চিমের সাথে একটি চুক্তির মাধ্যমে দেশের বিমান বহরকে আধুনিকীকরণ করার লক্ষ্য নিয়েছিল। ইরানে বিমান বহরকে আধুনিক এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করতে সংস্কারপন্থী সরকার দেশীয় শিল্প এবং বিদেশী মিত্রদের উপর নির্ভর করেছিল।

তবে তার বিনিময়ে পশিমারা ইরানের সংবেদনশীল পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের অনুমতি দেওয়ার শর্ত দিয়েছিল। যার দরুন সে সময় কট্টোরপন্থীদের ব্যপক বিক্ষোভের কবলে পরে সংস্কারপন্থী সরকার।

তবে মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করলে এই প্রচেষ্টা স্থগিত হয়ে যায়।

বিবিসি বলছে, এর আগেও ইরানে বিমান বা হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গেছেন সাবেক প্রতিরক্ষা ও পরিবহন মন্ত্রীরা, এছাড়া ইরানের স্থল ও বিমান সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডারদেরও বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটেছে।

এদিকে মার্কিন বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল সেড্রিক লেইটন সিএনএনকে বলেন, ‘রাইসি যে হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করেছিলেনম সেটি সম্ভবত ‘বেল–২১২’ মডেলের একটি হেলিকপ্টার। এটি ১৯৬০–এর দশকের শেষ থেকে পরিচালিত হচ্ছিল।’

হেলিকপ্টারটির খুচরা যন্ত্রাংশে ত্রুটি থাকার কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে সন্দেহ করছেন তিনি। সেড্রিক লেইটন বলেন, ‘হেলিকপ্টারটি পুরনো মডেলের হওয়ার এর অধিকাংশ যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না। এই মডেলের হেলিকপ্টার প্রথমে আমেরিকা তৈরি করেছিল। এরপর কানাডাতেও উৎপাদিত হয়েছে।’

মার্কিন বিমানবাহিনীর এই সামরিক বিশ্লেষক বলেন, ‘ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে হেলিকপ্টারটি যন্ত্রাংশ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈরী আবহাওয়া। কয়েকদিন ধরে ইরানের আজারবাইজান প্রদেশে খারাপ আবহাওয়া বিরাজ করছিল। এই সবকিছু মিলিয়ে সম্ভবত দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।’

গতকাল রোববার আজারবাইজানের সীমান্তবর্তী এলাকায় দুই দেশের যৌথভাবে নির্মিত একটি বাঁধ উদ্বোধন করতে যান ইব্রাহিম রাইসি। সাথে ছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্য কর্মকর্তারা। ফেরার পথে পূর্ব আজারবাইজানের জোলফা এলাকার কাছে দুর্গম পাহাড়ে প্রেসিডেন্টকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হন সবাই। তবে অন্য দুটি হেলিকপ্টার নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত