আ.লীগের রাজনীতি

'বিএনপি ঠেকাতে রাজনীতিকদের জলাঞ্জলি'

  • বিতর্কিতদের দরজা খোলে ২০১৪ তে
  • একাদশ সংসদ নির্বাচনেও বিতর্কিত প্রভাবশালীদের প্রাধান্য
আপডেট : ২৬ মে ২০২৪, ১০:৩১ এএম

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজীম আনারের হত্যাকাণ্ডে শোক যেমন আছে, তেমনি ক্ষোভও আছে আওয়ামী লীগের একাংশের মধ্যে। আনারদের মতো ব্যক্তিদের এমপি হওয়ার সুযোগ দেওয়া নিয়ে দলের বাইরে যেমন সমালোচনা আছে, দলের ভেতরেও চলছে। সার্বক্ষণিক দলের রাজনীতি করেও যাদের ভাগ্যে মনোনয়ন জোটে না, আনারদের মতো ব্যক্তিরা তিনবার এমপি হয়ে যান কীভাবে সেই কষ্ট ও ক্ষোভ দলের অনেকের মধ্যেই আছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের অনেকেই দাবি করেন, অভিজ্ঞ নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের টার্গেট করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার প্রবণতা যখন চালু হয়, তখন থেকেই বিতর্কিত ও নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সংসদে ঢোকার সুযোগ পেয়ে বসেন। দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখানোর সুযোগে দলে আনারদের মতো বিতর্কিতরা জায়গা করে নিয়েছেন।

তারা বলেন, রাজনীতিতে পেশিশক্তির প্রয়োজন আছে, তবে ২০১৪ সাল থেকে, অর্থাৎ দশম সংসদ নির্বাচনে জয়ের লিপ্সা থেকেই অতিমাত্রায় প্রভাবশালীনির্ভর হয়ে যায় আওয়ামী লীগ।

দলীয় সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনীতিকদের চেয়ে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য দেওয়া হয় দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে। তখনো ‘ক্ষয়ক্ষতির’ মাত্রা এতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৪) রাজনৈতিক অভিজ্ঞ নেতারা পেছনে পড়ে যান। সেখানে জায়গা করে নেন ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি নানা অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা।

দেখা যায়, নবম জাতীয় সংসদের ৬২ এমপি বাদ পড়েন দশম সংসদ নির্বাচনে। এর মধ্যে জাতীয় পার্টিসহ শরিকদের ছাড় দেওয়া হয় কিছু। বাকি আসনগুলোতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দলীয় মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ। যার বেশিরভাগই হত্যাকান্ডের শিকার আনারদের মতো। একাদশ সংসদে মাত্র ৩৯ এমপিকে বাদ দেওয়া হয়। সেখানেও আনাদের মতো আরও কিছু ব্যক্তিকে এমপি হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, দশম সংসদ নির্বাচনেই মূলত চোরাকারবারিসহ নানা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জাতীয় সংসদে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিএনপির আন্দোলন সামাল দেওয়া ও দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ক্ষুব্ধ এই প্রভাবশালী নেতা আরও বলেন, এর জন্য বিএনপিও দায়ী। তাদের নির্বাচন বর্জন করা ও নির্বাচন ঠেকানোর খেলা মোকাবিলা করতে রাজনীতিবিদদের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের চিন্তা ছিল না। চিন্তায় ছিল কীভাবে জেতা যায় সেটি। ফলে প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকলেও বিএনপিকে স্থানীয় রাজনীতিতে মোকাবিলা করার শক্তি-সামর্থ্য আছে মনে করলেই নৌকার টিকিট পেতে তার কোনো সমস্যা হয়নি।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে যেহেতু বিএনপি অংশ নেয়নি, ফলে রাজনীতিবিদদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ থাকলেও আওয়ামী লীগ তা করেনি। বিএনপির নৈরাজ্য ও নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি-সামর্থ্য রয়েছে এমন ব্যক্তিদের বেছে নিয়েছে আওয়ামী লীগ। সেটাই এখন কাল হয়েছে আওয়ামী লীগের জন্য।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপির নির্বাচন বর্জন, নির্বাচন ঠেকানোর ‘ধ্বংসাত্মক’ আন্দোলন, ‘জ্বালাও-পোড়াওসহ নৈরাজ্য’ সৃষ্টির রাজনীতি মোকাবিলা করে নির্বাচন আয়োজন ও ক্ষমতার চেয়ারে বসতে কৌশলে পরিবর্তন আনতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। ফলে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেওয়ার মানদণ্ড অনুসরণ করা থেকেও কিছুটা সরে এসেছে। রাজনীতির অভিজ্ঞতা নেই কিন্তু জেতার সম্ভাবনা প্রচুর, তাদের খুঁজে বের করা হয়েছে, মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, ভোটের আগে আওয়ামী লীগ যেসব জরিপ করেছে, সেখানেও খোঁজা হয়েছে জেতার মতো ব্যক্তি কে? তাদের মনোনয়ন দিয়েই রাজনীতির সর্বনাশ হয়েছে বলে মনে করছেন ওই সব নীতিনির্ধারক। তারা বলেন, জেতা প্রার্থী খুঁজতে গিয়ে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে থাকা ঘোরতর অভিযোগ আমলে নেয়নি ক্ষমতাসীনরা। এলাকায় পেশিশক্তিতে এগিয়ে থাকা, টাকাওয়ালা লোকদের বেছে মনোনয়ন দিয়েছে সরকারি দল।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ক্ষমতাকেন্দ্রিক ‘পাওয়ার হাউজগুলোর’ তদবিরেও আনারদের মতো ব্যক্তিদের এমপি হওয়া সুযোগ করে দিয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী-চোরাকারবারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ক্ষমতার সঙ্গে থাকার চেষ্টা করেছেন। সমাজে প্রভাব-প্রতিপত্তি হওয়ার পরে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ায় অপরাধ রাজ্যে তারা আরও শক্তিশালী হয়েছেন। ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করে আনার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। আনার অন্ধকার জগৎ থেকে রাজনীতিতে আসেন। রাজনৈতিক শেল্টারে আরও ক্ষমতাবান হন।’

আওয়ামী লীগের আরেক সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ক্ষুব্ধ হয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেতা প্রার্থী খুঁজতে গিয়ে মহাসংকটে পড়েছে আওয়ামী লীগ। এ জন্যই বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগের মতো দলের টিকিট নিয়ে এমপি হতে পেরেছেন। তিনি বলেন, ‘বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতির অজুহাত দিয়ে দলীয় মনোনয়নে আওয়ামী লীগও অনেকখানি ছাড় দিয়েছে। কখনো স্লোগান ধরেননি এমন ব্যক্তিরাও দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। আমরা যারা রাজনীতি করেছি, তাদের চাপাকান্না কেউ শোনেনি।’

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন গত দুটি নির্বাচনই বিতর্কিত ব্যক্তিদের সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্রগুলো আরও জানায়, দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি অংশ রাজনৈতিক নানা আশঙ্কার কথা তুলে ধরে স্থানীয়ভাবে প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকা ও ক্ষমতাবানদের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। এ অবস্থানে রাজনৈতিক নেতারা পিছিয়ে পড়েন। দশম সংসদ নির্বাচনের পরে প্রার্থী পরিবর্তনের বিষয়ে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত থাকলেও বৈরী রাজনীতির কথা তুলে ধরে প্রার্থী পরিবর্তনের ব্যাপারেও অনীহা প্রকাশ করে দলের ওই অংশটি। তাই দশম সংসদে ঢুকে পড়া বিতর্কিত এমপিদের পরিবর্তনও করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজনীতি বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো জেতার প্রবণতা নিয়ে নির্বাচন করে। এটি কাঠামো হয়ে গেছে। এই কাঠামোতে আপনি আর আমার মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ থাকে না। কারণ, আমরা জেতার মতো প্রার্থী না। ফলে জেতার মতো প্রার্থী খুঁজতে গিয়ে চোরাকারবারি ও অপরাধীদের খপ্পরে পড়ে যায় দলগুলো।’

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে শতকরা ৮০ ভাগ নির্বাচিত এমপিই চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত। এটা বলে কী লাভ হবে? আমরা এত বছর রাজনীতি করেছি, আমাদের নমিনেশন দেয় নাই। নমিনেশন দিয়েছে যার রাজনীতির কোনো জ্ঞান নেই তাকে।’ তিনি বলেন, ‘দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে সংসদে তারা ঢুকেছে।’

তবে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনীতির সর্বশেষ লক্ষ্য ক্ষমতা। ক্ষমতায় যেতে নানা কৌশলে রাজনীতি করতে হয়।’

দলের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভালো অনেককেই তো আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছে। সেগুলোও বলা উচিত। শুধু সমালোচনা গ্রহণযোগ্য নয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত