আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকান্ডে বিস্মিত আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় দলের ভেতর তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া ঘুরপাক খাচ্ছে। দলটির বড় অংশের নেতারা হত্যাকান্ড নিয়ে কথা বলতে নারাজ। একটি অংশ আনার হত্যাকান্ড নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। অন্য একটি অংশের মধ্যে দেখা গেছে উদ্বেগ। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এমন প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। ঝিনাইদহ-৪ আসনের এমপি আনারের হত্যাকান্ডকে অস্বাভাবিক ও দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিস্তারিতটা জানার পর পূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু যে আনার হত্যাকান্ডে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিস্মিত তা নয়, বরং এ ঘটনায় দলের অবস্থানেও বিস্মিত করেছে দলের অনেককেই। দলের একজন এমপি বিদেশে খুন হলেও দলের পক্ষ থেকে তদন্ত ও খুনের বিচার চেয়ে শক্ত অবস্থান এখনো দেখা যায়নি। এ হত্যাকান্ড নিয়ে সংসদ থেকেও শক্তিশালী কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি।
ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, এ হত্যাকান্ড নিয়ে বিস্ময়ের দুটি কারণ প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমত, এ ধরনের একজন মানুষ কীভাবে একাধিকবার মনোনয়ন পান? দ্বিতীয়ত, এমন কী হয়েছিল যে নৃশংসভাবে জিঘাংসা চরিতার্থ করল খুনিরা।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রয়াত এমপির ভালোমন্দ বিচার না করে কারণ উদঘাটন এখন জরুরি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এখন জরুরি।’ দোষীদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে এ নেতা বলেন, ‘এটা উদ্বেগের। একজন এমপির এমন হত্যাকান্ড দলের সবাইকে হতবাক করেছে।’
আওয়ামী লীগের শীর্ষ ও মধ্যমসারির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার আগে নানা তদন্ত সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করা হয়। এরপর যাচাই-বাছাই করে একজনকে মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগের জাতীয় সংসদ নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড। এ তদন্তে জনপ্রিয়তা, প্রার্থীদের ভাবমূর্তি, রাজনৈতিক ত্যাগ-তিতিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে মনোনয়নপ্রার্থী প্রয়োজনীয় মানসম্পন্ন হলেই শুধু তার হাতে নৌকার টিকিট তুলে দেওয়া হয়।
তারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এত রকম যাচাই-বাছাই করেও আনারদের মতো প্রশ্নবিদ্ধ ভাবমূর্তির ব্যক্তিরা মনোনয়ন পেয়ে গেল! প্রশ্ন হলো কারা করে এ তদন্ত? হত্যাকাণ্ডের পর যেসব বিষয় আনার সম্পর্কে গণমাধ্যমে উঠে আসছে, মনোনয়ন পাওয়ার আগে তদন্তে সংস্থাগুলো এ তথ্যগুলো কি পায়নি? নাকি তদন্তে বিষয়গুলো উঠে এলেও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা সেসব গুরুতর অভিযোগ পাশ কাটিয়ে গেছেন? যদি ইচ্ছাকৃত পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয় তাহলে অবশ্যই তা হবে বিস্ময়কর ও নজিরবিহীন ঘটনা। তাছাড়া তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ এড়িয়ে কোনো প্রার্থীর ব্যাপারে ইতিবাচক তথ্য দিয়ে সহায়তা করে থাকলে সেটাকেও গুরুতর অপরাধ মনে করেন তারা।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা বলেন, যদি সত্যিই গুরুতর বিষয় এড়িয়ে গিয়ে থাকেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা, তাহলে তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। কারণ, তাদের এড়িয়ে যাওয়ার এমন মনোভাব দেশের জন্য, সরকারের জন্য সর্বোপরি দলের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। এমন তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে যদি আনার মনোনয়ন পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন, তাহলে বর্তমানে আরও কত এমন আনার রয়েছেন তাদের খুঁজে বের করা হোক।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এ নেতাদের মতে, হয় তদন্ত প্রতিবেদন ভুল নয়তো মনোনয়ন বোর্ডের বিবেচনায় গলদ আছে। তা না হলে আনারের মতো ব্যক্তিরা নৌকার টিকিট পাওয়ার উপযুক্ত হবেন কেন?
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালের আগে রাজনীতিতে ব্যবসায়ী ও পেশিশক্তির লোকজনের ওপর নির্ভর করত খুবই কম। দলের নেতাদের, যারা শুধু রাজনীতি করেন তাদের মনোনয়ন দিয়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে ব্যর্থ হয়েছে আওয়ামী লীগ। এর ফলে ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্য স্থির করে ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাকাওয়ালা, ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের দলীয় মনোনয়ন দেয়। সফলতাও আসে। ২১ বছর পর রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু পর্যায়ক্রমে তা বাড়াতে গিয়ে সুযোগ পেয়ে যায় আনারের মতো ব্যক্তিরা।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, আনার হত্যাকান্ডের নৃশংসতা ও পৈশাচিকতা বিস্ময়কর। এর কারণ খুঁজে বের করা সম্ভব না হলে সেটাও হবে বিস্ময়কর ঘটনা।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, ‘দেশের বাইরে গিয়ে একজন সংসদ সদস্য হত্যার শিকার হলেনএটা উদ্বেগজনক। আমরা চাই, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার বিস্তারিত বেরিয়ে আসুক।’
দোষীদের খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের আরেক সভাপতিম-লীর সদস্য কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও কলকাতা পুলিশের সহযোগিতায় সত্যিকারের অপরাধীরা যাতে আইনের আওতায় আসে। এটাই তার চাওয়া।
