‘স্বপ্ন ছিল বিমানে মালয়েশিয়া যাওয়ার কিন্তু এখন সিএনজিতে গাবতলী যাচ্ছি’

আপডেট : ০১ জুন ২০২৪, ০৯:৪৩ এএম

‘স্বপ্ন ছিল বিমানে করে মালয়েশিয়া যাওয়ার। কিন্তু এখন সিএনজি ধরে বাস ধরার জন্য গাবতলী যাচ্ছি। সকাল থেকে না খেয়েই শুধু টিকিটের জন্য অপেক্ষা করেছি। কিন্তু দালাল ও এজেন্সি আমারে নিঃস্ব করে দিল। আমি এই মুখ নিয়ে কীভাবে বাড়িতে যাব?’ এভাবেই আক্ষেপ প্রকাশ করছিলেন নাটোরের যুবক ইলিয়াস হোসেন। গতকাল মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। তবে টিকিট না পাওয়ায় এবং গতকালই দেশটিতে যাওয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ায় তাঁর মতো স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে মালয়েশিয়ায় কর্মী হতে ইচ্ছুক প্রায় ৩২ হাজার বাংলাদেশি।

ইলিয়াস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের গ্রিন লাইন এজেন্সিকে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়েছি। ওই এজেন্সির মালিক মো. আবু আমাকে বিদেশে নেওয়ার আশ্বাস দেয়। বিভিন্নজনের কাছে ঋণ করে আমি এ টাকা সংগ্রহ করছি। এখন কীভাবে শোধ করব তাও জানি না। এসব দালালের বিচার হওয়া উচিত।’

ইলিয়াসের মতো একই অবস্থা নাটোরের সিংড়ার বাসিন্দা মো. সাইফুল্লাহর (২০)। কাজের জন্য মালয়েশিয়া যেতে গতকাল শুক্রবার ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন তিনি। দেশটিতে যাওয়ার জন্য নারায়ণগঞ্জের গ্রিন লাইন এজেন্সিকে দিয়েছেন ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। ওই এজেন্সির মালিক মো. আবু গতকাল তাকে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উড়োজাহাজের টিকিট দেওয়ার আশ্বাস দেন। তার কথামতো গতকাল ভোরে বিমানবন্দরে হাজির হন সাইফুল্লাহ। তারপর এজেন্সি মালিকের মোবাইল ফোনে কল করেন টিকিটের জন্য। তখন তাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলা হয়। এক ঘণ্টা পর ফের মো. আবুর মোবাইল ফোনে কল করলে তা বন্ধ পান। নিরুপায় সাইফুল্লাহ অসহায় অবস্থায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে টার্মিনাল-১-এর সামনে বসে থাকেন।

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জমি বন্ধক ও সুদে টাকা ধার করে ওই এজেন্সিকে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়েছি। গত পাঁচ দিন ধরে টিকিট দেওয়ার নামে ওই এজেন্সির মো. আবু আমার সঙ্গে প্রতারণা করে যাচ্ছেন। সবশেষ আজ (গতকাল) টিকিট কনফার্ম করার আশ্বাস দেন। কিন্তু বিমানবন্দর আসার পর থেকেই তার ফোন বন্ধ। তাই যোগাযোগ করতে পারছি না। আমার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। এই মুখ নিয়ে আমি কীভাবে বাড়িতে ফিরব। আজ মালয়েশিয়া যেতে না পারলে আত্মহত্যা করব। তবুও বিমানবন্দর ছাড়ব না।’

তার মতো ওই এজেন্সির প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন ২৪ জন মালয়েশিয়াগামী কর্মী। যাদের অধিকাংশরই বাড়ি নাটোর। প্রত্যেকে ওই এজেন্সিকে গড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা দিয়েছেন। গতকাল তারা বিমানবন্দরে আসেন। কিন্তু দালাল ও এজেন্সি তাদের বিমানবন্দরে আসতে বলে লাপাত্তা। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের গ্রিন লাইন এজেন্সির মালিকের মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

তবে শুধু ইলিয়াস বা সাইফুল্লাহই নয়, মালয়েশিয়ায় কর্মী হতে ইচ্ছুক প্রায় ৩২ হাজার বাংলাদেশির স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। শেষ সম্বল এজেন্সির হাতে তুলে দিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকেই। এক-দুজন নয়, গতকাল শাহজালাল বিমানবন্দরের সামনে বিমান টিকিটের জন্য ভিড় করেন মালয়েশিয়ায় কাজের জন্য যেতে ইচ্ছুক হাজার হাজার ব্যক্তি। তাদের কেউ আসেন সকালে, আবার কেউবা আগের দিন রাত থেকে করছিলেন অপেক্ষা। এজেন্সিগুলোর আশ্বাসে বসে বসে পার করেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নভাঙা মানুষগুলো চোখেমুখে বাড়তে থাকে হতাশার ছাপ। অনেক এজেন্সি লাপাত্তা মানুষগুলোর লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে।

শেষ মুহূর্তে শুধু টিকিটের জন্য দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও করছেন অনেকে। জাল টিকিটের প্রতারণায়ও পড়েন কেউ কেউ। মালয়েশিয়া সরকার গতকালের পর আর কোনো কর্মী নেবে না এমন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের প্রায় ৩২ হাজার কর্মীর দেশটিতে যাত্রা আটকে গিয়েছে।

গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১-এর সামনে কয়েক হাজার মানুষের ভিড়। সবার চোখমুখে অনিশ্চয়তার ছাপ। তাদের ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের। তবুও শুধু টিকিটের আশায় বিদেশগামী কর্মীরা ভোর থেকে রাত অবধি অপেক্ষা করে গেছেন। ফলাফল, শূন্যহাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।

আবদুর রহমান সাতক্ষীরা থেকে ছেলেকে বিদায় দিতে বিমানবন্দরে আসেন। তিনি জানতেন সবকিছু ঠিকঠাক। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে দেখেন উল্টো চিত্র। ছেলের মালয়েশিয়া যাওয়ার অনিশ্চয়তার খবরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিমানবন্দরে একটি গামছা বিছিয়ে শুয়েছিলেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জমিজমা বিক্রি ও এনজিও থেকে ঋণ করে ছেলের বিদেশ যাওয়ায় টাকা দিয়েছি। এখন কীভাবে বাঁচব? ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়িতে ফিরতে হবে।’ তার মতো অনেক অভিভাবকের দুশ্চিন্তায় দিন কেটেছে গতকাল।

মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের কথা বিবেচনা করে ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। গতকাল সন্ধ্যার পর ফ্লাইটটি  ঢাকা ছেড়ে যায়। এ ফ্লাইটে ২৭১ জন যাত্রী মালয়েশিয়া গেছেন।

বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২১ মে পর্যন্ত গত আড়াই বছরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ৫ লাখ ২৩ হাজার ৮৩৪ জন কর্মীকে মালয়েশিয়া যাওয়ার অনুমোদন দেয়। ২১ মের পর আর অনুমোদন দেওয়ার কথা না থাকলেও মন্ত্রণালয় আরও ১ হাজার ১১২ জন কর্মীকে দেশটিতে যাওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। সব মিলে ৫ লাখ ২৪ হাজার ৯৪৬ জন কর্মীকে মালয়েশিয়া যাওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত দেশটিতে যেতে পেরেছেন ৪ লাখ ৯১ হাজার ৭৪৫ জন। আর এজেন্সির প্রতারণাসহ টিকিট জটিলতায় মালয়েশিয়া যেতে পারেননি অনুমোদন পাওয়া ৩১ হাজার ৭০১ জন কর্মী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত