সৌদি আরবে কাজ করতে হলে আকামার প্রয়োজন। আকামা হচ্ছে কাজের অনুমতিপত্র। এটা না থাকলে সে দেশে উদ্দিষ্ট প্রবাসী ব্যক্তিকে অবৈধ গণ্য করা হয়। সৌদি শ্রমবাজারে আকামার নবায়ন বড় এক সমস্যা। বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকরা এই জটিলতায় বেশি পড়ে এবং মূলত দালাল সিন্ডিকেটের কারণে। এ অবস্থা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটিতে হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক আকামা সমস্যায় ভুগছে। কারণ নতুন আকামার জন্য যে টাকা প্রয়োজন, তা তাদের নেই বা থাকে না।
নড়াইলের আবদুল আলিম। দুই বছর আগে স্থানীয় এক দালাল পাঁচ লাখ টাকায় তাকে সৌদিতে পাঠান। চুক্তিমতে রেস্টুরেন্টে তার কাজ পাওয়ার কথা ছিল। আকামার মেয়াদ হবে এক বছর। কিন্তু সৌদিতে গিয়ে দেখলেন তার আকামার মেয়াদ মাত্র তিন মাস। আর তাকে পাঠানো হয়েছে ফ্রি ভিসায়। জেনে তিনি দিশেহারা। দালাল তাকে নির্দিষ্ট কাজ না দিয়ে একস্থানে আটকে রাখেন।
পরে ওই স্থান থেকে পালিয়ে তিনি সৌদির জিজান শহরে যান। পরিচিত একজনের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। কিছুদিন পরই তার আকামার মেয়াদ শেষ হয়। তিনি অবৈধ হয়ে পড়েন। ওই দেশের প্রশাসন আকামার মেয়াদ না থাকলে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করতে পারে। ভয়ে তিনি দিনের বেলায় বের হতেন না। রাতে পুলিশকে এড়িয়ে কাজ করতেন। তবে সিদ্ধান্ত নেন নতুন আকামা করবেন। দেশে জমি বিক্রি করে ১০০০০ রিয়াল (৩ লাখ ১২ হাজার টাকা) খরচ করে আকামা করেন।
আবদুল আলিম হয়তো বাড়িতে জমি থাকায় আকামা করতে পেরেছেন। কিন্তু হাজার হাজার প্রবাসী অর্থের অভাবে আকামা নবায়ন করতে পারেন না। তাদের লুকিয়ে বাঁচতে হয়। একসময় বাধ্য হয়ে পুলিশের কাছে ধরা দেন এবং জেল খেটে শূন্য হাতে দেশে ফেরেন। সৌদিতে আকামা জটিলতা বাড়ছেই। সমস্যায় আছেন হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশি।
এ বছরের জানুয়ারিতে আকামা নবায়নে নতুন সিদ্ধান্ত জারি করেছে সৌদি সরকার। সৌদি আরবে ঢোকার ৯০ দিনের মধ্যে আকামা করতে হবে। না হলে মূল টাকার সঙ্গে জরিমানা দিতে হবে ৫০০ সৌদি রিয়াল (সাড়ে ১৫ হাজার টাকা)। সৌদিতে তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর ও পাঁচ বছরের জন্য আকামা করা যায়। কাজের ধরন অনুযায়ী আকামা নবায়নের অর্থ নির্ধারিত। তবে আকামা নবায়নে কত টাকা প্রয়োজন সে রকম তথ্য নেই।
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, এখন ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার বাংলাদেশি রয়েছেন সৌদি আরবে। গত ৪ বছরে গিয়েছেন ১৬ লাখ ৬০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি। আবার প্রচুর শ্রমিক দেশে ফিরছেন। এর অধিকাংশই আকামার মেয়াদ না থাকায় জেল খেটেছেন। গত ২৭ মে সৌদিতে জেল খেটে ১০৭ শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। তাদের অধিকাংশ ফ্রি ভিসায় গিয়েছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেল খেটে দেশে ফেরা এক শ্রমিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক বছর আগে ঋণ করে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দালালকে দিয়ে সৌদিতে যাই। দালাল আমাকে থাকা-খাওয়া ও কাজের নিশ্চয়তা দেন। কিন্তু ওখানে নিয়ে গিয়ে তিনি আমাকে এক কফিলের কাছে বিক্রি করে দেন। কফিল আমাকে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা কাজ করাত। কিন্তু তেমন পয়সা দিত না। তিন মাস পরে আমার আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কফিল আমাকে ছাড়িয়ে দেয়। পরে দাম্মাম শহরে লুকিয়ে গাড়ি পরিষ্কারের কাজ করি। এক দিন পুলিশ আমাকে আটক করে।’
তিনি বলেন, ‘সৌদির জেলে হাজার হাজার বাংলাদেশি আটক আছেন। কারণ আকামার নবায়ন না করা। বিদেশগামী নতুন ভাইদের প্রতি আমার অনুরোধ, সবকিছু না জেনে বিদেশে যাবেন না।’
বিপুলসংখ্যক লোক গেলেও দেশটি থেকে প্রবাস-আয় কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৪৫৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা, যা ২০২২-২৩-এ ৩৭৬ কোটি ডলারে নামে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১০ মাসে এ আয় আরও কমে ২১৬ কোটি ডলারে নেমেছে।
সৌদি আরবের জিজান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রবাসী এবং অভিবাসীবিষয়ক গবেষক ড. হোসাইন আহমেদ লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিদিন শত শত প্রবাসী আকামা-সংকটের সমাধানে সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাসে ভিড় করেন। দূতাবাস থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা মেলে না, এমন অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকদের প্রধান অভিযোগ, ঢাকা থেকে রিক্রুটিং এজেন্সি ও তাদের দালালরা প্রতারণা করে শ্রমিকদের সৌদিতে পাঠান। এক হাজার বা তারও বেশি রিয়াল বেতন পাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও দেওয়া হয় ৫০০ কিংবা ৭০০ রিয়াল। সৌদিপ্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় একটি অংশ এখন অবৈধ। পুলিশের অভিযানে প্রায়ই তারা গ্রেপ্তার হচ্ছেন।’
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গত মে মাসে প্রায় ৪০ হাজার বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত দুই বছরে এটাই সর্বোচ্চ গ্রেপ্তার। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে ১২ হাজার ৯৫১, সীমান্ত সুরক্ষা আইনে ৬ হাজার ৫৯২ এবং শ্রম আইনের আওতায় ৩ হাজার ৪৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর বসবাসের অনুমতিহীনতা এবং শ্রম ও সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৪ হাজার ৬৯০ জন নারীসহ ৫৯ হাজার ৭২১ জনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। গ্রেপ্তারকৃত প্রবাসীদের মধ্যে ৫২ হাজার ৮১৫ জনকে দেশে ফেরত পাঠানোর আগে ভ্রমণের প্রয়োজনীয় নথি জোগাড়ের জন্য কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো হয়েছে। আরও ১ হাজার ৯৬৩ জনকে সৌদি আরব থেকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সৌদি শ্রমবাজার যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, এর এখনই সমাধান দরকার। কারণ দেশটিতে অবৈধ শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে জেলে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যাও। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারটিতে।’
তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালে ২৫ হাজার ৭৮৯ বাংলাদেশিকে সৌদি আরব থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। নতুন বছরে কয়েক মাসে হাজার হাজার কর্মী দেশে ফিরেছেন। ফেরত আসাদের বিবরণ প্রায় একই ধরনের। আকামা না থাকা, প্রতারিত হয়ে জেল খাটা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। প্রবাসীদের স্বার্থরক্ষায় আরও বেশি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন।’
