গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ, যার বড় অংশটিই বাংলাদেশে। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে এই ব-দ্বীপে প্রায় প্রতিবছর আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড়। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে জলবায়ু পরিবর্তনে ঘূর্ণিঝড়গুলো যেমন নিয়মিত হচ্ছে তেমনি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘বিজলি’, ‘মোরা’, ‘রোয়ানু’, ‘মিধিলি’, ‘মোকা’, 'ইয়াস', ‘আম্পান’, ‘ফণি’, ‘সিত্রাং’ ও ‘বুলবুল’ সহ মাঝারি থেকে হারিকেনের গতিসম্পন্ন বেশ কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে এসেছে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে। সর্বশেষ আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’। ২০০৭ সালের সুপার সাইক্লোন ‘সিডর’ এবং ২০০৯ সালের ‘আইলা’র তাণ্ডবের ক্ষত আর দুঃসহ স্মৃতি এখনো ভোলেনি বাংলাদেশের উপকূলবাসী। প্রতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি বাতাসের গতিবেগে আঘাত করা এসব ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের উপকূলতো বটেই, এমনকি মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারতো। কিন্তু প্রকৃতির এক আশীর্বাদে নানা সংকটে থাকা এই দেশ বিপর্যয় এড়াতে পেরেছে।
বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা এসব প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের আগ্রাসী আক্রমণ ঠেকিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ‘সবুজ ঢাল’ সুন্দরবন। সুন্দরী, গেওয়া, গড়ান, পশুর, বাইন, হেঁতাল, গোলপাতা, কেওড়া, ধুন্দুল, আমুর, খলশিসহ নানা গাছ-গুল্মের সবুজ দেয়াল রুখে দিচ্ছে ঘূর্ণিঝড়ের প্রলয়লীলা।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপকে বুক চিতিয়ে রক্ষা করছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন ‘সুন্দরবন’। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের যেসব কারণে পরিচিতি সেগুলোর মধ্যে একটি সুন্দরবন। এই বনের রয়েছে অনন্য গুরুত্ব। যা বিবেচনায় নিয়ে ‘কনভেনশন অন ওয়েটল্যান্ডস’ তালিকায় ১৯৯২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবন ‘রামসার সাইট’ বা বিশেষ জলাভূমি অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
১৯৭১ সালে ইরানের রামসারে কনভেনশন অন ওয়েটল্যান্ডস নামক একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ মোট ১৫৮টি দেশ স্বাক্ষর করে এবং পৃথিবীর ১৬৯ মিলিয়ন হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ১ হাজার ৮২৮টি স্থান আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের সুন্দরবন এই আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভ‚মিগুলোর একটি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জীব বৈচিত্র্যপূর্ণ জলাভ‚মিগুলোকে রামসার এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিশ্বের বুকে এই ম্যানগ্রোভ বনের অসামান্য মূল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে।
বিশ্বের কাছে জৈববৈচিত্রের জন্য সুন্দরবন মহা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন গুরুত্বপূর্ণ পৃথিবীর ফুসফুস মহাবন আমাজন। কিন্তু বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্নে সুন্দরবন প্রকৃতির দেয়া রক্ষাকবচ। সবুজ এই প্রাচীর প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়ের প্রথম ঝাপটা সহ্য করছে, দুর্বল করে দিচ্ছে মহাশক্তিশালী ঘূর্ণিকে।
তবে এবার সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য প্রথম এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। কারণ রিমাল আঘাত হানার পর এবার টানা ৪৮ ঘণ্টা পানিতে তলিয়ে ছিল পুরো বনাঞ্চল।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ‘২০০০ সাল থেকে ২০২৩ পর্যন্ত বাংলাদেশ উপকূলে যে ঘূর্ণিঝড়গুলো আঘাত হানে, সাধারণত দুই থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে তা স্থল নিম্নচাপ থেকে দুর্বল হয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ড অতিক্রম করে যায়।কিন্তু ঘূর্ণিঝড় রিমাল আঘাত হানার পর যে স্থল নিম্নচাপটি তৈরি হয়েছে, তা আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অবস্থান করে। এটি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার যে সব কারণের কথা বলছেন বিশ্লেষক ও গবেষকরা তার মধ্যে অন্যতম জলবায়ু পরিবর্তন।’ ( সূত্র-বিবিসি বাংলা, ২৮ মে ২০২৪)
উপকূলে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত
ঘূর্ণিঝড় রিমাল মাঝারি গোছের হলেও দীর্ঘস্থায়ী এই ঝড় উপকূলে রেখে গেছে কিছু দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত। ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবে উপকূলীয় ১৯টি জেলার প্রায় অর্ধকোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত করা হিসাবে রিমালের কারণে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। পৌনে দুই লাখ বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে ঝড়ের টানে ফুলেফেপে ওঠা জলোচ্ছ্বাস। লবণ পানিতে ছেয়ে গেছে মিষ্টি পানির জলাশয়, মাছ গেছে ভেসে, ভেসে গেছে চিংড়ি, কাঁকড়ার ঘের, তলিয়েছে ফসলি জমি। এসব ক্ষতি না হয় আর্থিক হিসাবে মাপা গেল। কিন্তু আরেকটি বড় ক্ষতির আর্থিক হিসাব আদৌ কি বের করা সম্ভব?
দেশীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর একাধিক প্রতিবেদন পড়ে জানলাম, সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা এখনই এত সহজ নয়। কারণ জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও গাছপালার যে ক্ষতি হয়েছে তার হিসাব কষতে আরও সময় লাগবে। ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস পুরো সুন্দরবন ডুবে ছিল প্রায় দু’দিন। সুন্দরবনের অনেক এলাকা ৮-১০ ফুট জোয়ারের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এতো দীর্ঘ সময় জোয়ারের পানি থাকায় বন্য প্রাণীদের ক্ষতি হয়েছে। জোয়ারের উচ্চতায় ছিল অস্বাভাবিক।
রিমাল তাণ্ডবের পর এখন পর্যন্ত ১২৭টি হরিণসহ সুন্দরবনে ১৩২ টি প্রাণীর মৃতদেহ পাওয়া গেছে। বনের কটকা, কচিখালী, করমজল, পক্ষীর চর, ডিমের চর, শ্যালার চর, নারিকেল বাড়িয়া ও নীলকমল থেকে মৃত প্রাণীগুলো উদ্ধার করা হয়।
রিমালসহ নিয়মিত ঘূর্ণিঝড়ের কারণে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকিতে সুন্দরবনের প্রাণ বৈচিত্র্য। দীর্ঘক্ষণের জলোচ্ছ্বাসে সাগরের নোনা পানি ঢুকে তলিয়ে গেছে বন্যপ্রাণীর জন্য তৈরি করা মিঠা পানির পুকুর-সহ শতাধিক জলাশয়। সংবাদমাধ্যমে এসেছে, কেবল সুন্দরবন পশ্চিম ভাগেই জলোচ্ছ্বাসে ১৪টি পুকুরের পাড় ভেঙে গেছে। এসব পুকুরের মিষ্টি পানি ছিল এই এলাকার প্রাণীদের পানীয় জলের ভরসা। বাঘ, হরিণ থেকে শুরু করে মৌমাছিও মিষ্টি পানি পছন্দ করে। সুন্দরবনে এখন মধুর সিজন চলছে। মিষ্টি পানি ছাড়া মৌমাছিও মধু আহরণ করতে পারে না । সুন্দরবনের প্রাণীদের এখন সবচেয়ে বেশি দরকার খাবার পানি। তাই এখন প্রচুর বৃষ্টি নামুক, এটাই প্রত্যাশা।
অবহেলায় দুর্বল হচ্ছে মজবুত ঢাল
প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ে প্রচণ্ড বাতাসে সুন্দরবনের গাছপালা বিপুল সংখ্যায় উপড়ে যাচ্ছে। অথচ একেকটি গাছের বেড়ে উঠতে যথেষ্ট সময় লাগে। ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে বাতাসের চাপে ফুলে ওঠা জোয়ার জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে বিপুল পরিমাণে বালি উঠে আসে সুন্দরবনের ভূ-উপরিভাগ ঢেকে দিচ্ছে। সুন্দরবন নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করা সাংবাদিক মোহসীন-উল হাকিমের ইউটিউব চ্যানেলের ভিডিওগুলোতে তিনি একাধিকবার এই বালুর বিপদ নিয়ে কথা বলেছেন। সুন্দরবন মূলত শ্বাসমূলীয় গাছগাছালির বন।
লোনাপানির কাদায় ডোবা গাছগুলোর শেকড় মাটি ভেদ করে উপর দিকে খাড়া উঠে গেছে। বালুর কারণে এই শ্বাসমূল ঢাকা পড়ায় মরছে গাছ। প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাই মাথার পাতলা হয়ে আসা চুলের মতো টাক দেখা যাচ্ছে সুন্দরবনেও।
সুন্দরবন ঘেঁষা লোকালয়ের বন জীবীদের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে এই বনে। গাছ কাটা, কাঠের চোরাকারবার কমেছে। এখন এই বনের মধু, খালের মাছ বন জীবীদের আয়-উপার্জনের প্রধান উৎস। এমনিতেই বনদস্যু, বিষ দিয়ে মাছ শিকার, পোচিং (অবৈধ শিকার) সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতির জন্য বরাবরই হুমকি। গত কয়েক দশকে জোয়ার-ভাটার বনে আগুন লাগার ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। সুন্দরবনে গত ২২ বছরে ২৫ বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সবগুলোই ঘটেছে পূর্ব সুন্দরবন এলাকায়। এসব আগুনের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, বেশির ভাগ আগুন লেগেছে জেলে-মৌয়ালদের অসাবধানতায়। যদিও এ নিয়ে বনজীবীদের দ্বিমত আছে। কে চায় নিজের জীবীকার উৎসে আগুন লাগাতে? এর মধ্যে আবার কয়েক দশক ধরে সুন্দরবন ঘেঁষে অবকাঠামো নির্মাণ, জাহাজ-ট্রলারের দেদারসে আনাগোনা, সব মিলিয়ে গোটা প্রতিবেশ এমনিতেই বিপন্ন। এর উপর যোগ হয়েছে অপরিণামদর্শী পর্যটনের চাপ।
পরিবেশ দিবসের আগে এই লেখা যেদিন লিখছি ঠিক সেদিনই একটি শীর্ষ দৈনিকের অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখলাম, ঝুঁকিতে থাকা সুন্দরবনে যত্রতত্র গড়ে উঠছে 'ইকো রিসোর্ট' নামের বিলাসী অবকাশযাপন কেন্দ্র। অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়েছে। এসব এলাকায় সেখানকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের ক্ষতি করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ কিংবা কোনো কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এসবের তোয়াক্কা না করে সুন্দরবনে তৈরি হচ্ছে কটেজ-রিসোর্ট। এর সংখ্যা এখন প্রায় ত্রিশ ছুঁইছুঁই! পরিবেশের কথা মাথায় না রেখে এসব স্থাপনায় সৌখিন পর্যটকদের আরামের জন্য লাগানো হচ্ছে এসি, জোয়ার-ভাটার কাদায় ভরা বনভূমি ভরাট হচ্ছে বালুতে, গড়া হচ্ছে কংক্রিটের হাঁটাপথ। ( সূত্রঃ প্রথম আলো অনলাইন, ৩ জুন ২০২৪)
সুইমিংপুল, বার্বিকিউ পার্টি, বনফায়ার, আতশবাজি আর লাউডস্পিকারে পার্টি হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই, এই সব সম্ভবের দেশে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ট্যুরে গিয়ে নিজেই দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অভয়ারণ্যে গিয়েও কীভাবে আতশবাজিতে মেতে ওঠে! তো, সুন্দরবনের মতো জায়গায় এরকম রিসোর্টগুলোতে পরিবেশ-প্রতিবেশ যে ঝুঁকিতে পড়বে না তা হলফ করে বলার উপায় নেই। আর সুন্দরবনের যেকোনো ক্ষত বাংলাদেশের উপকূল আগলে রাখা ‘গ্রিন শিল্ডের’ গায়ে মরচে পড়ার শামিল।
