মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বছরে ইঁদুর খেয়ে ফেলে ২৯০০ কোটির ফসল

আপডেট : ১০ জুন ২০২৪, ১০:০৩ পিএম

প্রতিবছর দুই হাজার ৯০০ কোটি টাকার ফসল নষ্ট করছে ইঁদুর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই তথ্যে অনেকে চমকে উঠবেন। কিন্তু দেশে চাষাবাদকৃত ১০০টি ফসলের মোট ৮৩২টিতে ক্ষতিকর পোকামাকড়, ৮৩৩টিতে রোগ সৃষ্টিকারী রোগজীবাণু এবং ১৭০টিতে আগাছা শনাক্ত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বালাইয়ের আক্রমণে ফসল ৩০ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, দেশে শুধু পোকামাকড়ের কারণে বার্ষিক ফলনের ক্ষতি হচ্ছে ধানের ক্ষেত্রে ১৬ শতাংশ, গমের ক্ষেত্রে ১১ শতাংশ, আখে ২০ শতাংশ, সবজিতে ২৫ শতাংশ, পাটে ১৫ শতাংশ এবং ডাল ফসলে ২৫ শতাংশ। আর আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা না হলে ফসলের ক্ষতি হয় ৩৭ শতাংশ।

ফসলের ক্ষতিকর জীবাণু এবং কীটপতঙ্গ দমনের জন্য দেশে কীটনাশক (পেস্টিসাইড) ব্যবহার বেড়েছে। বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পেস্টিসাইডের বাজার ৫০০০ কোটি টাকার বেশি। দেশে এক হাজারের বেশি ধরনের পেস্টিসাইড ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ওজনের হিসাবে যার পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার টন। দানাদার পেস্টিসাইড বাদে তরল ও পাউডার পেস্টিসাইডের প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হয়।

কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোগজীবাণু বাড়ছে, তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পেস্টিসাইডের চাহিদাও আরও বাড়বে। তবে দেশে যে পরিমাণ কাঁচামাল উৎপাদিত হয়, তাতে দেশের কীটনাশক চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন শুধু যুগোপযোগী কীটনাশক শিল্পনীতি। বর্তমানে বিশ্বের ১১৩টি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। কীটনাশক শিল্পেও একই ধরনের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন তারা।

কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় ফসল উৎপাদনে পেস্টিসাইড ব্যবহার প্রয়োজন। কারণ কীটপতঙ্গের আক্রমণে শাকসবজিতে ৫৪ শতাংশ, ফলে ৭৮ শতাংশ এবং খাদ্যশস্যে গড় ক্ষতি ৩২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এ কারণে পেস্টিসাইড ব্যবহার করে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফসল আবাদের পরিধি ও ধরন বদলেছে। বেড়েছে ফসলের জন্য ক্ষতিকর রোগজীবাণু ও কীটপতঙ্গ। এসব দমনে কৃষক বালাইনাশকের ব্যবহারও বাড়িয়েছেন। আর এ সুযোগে কোম্পানিগুলো কাটছে কৃষকের পকেট। কৃষিতে কীটনাশক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে শক্ত নজরদারি দরকার বলে মনে করেন তারা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে দেশে ৪০০০ টন বালাইনাশকের ব্যবহার ছিল; ১৯৮০ সালে তা ছিল ৫০০০ টন। ২০০০ সালে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়ে দাঁড়ায় ৮০০০ টনে। প্রায় দুই দশকের ব্যবধানে (২০২২ সালের হিসাব) বালাইনাশকের ব্যবহার অস্বাভাবিক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০০০ টনে। ২০০০ সালে দেশে বালাইনাশক উৎপাদক কোম্পানি ছিল আটটি। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩টিতে।

বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএমএ) সভাপতি এবং এগ্রিকেয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কীটনাশক ও আগাছানাশক, ছত্রাকনাশক এগুলো অত্যাবশ্যকীয়। এগুলো ছাড়া কোনো দেশেই চাষবাস সম্ভব নয়। এ সাধারণ উপকরণগুলো আমরা আমদানি করে নিয়ে আসি। কিন্তু যদি আমরা সঠিক মেশিন বিদেশ থেকে আমদানি করি, কাঁচামাল নিয়ে আসি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগিতা নিয়ে অতি সহজে উৎপাদন করে এমনকি বিদেশেও রপ্তানি করতে পারি। ঠিক যেমনিভাবে আমাদের ওষুধশিল্প পরনির্ভরশীল ছিল, কিন্তু সেই ওষুধে আমরা এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা বলেন, ‘কৃষিশিল্পে কীটনাশক বড় একটি খাত। এ খাতে সরকারের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ৫-৬ হাজার কোটি টাকার বাজার কেন আমরা পুরোটাই আমদানি করব। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যথেষ্ট তহবিল দিয়ে গবেষণার মাধ্যমে কীভাবে দেশেই এর উৎপাদন করা যায়, সেটা নিয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের মেধা রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতাও রয়েছে। শুধু প্রয়োজন সরকারের উদ্যোগ ও তহবিল। ওষুধশিল্পে যেমন আমাদের সফলতা এসেছে, কীটনাশক শিল্পেও এ সাফল্য আনা সম্ভব।’

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত