সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত গরিবরা

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৪, ১২:১৮ এএম

প্রাচীন ভারতের সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও তার পুত্র বিন্দুসারের রাজ উপদেষ্টা ছিলেন আচার্য চাণক্য। অর্থনীতির পাশাপাশি কূটনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও দর্শনে অগাধ জ্ঞান ছিল তার। কৌটিল্য নামেও পরিচিত ছিলেন তিনি। একটি দেশের আদর্শ বাজেট, কর ব্যবস্থা ও অর্থনীতি ঠিক কেমন হওয়া উচিত, সেই প্রসঙ্গে তার রচিত অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে পরামর্শ দিয়ে গিয়েছেন। চাণক্য বলেছেন, একজন রাজার সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি হলো ‘রাজকোষ’ অর্থাৎ সেই রাজ্যের কোষাগার। তার মতে, দেশের উন্নতি ও সাধারণ মানুষের মঙ্গলের জন্য যিনি সর্বময় শাসক, তার উচিত নীতি ও আদর্শের কথা মাথায় রেখে কর ব্যবস্থা চূড়ান্ত ও বাজেট প্রস্তুত করা। এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি একটি উদাহরণ দিয়েছেন।  বলেছেন, ‘ঠিক যেভাবে একটি মৌমাছি অনেক ফুল থেকে একটু একটু করে মধু সংগ্রহ করে মৌচাক গঠন করে, ঠিক সেভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ থেকে একটু একটু করে কর সংগ্রহ করে রাজকোষ গঠন করা উচিত। মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করলে যেমন ফুলের কোনো ক্ষতি হয় না, রাজাকেও মাথায় রাখতে হবে যে কর দিতে গিয়ে যাতে সাধারণ মানুষের কোনো ক্ষতি না হয়।’

চাণক্যের মতে, করের বোঝা যেন কখনোই সাধারণ মানুষের ওপর চেপে না বসে এবং তারা যেন কর ব্যবস্থার সুফল বুঝতে পারেন সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। করের টাকায় রাজ্যের যে উন্নয়ন হচ্ছে, তাদের জীবনযাত্রা মান বাড়ছে, তা সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করতে পারলে কর দিতেও তাদের সমস্যা হবে না। কৌটিল্য বলেছেন, বাজেট প্রস্তুত করার সময় শাসককে যে বিষয় মাথায় রাখতে হবে, তা হলো ‘অলব্ধলভার্থ লব্ধপরীক্ষানি রক্ষিতাভিভার্ধানি বৃদ্ধস্য তীর্থে প্রতিপাদানি চা।’ অর্থাৎ যা উপলব্ধ নয় তা সংগ্রহ করা, যা রয়েছে তা সঞ্চয় করা, যা সঞ্চিত আছে তা সবার মধ্যে বণ্টন করে দিলে তবেই দেশ ও দশের উন্নয়ন সম্ভব। বাজেটে যুব সমাজের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতেই হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। দেশের মানুষের হাতে কাজ থাকলে শাসকও আয়কর সংগ্রহ করতে পারবেন। নানা সামাজিক প্রকল্প চালু করে দরিদ্রদের উন্নতির ব্যবস্থা করা জরুরি বলেও জানিয়েছেন চাণক্য। তা না হলে মূল্যবৃদ্ধির সময় গরিব মানুষদের প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যে পড়তে হয়।

আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব বিবরণী বা বাজেটবিষয়ে চাণক্য যে পরামর্শ দিয়েছিলেন, এখনো তা সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুঃখজনক হলো, এখনো আমাদের জাতীয় বাজেটে ‘সবার উন্নয়নের’ কথা বলা হলেও ‘দরিদ্রদের উন্নয়নের’ বিষয়টি উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকার বিশাল বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেটে গরিবের হিস্যা কতটুকু? এর উত্তর খুঁজতে গেলে গলদঘর্ম হতে হয়! দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গরিব। বাজেটে গরিবদের জন্য বরাদ্দ চোখে পড়ে না। প্রতি বছর বাজেটের আকার বাড়লেও গরিব মানুষকে ন্যায্য হিস্যা না দেওয়ায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধনী-গরিবের ব্যবধান। তাই বাংলাদেশে প্রতি বছরই বাজেটের টাকা খরচের অঙ্ক বাড়লেও, কমছে না ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান। দেশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সরকারি খরচ মেটানোর জন্য ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু সরকারের উন্নয়নের সুফল সবার ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারছে না। পৃথিবীতে যে পাঁচটি দেশে অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রতি বছর বাজেটের আকার বড় হয়, জনগণের ওপর নতুন করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বহু রকম কর বসে, জনগণের নামে হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের লাইসেন্স সংসদ থেকে নেওয়া হয় এবং এর সুদও পরিশোধিত হবে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দ্বারাই। বাস্তবতা হলো, বাজেট ঘোষণার পর সব কিছুর দাম বাড়ে। যা কমে, সেগুলো নিম্ন বা নিম্ন মধ্যবিত্তদের হাতের নাগালে থাকে না। এক বছর আগেও এক হাজার টাকার বাজার করলে ৩-৪ দিন চলা যেত। এখন দুইশ থেকে আড়াইশ টাকার নিচে পাঙাশ- তেলাপিয়া মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। সন্তানরা যে মাছ পছন্দ করেন তা সাড়ে তিনশ থেকে পাঁচশ টাকার ওপরে। যে আলুর দাম গত বছর ছিল ২০ টাকা, এ বছর তা ৫৫-৬০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষদের আয় বৃদ্ধির তুলনায় সব কিছুতে খরচ বেড়েছে। বাসা ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা সবকিছুই ২ ডিজিটের ওপর বৃদ্ধি পেয়েছে। বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে চাল, ডাল, আটা, ময়দা, ভোজ্যতেল, লবণ, চিনি, মাছ, মাংসসহ সব ধরনের খাদ্যপণ্য। কমেনি চিকিৎসা, যাতায়াত, শিক্ষাসহ খাদ্যবহির্ভূত ব্যয়ও। করোনা মহামারীর ভয়ংকর স্মৃতি এখনো মুছে যায়নি। অথচ স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো রক্ষাকবচ রাখা হয়নি। বাজেটে ট্যাক্সের বোঝা বাড়ে, ধনীদের সম্পদ বাড়ে, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাড়ে, আমলা প্রশাসন খাতে বরাদ্দ বাড়ে আর এর প্রভাব এসে পড়ে নিম্নবিত্তদের ওপর। বাজেট বক্তৃতায় সাধারণ মানুষকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ও প্রবৃদ্ধির খতিয়ান শোনানো হয় এবং ১৫-১৬ দিন এ নিয়ে তুমুল বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত ‘গরিববান্ধব ও উন্নয়নের বিশাল দলিল’ আখ্যা দিয়ে তা পাস হয়ে যাবে। কিন্তু গরিবের নামে যে বাজেট করা হয়, তাতে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হন গরিবরাই।

এবারের বাজেটে রাজস্ব আয়ে পরোক্ষ কর প্রত্যক্ষ করের দ্বিগুণ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দুঃসহ ভারের সবটাই বহন করতে হবে গরিব-মধ্যবিত্তসহ সাধারণ নাগরিকদের। অথচ বিত্তবানদের ওপর ধার্য প্রত্যক্ষ কর রেয়াত অব্যাহত রাখা হয়েছে। অপ্রদর্শিত কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। বাজেট বরাদ্দের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সিংহভাগ বিত্তবানদের স্বার্থে ব্যয় করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেটে এভাবে গরিব জনগণের সম্পদ মুষ্টিমেয় লুটেরা ধনিকের হাতে প্রবাহিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতি বছর যেমন অতীতের চেয়ে বাজেট ব্যয় সর্বোচ্চ হয়, তেমনি ঘাটতিও হয় সর্বোচ্চ। এবারও তাই হয়েছে। বাজেটের বেশিরভাগ খরচ হবে পূর্বের ঋণ পরিশোধ, বিলাসদ্রব্য আমদানি, অপচয়, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন প্রকারের সিস্টেম লস, কর রেয়াতের নামে ধনিক শ্রেণিকে বিশাল ভর্তুকি প্রদান ইত্যাদি কাজে। সবই লুটেরা ধনিক শ্রেণির স্বার্থে গৃহীত পদক্ষেপ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেও সেটি খুব অপ্রতুল। সুখবর নেই কৃষকের জন্য। কমানো হয়েছে ভর্তুকি। নেই ক্রমবর্ধমান সার, সেচ ও কৃষি উপকরণের দাম কমানোর কোনো উদ্যোগ। কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও নেই কোনো বরাদ্দ। কৃষিপণ্য রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাত খাতের জন্যও তেমন কোনো সুবিধা রাখা হয়নি। গুরুত্ব পায়নি কৃষকদের উৎপাদন ও ফসল বিক্রির সমস্যা সমাধানের। তারা ন্যায্যমূল্য পায় না। ফসল সংরক্ষণও করতে পারে না টাকার অভাবে। সাধারণ মানুষ চড়া দামে সেসব কৃষিপণ্য কিনছে। বাজেটে এসব প্রতিরোধে জন্য কোনো উদ্যোগ নেই।

দেশে মুদ্রাস্ফীতির পারদ এমনিতেই চড়া। মোট বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ অর্থাৎ ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থায়ন করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতির কারণ হতে পারে। এমনিতেই জনজীবনে মূল্যস্ফীতির চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে গরিবদের ওপর প্রভাব পড়ছে। তা ছাড়া প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে যদি কর বেড়ে যায়, তাহলে সেগুলোতে গরিব মধ্যবিত্তদেরই বেশি মুখোমুখি হতে হয়। কারণ তাদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের মিল থাকে না।  এর মধ্যে সরকার যদি খাদ্য উৎপাদনে ভর্তুকি কমিয়ে, যাতায়াতে আরও কর বাড়িয়ে দেয় তাহলে গরিবদের বড় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের অর্থনীতি তো এমনিতেই সংকটের মধ্যে, তার ওপর সরকার আরও ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রত্যাশিত ঋণ যদি না মেলে তখন মূল্যস্ফীতির কারণে শুধু গরিব নয়, সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। কাজেই এবারের বাজেটে সবচেয়ে বেশি হুমকির সম্মুখীন গরিবরা। 

লেখক: কলামিস্ট ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত