যেমন চলছে জাফরুল্লাহবিহীন গণস্বাস্থ্য

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৪, ০৬:২৪ পিএম

গণমানুষের কথা চিন্তা করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তিল তিল করে গড়া ওঠা প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল মুনাফা অর্জন না করে মানুষের সেবা করা। সংস্থাটি দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয় ব্যতিক্রমধর্মী ভাবনা ও কাজের জন্য। ট্রাস্টি থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মীদের নিরলস শ্রমে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির সুনাম বাংলাদেশ পেরিয়ে চলে যায় গোটা বিশ্বে। গণস্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্বখ্যাত সাময়িকী ল্যানসেট–এ প্রবন্ধ প্রকাশ করে।

শুধু তাই নয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ১৯৭৭ সালে দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় পুরস্কার 'স্বাধীনতা পদক' লাভ করে। এ ছাড়া ১৯৮৫ সালে ম্যাগসাসে পুরস্কার, ১৯৯২ সালে সুইডেন থেকে রাইট লাইভহুড পুরস্কার এবং ২০০২ সালে বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল হেলথ হিরো পুরস্কার লাভ করে। জাফরুল্লাহ চৌধুরী শক্তহাতে সামাল দিয়েছিলেন সবকিছু। কিন্তু ২০২৩ সালের ১২ এপ্রিল গণ স্বাস্থ্যর স্রষ্টা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মারা যান। তার মৃত্যুর পর থেকেই গণস্বাস্থ্যে শুরু হয়েছে সীমাহীন লুটপাট।

প্রয়াত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবর্তমানে ট্রাস্টিরা নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। জাফরুল্লাহ চৌধুরীর স্বপ্নের গণস্বাস্থ্যে লুটপাটের মহাআয়োজন চলছে।  অতিলোভী ও দুর্নীতিবাজদের কারণে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে গণস্বাস্থ্য। ট্রাস্টি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে বিরোধ, দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ, বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কার, অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরী হয়েছে অনিশ্চয়তা।

গণস্বাস্থ্যের অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনায় ট্রাস্টিরা একে অন্যের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা, ৫টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও লিগ্যাল নোটিসসহ ২৪টি অভিযোগের নথি দেশ রূপান্তরের হাতে রয়েছে। এসব নথিতে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মামলা, জিডি, লিগ্যাল নোটিস ও কারণ দর্শানোর নোটিস হয়েছে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অধ্যাপক আলতাফুন্নেসার বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. নাজিমুদ্দিন বেশিরভাগ অভিযোগ করেন। এর মধ্যে ডা. নাজিমুদ্দিন আলতাফুন্নেসা ও অন্য ট্রাস্টিদের বিরুদ্ধে আটটি মামলা, জিডি ও উকিল নোটিস করেছেন। ডা. নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে চেয়ারপারসন আলতাফুন্নেসা একটি ও ট্রাস্টি সন্ধ্যা রায় বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করেন একজন পরিচালক। ডা. মুহিব উল্লাহ চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছেন। অন্য মামলাও বিভিন্ন ট্রাস্টি ও পরিচালকরা একে অন্যের বিরুদ্ধে করেছেন।

ট্রাস্টিদের মধ্যে বিরোধের পাশাপাশি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতিও বাসা বেঁধেছে। ইতিমধ্যে ৩০ কোটি টাকার বেশি লুটপাটের ঘটনা জানা গেছে। ভুয়া কাগজে গাছ বিক্রির অভিযোগে করা একটি মামলায় গ্রামীণ স্বাস্থ্য প্রকল্পের সিনিয়র অর্থ ব্যবস্থাপক রাজীব মুন্সীকে কারাগারে যেতে হয়েছে।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধ্যাপক আলতাফুন্নেসা দায়িত্ব নেওয়ার পর জালিয়াত চক্রের সদস্যরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্বের শুরু হয় ট্রাস্টিদের মধ্যে। গত বছর ১৪ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. নাজিমুদ্দিন আহমেদের সঙ্গে পরামর্শ করে আলতাফুন্নেসা যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিতেন। পরে তাদের মধ্যে ট্রাস্ট পরিচালনা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। অধ্যাপক আলতাফুন্নেসা দায়িত্ব নেওয়ায় চক্রান্তকারীরা তাকে ব্যবহার করে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ট্রাস্টের অর্থ লুটপাট করতে শুরু করে। অর্থ লোপাটের ঘটনা ধরা পড়ায় অধ্যাপক আলতাফুন্নেসা কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। কিন্তু পরে তাদের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে নেন। এভাবে সংস্থাটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় দুর্নীতিগ্রস্ত ও অসৎ ব্যক্তিদের হাতে। প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. নাজিমুদ্দিন আহমেদ একদিকে আর অন্যদিকে ট্রাস্টি ডা. মঞ্জুর কাদির আহমেদ, ডা. আবুল কাশেম চৌধুরী, সন্ধ্যা রায় ও ডা. কনা চৌধুরী।

শুরুর দিকে আলতাফুন্নেসা ট্রাস্টি নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে থাকলেও পরবর্তীকালে তিনি ডা. মঞ্জুরদের পক্ষে অবস্থান নেন। এরপর থেকে ডা. মঞ্জুর কাদির ও তার অনুসারীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ঘটনা প্রবাহের একপর্যায়ে চেয়ারপারসন আলতাফুন্নেসা পদত্যাগ না করেই পারিবারিক কারণ দেখিয়ে কানাডা চলে যান। যাওয়ার আগে ডা. আবুল কাশেম চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে যান।

ট্রাস্টি বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ডা. আবুল কাশেম চৌধুরী দুর্নীতি ও অনিয়মের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ট্রাস্টিদের মধ্যে একমাত্র ডা. নাজিমুদ্দিন ছাড়া অন্য কারও মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। জাফরুল্লাহ ভাই জীবিত থাকাকালে ডা. নাজিমুদ্দিনকে বিভিন্ন দায়িত্ব দিতেন। কিন্তু তিনি ঠিকমতো তা করতেন না। ফলে চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব দেন অধ্যাপক আলতাফুন্নেসাকে। ডা. নাজিমুদ্দিনসহ আরও যারা অনিয়মের অভিযোগ তুলছেন, তারা কিন্তু কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত