সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

গণস্বাস্থ্যে লুটপাটের মহাআয়োজন

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৪, ০৯:৪৫ পিএম

বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ওষুধনীতি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর স্বার্থ ক্ষুণ্ন করেছিল, ফলে সেই কোম্পানি ও তাদের প্রতিনিধিরা ওষুধনীতি বানচালের চক্রান্তে মাঠে নেমেছিল। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সামনে নানা প্রলোভন ছিল কিন্তু তিনি সব উপেক্ষা করে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যান আমৃত্যু। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ডা. জাফরুল্লাহ স্বাধীনতার চেতনা বুকে ধারণ করে সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাধ্যমে। দিনে দিনে শূন্য থেকে শুরু হওয়া এই সংস্থার সম্পদ ছাড়িয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩০ এর বেশি।

তবে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর মাত্র ১ বছর পেরোতেই তার স্বপ্ন আর ঘামে গড়ে তুলা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র লুটপাটের মহাআয়োজন চলছে। বাইরে থেকে কিছু বোঝা না গেলেও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের লুটপাঠের চিত্র উঠে এসেছে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে।

ট্রাস্টিদের মধ্যে বিরোধের পাশাপাশি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতিও বাসা বেঁধেছে। ইতোমধ্যে ৩০ কোটি টাকার বেশি লুটপাটের ঘটনা জানা গেছে। ভুয়া কাগজে গাছ বিক্রির অভিযোগে করা একটি মামলায় গ্রামীণ স্বাস্থ্য প্রকল্পের সিনিয়র অর্থ ব্যবস্থাপক রাজীব মুন্সীকে কারাগারে যেতে হয়েছে।

এফোর্ডেবল হেলথ কেয়ার ট্রাস্টে দুর্নীতি : গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এ ট্রাস্টের অধীনে গণস্বাস্থ্য ডায়ালাইসিস সেন্টারের জন্য ১০ কোটি টাকা অনুদান দেয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট ইউনিট স্থাপনে ১০ কোটি টাকা দেন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ফজলে হাসান আবেদ। এফোর্ডেবল হেলথ কেয়ার ট্রাস্ট পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ডা. মুহিব উল্লাহ। তিনি ট্রাস্টের কার্যক্রম গোপনে পরিচালনা করেন এবং কোনো তথ্য ও হিসাব বিবরণী কাউকে জানতে দেননি। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন আলতাফুন্নেসা এ নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলে এফোর্ডেবল হেলথ কেয়ার ট্রাস্টে দুর্নীতির তথ্য উঠে আসে। তদন্তে ডা. মুহিব উল্লাহ ছাড়াও এ ট্রাস্টের দুর্নীতির সঙ্গে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি মঞ্জুর কাদিরের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। শুধু তাই নয়, হেলথ কেয়ার ট্রাস্টে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ডা. মুহিব উল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য ব্র্যাকের পক্ষ থেকেও চেয়ারপারসনকে অনুরোধ জানানো হয়।

একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে একজন : ডা. মুহিব উল্লাহ খোন্দকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিরুদ্ধে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অর্থ পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) শেখ মোহাম্মদ কবিরের নেতৃত্বে গত বছর ১ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত তদন্ত পরিচালিত হয়। তদন্তে দেখা যায়, বিভিন্ন প্রকল্পে টেন্ডার আহ্বান না করে কার্যাদেশ ও ১ কোটি ২ লাখ ৭১ হাজার টাকার বিল দিয়েছেন ডা. মুহিব উল্লাহ। লুটপাট করতে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের সমন্বয়ক হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে সাত, আট ও নয়তলার সম্প্রসারণে টেন্ডার আহ্বান না করে নিজের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেন। এতে ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি ৪৩ লাখ ৫ হাজার টাকা। করোনার সময় টেন্ডার না দিয়ে এসি সংস্কারের বিল দেখান ২২ লাখ ৩৩ হাজার টাকার। এ দুটি কাজ পায় মেসার্স মহিউদ্দিন ট্রেডার্স। গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজে প্রতি বছর বড় অঙ্কের ঘুষ নিয়ে বিদেশি কোটায় দেশীয় শিক্ষার্থী ভর্তি করেছেন তিনি। এ ছাড়া হাসপাতালের জন্য ডায়ালাইসিস বেড, মনিটর, ভেন্টিলেটর, হেমোডায়ালাইসিস ও বিভিন্ন মেশিন এবং করোনার কিট তৈরির মালামাল আমদানিতে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি করার অভিযোগ রয়েছে ডা. মুহিব উল্লাহর বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ডা. মুহিব উল্লাহ পাঁচ বছর ধরে ভারতের একটা প্রতিষ্ঠান থেকেই ডায়ালাইসিসের মালামাল অতিরিক্ত দাম দেখিয়ে আমদানি করছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে গত ১৬ জানুয়ারি তাকে বহিষ্কারের আদেশ দেন ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন আলতাফুন্নেসা। কিন্তু তার অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন ট্রাস্টি ডা. আবুল কাশেম চৌধুরী। পরে তার বহিষ্কার প্রত্যাহার করে সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

গার্মেন্টস কর্মীদের স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্পে দুর্নীতি : গণস্বাস্থ্য গ্রামীণ স্বাস্থ্য কার্যক্রমের সিনিয়র পরিচালক ডা. রেজাউল হক সাভারে গার্মেন্টস কর্মীদের স্বাস্থ্যবীমার পাইলট প্রকল্প থেকে ২০১৭ ও ’১৮ সালে দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। তার দুর্নীতির প্রমাণ উঠে আসে ডা. মিজানুর রহমানের তদন্ত প্রতিবেদনে, যা ২০১৯ সালের ১০ নভেম্বর জমা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার বিরুদ্ধে বড় বড় আরও কয়েকটি প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসের দুর্নীতি : গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসের  ঢাকা ডিপো থেকে ২০১৭-২২ সাল পর্যন্ত ১ কোটি ৫৬ লাখ ৪৪ হাজার ৯০০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন ডিপো ইনচার্জ রাফিউল ইসলাম। দুর্নীতির ঘটনা তদন্তে গঠন করা তিনটি কমিটিতে তার এ অর্থ আত্মসাতের সহযোগী হিসেবে উঠে এসেছে বর্তমান ট্রাস্টি সন্ধ্যা রায়ের নাম। তিনটি কমিটির প্রতিবেদনের পরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেননি চেয়ারপারসন আলতাফুন্নেসা ও ট্রাস্টি বোর্ড। এ ছাড়া গণস্বাস্থ্য থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করার অভিযোগ আছে অনেকের বিরুদ্ধে।

মামলা পাল্টা মামলা : গণস্বাস্থ্যের অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনায় ট্রাস্টিরা একে অন্যের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা, ৫টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও লিগ্যাল নোটিসসহ ২৪টি অভিযোগের নথি দেশ রূপান্তরের হাতে রয়েছে। এসব নথিতে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মামলা, জিডি, লিগ্যাল নোটিস ও কারণ দর্শানোর নোটিস হয়েছে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অধ্যাপক আলতাফুন্নেসার বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. নাজিমুদ্দিন বেশিরভাগ অভিযোগ করেন। এর মধ্যে ডা. নাজিমুদ্দিন আলতাফুন্নেসা ও অন্য ট্রাস্টিদের বিরুদ্ধে আটটি মামলা, জিডি ও উকিল নোটিস করেছেন। ডা. নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে চেয়ারপারসন আলতাফুন্নেসা একটি ও ট্রাস্টি সন্ধ্যা রায় বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করেন একজন পরিচালক। ডা. মুহিব উল্লাহ চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছেন। অন্য মামলাও বিভিন্ন ট্রাস্টি ও পরিচালকরা একে অন্যের বিরুদ্ধে করেছেন।

ট্রাস্টের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ট্রাস্টি ডা. মনজুর কাদিরসহ অন্যদের দুর্নীতির বিষয়ে অভিযোগ দেওয়া হয় দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সমবায় অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। এসব ঘটনায় ফেঁসে যেতে পারেন এমন আশঙ্কায় ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অধ্যাপক আলতাফুন্নেসা গত ২৪ মে দেশ ত্যাগ করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. নাজিমুদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণস্বাস্থ্য ডা. জাফরুল্লাহ চালাতেন। আমি কখনই যেতাম না, শুধু মিটিংয়ে অংশ নিতাম। তিনি মৃত্যুর আগে ষড়যন্ত্রকারীদের বিষয়ে আমাদের সতর্ক করে গেছেন। তিনি মারা যাওয়ার পর তিন-চার মাস ভালোই চলছিল। এরপর ধীরে ধীরে দুর্নীতির খবর বের হতে শুরু করে।’

গণস্বাস্থ্যকে দুর্নীতিমুক্ত করতে আলতাফুন্নেসাকে নিয়ে কাজ শুরু করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একপর্যায়ে একটি জালিয়াত চক্র আলতাফুন্নেসাকে নিজেদের বলয়ে নিয়ে যায়। তখন তারা আমাকে গণস্বাস্থ্য থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। ওখানে এখন ভয়াবহ দুর্নীতি হচ্ছে।’

 

আক্ষেপ করে ডা. নাজিমুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জানি না গণস্বাস্থ্যকে রক্ষা করতে পারব কি না। ৮২ বছর বয়সে চেষ্টা করে যাচ্ছি। দেখা যাক কী হয়।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত