গাজায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালানোর বছরে অস্ত্র, নিরাপত্তা সহায়তাসহ বিভিন্ন খাতে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের ব্যবসা বেড়েছে। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
গত বছর ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। ৩৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি হত্যা, লাখো গাজাবাসীকে উদ্বাস্তু করেছে তারা। বিশ্ব জুড়ে তাদের এ নৃশংসতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলমান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ গাজায় হামলা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞায়ও পড়ছে ইসরায়েলকে সহায়তাকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং তাদের পণ্য। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর হলো, এ সময়ে ব্যবসা বেড়েছে ইসরায়েলের।
টাইমস অব ইসরায়েল তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, গত সোমবার দেশটির প্রকাশিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুসারে, বার্ষিক ইসরায়েলি অস্ত্র বিক্রি ২০২৩ সালেও অব্যাহত ছিল। টানা তৃতীয় বছরে তাদের অস্ত্র বিক্রি একের পর এক রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। গত পাঁচ বছরের তুলনায় যুদ্ধ শুরুর বছর যা প্রায় দ্বিগুণ হয়। ইসরায়েল থেকে এ সময়ে অস্ত্র কিনেছে জার্মানি। অন্যদিকে মিডল ইস্ট মনিটর জানাচ্ছে, চলতি বছরে মিসর, আরব আমিরাত ও জর্ডানের ব্যবসাও বেড়েছে। আর অ্যারাবিয়ান গালফ বিজনেস ইনসাইটের অনলাইনে বলা হচ্ছে, আরবের সাতটি দেশের সঙ্গে একই সময়ে যখন ইসরায়েলের ব্যবসা চার শতাংশ কমেছে, সেখানে বিশ্বের অন্য অংশের সঙ্গে তাদের ব্যবসা কমেছে ১৮ শতাংশ।
অস্ত্র ও নিরাপত্তা
টাইমস অব ইসরায়েল জানাচ্ছে, দেশটির আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অধিদপ্তর বলেছে, তাদের প্রতিরক্ষা রপ্তানি ২০২৩ সালে ছিল ১৩ বিলিয়ন ডলার। যা ২০২২ সালে ছিল ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন। ২০১৮ এবং ২০২০ সালের ভেতরে এ পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৫ বিলিয়নের মধ্যে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে, ৭ অক্টোবর হামলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে তারা ‘জরুরি ভাবে’ অস্ত্র উৎপাদন শুরু করে। পূর্ববর্তী আদেশের পাশাপাশি ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য অস্ত্র ও সরঞ্জাম তৈরির মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এ সময়ে বিদেশি চাহিদাও পূরণ করা হয়। তারা বলছে, গাজায় হামলা চালানোর মধ্যেই ২০২৩ সালে রেকর্ড রপ্তানি চুক্তি করা হয়। তারা এ সময়ে এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম রপ্তানি করেছে সবচেয়ে বেশি, যা মোট রপ্তানির ৩৬ শতাংশ। আগের বছর, অর্থাৎ ২০২২ সালে যা ছিল ১৯ শতাংশ। মূলত জার্মানির কাছে তারা ৪ বিলিয়ন ডলারের এ অস্ত্র বিক্রি করে।
তবে এ সময়ে তাদের ‘সাইবার ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম’ বিক্রি কমেছে। ২০২৩ সালে যা ছিল মোট রপ্তানির ৪ শতাংশ। এর কারণ অবশ্য ভিন্ন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের এ ধরনের আড়িপাতা ও নজরদারির প্রযুক্তি নিয়ে আপত্তি উঠেছে। কোথাও কোথাও তা তদন্তের আওতায় এসেছে। এমন অভিযোগও রয়েছে যে, এসব প্রযুক্তি রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে এর ক্রয়াদেশও কমেছে। এ ছাড়া চালকবিহীন বায়বীয় যান এবং ড্রোন, উড়োজাহাজ, আকাশপথে চলাচলের বৈদ্যুতিক যন্ত্র (এভিওনিক্স), পর্যবেক্ষণ ও যোগাযোগ যন্ত্র, যানবাহন, সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ, গোলাবারুদ এবং পরিষেবা রপ্তানি করেছে ইসরায়েল। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল ছিল ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা পণ্যের বৃহত্তম ক্রেতা। যা মোট রপ্তানির ৪৮ শতাংশ। এরপর রয়েছে ইউরোপ, তারা কিনেছে ৩৫ শতাংশ। এ ছাড়া উত্তর আমেরিকা ৯, লাতিন আমেরিকা ৩ এবং আফ্রিকা ১ শতাংশ ইসরায়েলি অস্ত্র ও অন্যান্য পণ্য কিনেছে। টাইমস অব ইসরায়েলে জানাচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মরক্কো ২০২০ সালের এক চুক্তিতে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও ২০২৩ সালে তারা অস্ত্র কিনেছে মাত্র তিন শতাংশ, যা ২০২২ সালে ছিল ২৪ শতাংশ। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট বলেন, গত এক বছরে ইসরায়েল সাতটি ভিন্ন প্রান্তের বিরুদ্ধে লড়াই করলেও প্রতিরক্ষা রপ্তানি রেকর্ড ভাঙতে অব্যাহতভাবে সফল হয়েছে। এ বছরের পরিসংখ্যানে দেখায় যে, আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্প যুদ্ধের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার পরও উল্লেখযোগ্য রপ্তানি চুক্তিতেও স্বাক্ষর করে চলেছে।
আরব বিশ্ব
মিডল ইস্ট মনিটর তথ্য দিচ্ছে, গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েলের সঙ্গে মিসরের রপ্তানি ২৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ। গাজায় নির্মম হামলা পরিচালনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান বিরোধাত্মক সম্পর্কের পরও অক্টোবর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে শক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হয়েছে। গত বছরে মিসরে ইসরায়েলি প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইসরায়েলে রপ্তানিও চলতি বছরের মে মাসে ২৪২ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা ২০২৩ সালের মে মাসে ২৩৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার ছিল। ইসরায়েলে জর্ডানের রপ্তানিও ২০২৪ সালে এসে বেড়েছে। এ বছর যার পরিমাণ মে মাস পর্যন্ত ৩৫ দশমিক ৭ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩২ দশমিক ৩। ইসরায়েল থেকে মিসর এবং জর্ডানে প্রাকৃতিক গ্যাস ও পানি রপ্তানির মূল্য দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি বলে অনুমান করা হয়।
অ্যারাবিয়ান গালফ বিজনেস ইনসাইট জানাচ্ছে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে এমন সাতটি আরব দেশের মধ্যে বাণিজ্য ২০২৩ সালে রেকর্ড ভেঙেছে। যা ২০২২ সালের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি, যার পরিমাণ ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সংবাদ মাধ্যমটি জানায়, তারা আব্রাহাম অ্যাকর্ডস পিস ইনস্টিটিউটের (এএপিআই) বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য নিয়েছে। যাতে বলা হয়, গত বছর অক্টোবরে গাজায় হামলা শুরুর পর দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য মাত্র ৪ শতাংশ কমে ৯৩৭ মিলিয়ন ডলার থেকে ৯০৩ মিলিয়ন হয়েছে।
তারা বলছে, এটি বহির্বিশ্বের সঙ্গে ইসরায়েলের বিপরীত চিত্র, যেখানে সামগ্রিক বাণিজ্য ১৮ শতাংশ কমেছে। এএপিআই ইসরায়েল সেন্ট্রাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস’র (সিবিএস) তথ্যের ওপর নির্ভর করে।
আব্রাহাম অ্যাকর্ড
আলোচিত আব্রাহাম অ্যাকর্ড ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে শুরু হয়। যার অধীনে ইসরায়েল সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান, কসোভো, মৌরিতানিয়া এবং মরক্কোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এই এএপিআই প্রতিষ্ঠিত হয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে। তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের নেতৃত্বে। তিনি তখন বলেছিলেন, আব্রাহাম চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ এবং আশার প্রতীক, এর মাধ্যমে দেশগুলো একত্র হবে এবং তাদের নাগরিকদের জীবন উন্নত হবে।
এ সংবাদ মাধ্যমটি জানাচ্ছে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস অনুযায়ী ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের মধ্যে পর্যটন, প্রযুক্তি, কৃষি এবং হীরার বাণিজ্য হওয়ার কথা। গাজায় সংঘাতের কারণে ২০২৩ সালে যা ১৪ শতাংশ কম দেখানো হয়েছে। এর আগে সাইবার, সফ্টওয়্যার, পরিষেবা এবং প্রতিরক্ষার মতো উল্লেখযোগ্য খাতগুলো অন্তর্ভুক্ত না
থাকলেও দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া মিসরের সঙ্গে ইসরায়েলের বাণিজ্য ১৬৮ শতাংশ বেড়েছে, যা ৭১ মিলিয়ন থেকে ১৯১ মিলিয়নে পৌঁছায় বলে প্রতিবেদন জানায়।
এর বাইরে মরক্কোর সঙ্গে বাণিজ্য ২৪ মিলিয়ন থেকে ২৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অবশ্য ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী জর্ডানের সঙ্গে বাণিজ্য ২০২২ সালের তুলনায় গত বছরের প্রথম ৯ মাসে ৮ এবং তারপরে শেষ প্রান্তিকে ৪২ শতাংশ কমেছে। অবশ্য জর্ডান কৃষি রপ্তানিতে উন্নতি করার কারণে এ বাণিজ্য কমেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় হামলা শুরু হলেও এসব দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ‘স্থিতিশীল’ ছিল। যদিও ইসরায়েলের প্রতি আঞ্চলিক জনমতের ওপর একটি শক্তিশালী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তেল ও গ্যাস
দ্য ক্রেডল ডটকম জানাচ্ছে, ইসরায়েল তার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। তারা প্রাকৃতিক গ্যাসের অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারক। ২০২০ সালে সালে তারা ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস রপ্তানি করেছে মিসর এবং জর্ডানে। অপরদিকে ইসরায়েল মূলত তেল আমদানি করে দুটি মুসলিম দেশ থেকে। তারা প্রতিদিন প্রায় ২২০ হাজার ব্যারেল তেল ব্যবহার করে। যা ৬২ শতাংশ আসে কাজাখস্তান (৯৩ হাজার ব্যারেল) এবং আজারবাইজান (৪৫ হাজার ব্যারেল) থেকে। অবশিষ্টাংশ ব্রাজিল ছাড়াও গ্যাবন, নাইজেরিয়া এবং অ্যাঙ্গোলাসহ পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো থেকে নেয় তারা। তবে কিছু অংশ ইরাকের
কুর্দিস্তান থেকে অবৈধভাবে পরিবহন করা হয় বলে জানা যায়। তারা জানায়, ইসরায়েলের বেশিরভাগ তেল আমদানির সুবিধার্থে তুর্কি বন্দর সেহান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি বাকু-তিবিলিসি-সেহান পাইপলাইনের মাধ্যমে কাস্পিয়ান সাগরের মধ্য দিয়ে কাজাখস্তান এবং আজারবাইজান থেকে অপরিশোধিত তেল বহনকারী ট্যাংকারগুলোর জন্য একটি ‘লোডিং পয়েন্ট’ হিসেবে কাজ করে। ট্যাংকারগুলোপ পূর্ব ভূমধ্যসাগর বরাবর ইরাকি কুর্দিস্তান থেকে হাইফা এবং আশকেলন বন্দরে তেল পরিবহন করে।
দ্য ক্রেডল বলছে, গাজা উপত্যকায় সামরিক হামলা শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলের প্রতি কিছু রাষ্ট্র উত্তেজনাপূর্ণ ও বিরোধাত্মক বক্তৃতা দিলেও, বাণিজ্য কার্যক্রম অনেকাংশে নিরবচ্ছিন্ন রয়েছে। তুরস্ক ইসরায়েলকে ‘সন্ত্রাসী’ রাষ্ট্র বললেও তেল পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গাজায় হামলা সত্ত্বেও তুর্কি রপ্তানি ২০২৩ সালের নভেম্বরে ৩১৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার থেকে ডিসেম্বরে ৪০৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
