উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ মুক্তি পেয়েছেন অবশেষে। দীর্ঘসূত্রতার পর তার এ মুক্তি কী বার্তা দিচ্ছে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নথি ফাঁস করে হইচই ফেলে দেওয়া ওয়েবসাইট উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনি অস্ট্রেলিয়ায় নিজ পরিবারের কাছে ফেরার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন বলে সর্বশেষ খবরে জানা গেছে। বিবিসি জানাচ্ছে, ‘অপরাধ’ স্বীকারে সম্মত হওয়া নিয়ে অ্যাসাঞ্জ সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় আসেন। যার ধারাবাহিকতায় তাকে ছেড়ে দিয়েছে যুক্তরাজ্য। চুক্তি অনুযায়ী, অ্যাসাঞ্জ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্বীকার করে নেবেন। তাকে নতুন করে আর কারাগারে যেতে হবে না। সিবিএসের খবরে বলা হয়, ‘নিজের অপরাধ স্বীকার করার জন্য মি. অ্যাসাঞ্জকে কারাগারে পাঠানো হবে না। উল্টো এতদিন তিনি যে কারাভোগ করেছেন, সেটির জন্য ক্ষতিপূরণ পাবেন।’ অ্যাসাঞ্জ এখন নিজের দেশ অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যাবেন বলে যুক্তরাজ্যের বিচার বিভাগের এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯ সালে গ্রেপ্তারের পর পাঁচ বছর যুক্তরাজ্যের কারাগারে ছিলেন অ্যাসাঞ্জ। সেখান থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের বিষয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছিলেন।
বিবিসি আরও জানাচ্ছে, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ২০০৬ সালে উইকিলিকস নামের ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠা করেন। মার্কিন সরকারের দাবি অনুযায়ী, ওয়েবসাইটটি তাদের এক কোটির বেশি গোপন নথি প্রকাশ করেছে। যা তাদের সরকারি গোপন তথ্য ফাঁসের সবচেয়ে বড় ঘটনা। উইকিলিকস ২০১০ সালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি ভিডিও প্রকাশ করে। যাতে দেখা যায়, ইরাকের বাগদাদে রয়টার্সের দুই সাংবাদিকসহ এক ডজনেরও বেশি ইরাকি বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে।
এ ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর অ্যাসাঞ্জের অন্যতম সহযোগী মার্কিন সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষক চেলসি ম্যানিংকে ৩৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে তথ্য ফাঁসের অভিযোগে মার্কিন সরকারের মামলা ছাড়াও সুইডেনেও অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের পৃথক অভিযোগ তোলা হয়। সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন অ্যাসাঞ্জ। তবে এ মামলার পর অ্যাসাঞ্জ ইকুয়েডরের লন্ডন দূতাবাসে সাত বছর আশ্রয় নিয়েছিলেন। যদিও পরে তিনি লন্ডন পুলিশের কাছে ধরা দেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় ২০২১ সালে তিনি একবার হৃদরোগেও আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে জানায় বিবিসি।
অ্যাসাঞ্জের বাবা জন শিপটন মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়াকে বলেছেন, মনে হচ্ছে জুলিয়ান তার পরিবার এবং স্ত্রী স্টেলার সঙ্গে একটি সাধারণ জীবন উপভোগ করতে সক্ষম হবে।
সংবাদমাধ্যমের জন্য যে বার্তা
গার্ডিয়ানের ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জুলিয়ান বোর্গার অ্যাসাঞ্জের এ মুক্তিতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে পারছেন না। তিনি এক প্রবন্ধে লেখেন, যুক্তরাজ্যের কারাগার থেকে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মুক্তি তার এবং বিশ্ব জুড়ে তার অনেক সমর্থকের জন্য একটি বিজয়, তবে তার সুরক্ষা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অন্তর্নিহিত নীতির জন্য একে স্পষ্ট জয় হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। তার ভাষ্য, অ্যাসাঞ্জ ১৯১৭ সালের গুপ্তচরবৃত্তি আইনে উল্লিখিত, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত শ্রেণিবদ্ধ তথ্য বেআইনিভাবে হস্তগত এবং প্রচার করা’র ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছেন এমন দোষ স্বীকার করছেন। অ্যাসাঞ্জ মুক্তি পেলেও এ গুপ্তচরবৃত্তি আইন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য নয়, সেখানে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে রিপোর্ট করা অপরাপর সাংবাদিকদের মাথার ওপরও ঝুলবে। অ্যাসাঞ্জ নিজে একজন অস্ট্রেলিয়ান, মার্কিন নাগরিক নন।
তিনি আরও লেখেন, অ্যাসাঞ্জকে যে কাজগুলোর জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছিল, ‘শ্রেণিকৃত তথ্য হস্তগত করা এবং প্রচার করা’, তা জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সাংবাদিকরা জীবিকার জন্য করে থাকে। ২০১০ সালে ইরাক ও আফগান যুদ্ধের বিষয়ে উইকিলিকস যেসব তথ্য প্রকাশ করেছিল; সেগুলো ফাঁস করেন সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিশ্লেষক চেলসি ম্যানিং। সেই যুদ্ধগুলোতে মার্কিন সেনাবাহিনী দ্বারা সম্ভাব্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নজরে এসেছিল। সেগুলো গার্ডিয়ান এবং অন্যান্য সংবাদ সংস্থা প্রকাশ করে। এসব গোপন তথ্য প্রকাশ্যে আনা হয় জনস্বার্থের জন্য। জুলিয়ান বোর্গার লেখেন, ২০২১ সালে ক্ষমতায় এসে বাইডেন প্রশাসন তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আনা গুপ্তচরবৃত্তি আইনের অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করতে পারত। বাইডেনের অধীনে মার্কিন প্রসিকিউটররা ট্রাম্পের অভিযোগগুলো বেছে নিয়েছিলেন এবং যুক্তরাজ্য থেকে অ্যাসাঞ্জকে হস্তান্তরের লড়াই করেন। নির্বাচনের বছরে বাইডেন প্রশাসনের এ ধরনের বিচার উদার ও প্রগতিশীলদের ক্ষুব্ধ করবে বলেও মনে করেন বোর্গার। তিনি লেখেন, এর আগে বাইডেন অস্ট্রেলিয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে বিচার না চালানোর কথা বলেন। যদিও তার সেই কথা বাস্তবায়িত হয়নি। মনে হয় বন্দুকের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত অ্যাসাঞ্জকে সাজা দিয়েছে।
ব্যতিক্রম
বিবিসি তার এক প্রতিবেদনে বলছে, সমর্থকদের কাছে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ সত্যের পক্ষে এক সাহসী প্রচারক। আর সমালোচকদের কাছে তিনি এক প্রচার প্রত্যাশী, যিনি জনপরিসরে প্রচুর সংবেদনশীল তথ্য উন্মুক্ত করে জীবন বিপন্ন করেছেন। অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে যারা কাজ করেছেন তারা তাকে সদা সক্রিয় এবং অত্যন্ত বুদ্ধিমান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কম্পিউটার কোড ভাঙার ব্যতিক্রমী ক্ষমতা তার বৈশিষ্ট্য। অ্যাসাঞ্জ সাধারণত তার ব্যক্তিগত অতীত সম্পর্কে কথা বলতে অনিচ্ছুক। তবে উইকিলিকসের উত্থানের পর সংবাদমাধ্যমের আগ্রহে কিছু কিছু তথ্য জানা গেছে তার বিষয়ে। তিনি ১৯৭১ সালে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের টাউনসভিলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮ বছর বয়সে বাবাকে হারান এবং শিগগিরই জীবন যুদ্ধ শুরু করেন। ইন্টারনেটের বিকাশ গণিত বিষয়ে তার আগ্রহ প্রশমনের সুযোগ করে দেয়। ১৯৯৫ সালে অ্যাসাঞ্জ এক বন্ধুর সঙ্গে হ্যাকিং কার্যকলাপের জন্য অভিযুক্ত হন। যদিও হ্যাকার দলটির অন্যরা গোয়েন্দাদের নজরদারি এড়াতে যথেষ্ট দক্ষ ছিলেন, কিন্তু অ্যাসাঞ্জ অবশেষে ধরা পড়ে যান এবং দোষী সাব্যস্ত হন। তাকে কয়েক হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার জরিমানা করা হয়। এ শর্তে মুক্তি পান যে, এমন অপরাধ আর করবেন না। এরপর তিনি একাডেমিক কাজে নিয়োজিত করেন নিজেকে। পদার্থবিদ্যা এবং গণিত অধ্যয়নের আগে ইন্টারনেটের বিকাশ ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে বহুল বিক্রীত বইয়ের সহলেখক ছিলেন অ্যাসাঞ্জ।
উইকিলিকস চালানোর সময়ে অ্যাসাঞ্জ যাযাবর জীবনযাপন করতেন। তার ঠিকানা ছিল অস্থায়ী, বিভিন্ন স্থান থেকে উইকিলিকস চালাতেন। নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদক জানান, তিনি অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ ভ্রমণ করেছেন। তিনি দেখেছেন অ্যাসাঞ্জ দীর্ঘ সময় না খেয়েও কাজ করে যেতে পারতেন এবং খুব কম সময় ঘুমাতেন, সারাক্ষণ কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন। অ্যাসাঞ্জ চারপাশে এমন পরিবেশ তৈরি করতেন যেখানে তার কাছের লোকেরা তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠত, যতœ নিতে চাইত।
তিনি বলেন, ‘আমি বলব যে সম্ভবত তার ক্যারিশমা আছে।’
ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে লন্ডনের কারাগারে যাওয়ার পর বাগদত্তা স্টেলা মরিসকে কারাগারেই বিয়ে করেন অ্যাসাঞ্জ। এ জুটির দুটি সন্তান রয়েছে। এ ছাড়া ‘বেওয়াচ’ তারকা পামেলা অ্যান্ডারসন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বন্ধু বলেও জানা যায়। পামেলা প্রকাশ্যে এ তথ্য স্বীকার করেন। তবে তাদের সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল তা জানা যায়নি।
উইকিলিকস
উইকিলিকস অনেকগুলো তথ্য ফাঁস করে পৃথিবীকে চমকে দিয়েছিল। বিবিসির সূত্রমতে, তার মধ্যে ছিল ২০১০ সালের একটি ভিডিও। যাতে দেখা গেছে ইরাকের বাগদাদে মার্কিন হেলিকপ্টার থেকে চালানো হামলায় কীভাবে বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। ভিডিওতে একটি কণ্ঠ শোনা গেছে। সেই কণ্ঠকে বলতে শোনা গেছে, সবাইকে জালিয়ে দাও। এরপরই বিভিন্ন ব্যক্তিকে লক্ষ করে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়া হয়। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখ নিউ ইয়র্কে টুইন টাওয়ারে হামলার দিন একে অপরের খবর নিতে মানুষজন যেসব পেজার বার্তা প্রদান করেছিলেন তার মধ্যে থেকে প্রায় ছয় লাখ বার্তা প্রকাশ করে উইকিলিকস।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বার্তাটি ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্পর্কিত। তাতে লেখা ছিল, প্রেসিডেন্টের গমনপথ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। তিনি ওয়াশিংটনে ফিরছেন না। তবে কোথায় যাবেন সে নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
এ ছাড়া ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের প্রচারণা বিষয়ক প্রধান জন পোডেস্টার ইমেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা কয়েক হাজার ইমেইল ফাঁস করা হয়। তাতে ডেমোক্র্যাট পার্টি থেকে মনোনয়নের আগে দলের মধ্যে হিলারি ক্লিনটনের প্রতিদ্বন্দ্বী বার্নি স্যান্ডার্স সম্পর্কে কটূক্তি করা হয়। ২০১৫ সালে মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সনি পিকচারসের প্রায় দুই লাখ ইমেইল ও বিশ হাজার নথি ফাঁস করে উইকিলিকস। সেসব ইমেইলে জানা যায়, এনজেলিনা জোলিসহ বিখ্যাত তারকাদের সম্পর্কে কোম্পানিটির প্রোডিউসার কী রকম কটূক্তি করেছেন। অ্যাসাঞ্জের বিচারের চাকা ধীরে ধীরে ঘুরেছে। তার প্রত্যর্পণের শুনানি ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়। মে মাসে আবার স্থগিত করা হয়। তারপর সেপ্টেম্বরে পুনরায় বিচার শুরুর আগে করোনভাইরাস প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে তিনি একটি স্বল্পস্থায়ী বিজয় পান। তখন যুক্তরাজ্যের জেলা বিচারক ভেনেসা বারাইটসার রায় দেন যে, অ্যাসাঞ্জের মানসিক অবস্থা এমন যে, তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তর করা নিপীড়নমূলক হবে। যার ধারাবাহিকতায় অ্যাসাঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দুঃখ প্রকাশের শর্তে মুক্তি পেতে যাচ্ছেন। তাকে যে সাজা দেওয়া হয়েছে, তা তিনি যুক্তরাজ্যেই কাটিয়ে ফেলেছেন। তাই আর কারাগারে থাকতে হবে না। এখন মুক্তি জীবনে ফিরতে পারবেন। তবে প্রশ্ন হলো, আগের সেই অ্যাসাঞ্জকে কি ফিরে পাওয়া যাবে?
