বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি, বর্তমান পেনশন সুবিধায় তাদের বেতনের কোনো টাকা কাটা হয় না। কিন্তু সর্বজনীন পেনশনে তাদের ১০ শতাংশ কাটা হবে। পেনশন কর্তৃপক্ষ এটি স্বীকার করে বলেছে, এখন যে পদ্ধতি সেটি ‘আনফান্ডেড ডিফাইন বেনিফিট সিস্টেম’ আর নতুন যে পদ্ধতি আসছে সেটি হলো ‘ফান্ডেড কন্ট্রিবিউটরি পেনশন সিস্টেম’। যেহেতু এটি কন্ট্রিবিউটরি পেনশন সিস্টেম, তাই যারাই এ পেনশনের আওতায় থাকবেন, তাদের কাছ থেকে টাকা কাটা হবে। বিবেচনার বিষয় হলো, যে টাকা কাটা হবে তার পরিমাণ কত আর অবসরে যখন যাবেন তার প্রাপ্তি কত। প্রাপ্তি যদি কর্তনের চেয়ে বেশি হয় বা লাভজনক হয় তাহলে সেখানে আপত্তি থাকার কথা নয়। একজন সর্বোচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তার কাছ থেকে কাটা হবে সর্বোচ্চ ৫ হাজার। ৩০ বছরে কাটলে মোট অঙ্ক দাঁড়ায় ১৮ লাখ টাকা। ওই কর্মকর্তা ৩০ বছর চাকরির পর যখন পেনশনে যাবেন তখন প্রতি মাসে পাবেন ১ লাখ ২৪ হাজার টাকা করে। প্রত্যয় স্কিমের পেনশনার যদি ১৫ বছর ধরে পেনশন পান, সে ক্ষেত্রে তার মোট প্রাপ্তি হবে ২ কোটি ২৪ লাখ ৩৮ হাজার ৮০০ টাকা, যা তার জমার প্রায় ১২ দশমিক ৫ গুণ। পেনশনার পেনশনে যাওয়ার পর ৩০ বছর জীবিত থাকলে তার জমার প্রায় ২৫ গুণ অর্থ পাবেন।
আরও পড়ুন
আন্দোলনরত শিক্ষকরা দাবি করছেন, তারা প্রত্যয় স্কিমে গেলে প্রায় কোটি টাকা ক্ষতি হবে। এ যুক্তির ব্যাখ্যায় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য গোলাম মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উনারা কীভাবে হিসাব করেছেন, আমি জানি না। উনারা কী পাবেন তা স্পষ্ট বলা আছে। সেটিকে যদি যোগ-বিয়োগ করে অঙ্ক করেন, তাহলে দেখা যাবে এখন তারা যা পান, কোনো অবস্থাতেই সর্বজনীন পেনশনে তার চেয়ে কম পাবেন না। এখন যারা আছেন তারা আগের সিস্টেমের মধ্যেই আছেন। নতুন সিস্টেমে যারা ১ তারিখ থেকে যোগ দেবেন, তারা এ সুবিধার আওতায় আসবেন। যারা নতুন যোগ দেবেন, তারা দেখেই যোগ দেবেন যে, কী সুবিধা আমি পাচ্ছি।’
শিক্ষকদের দাবি, বর্তমান সর্বজনীন পেনশনে তাদের কোনো আনুতোষিক নেই। অথচ বিদ্যমান ব্যবস্থায় তারা আনুতোষিক বাবদ এককালীন ৮০ লাখ ৩০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। এ বিষয়টির ব্যাখ্যায় গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমাদের বক্তব্য হলো আনুতোষিক যোগ করেন, ৩০ বছর যদি বেঁচে থাকেন, ১ লাখ ২৪ হাজার টাকা করে তিনি কত টাকা পাবেন সেটিও দেখুন। এখন যারা প্রথম গ্রেডে থেকে অবসরে যান তারা প্রাথমিকভাবে পেনশন পান ৩৫ হাজার ১০০ টাকা। তার সঙ্গে পান ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, দুই ঈদে ৩৫ হাজার ১০০ টাকা করে দুটি উৎসব ভাতা, ২০ শতাংশ নববর্ষ ভাতা পান। সব যোগ দিন আর ১ লাখ ২৪ হাজার টাকা করে ৩০ বছর ধরে পেলে কত পাবেন সেটি যোগ করে দেখেন। প্রাপ্তি যদি বেশি হয় তাহলে আপত্তি থাকার কথা নয়।’
চাকরিজীবী ও নমিনি আজীবন পেনশন পান এমন প্রসঙ্গ তুলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা বলছেন, প্রত্যয় স্কিমে এমন সুবিধা নেই। এর ব্যাখ্যায় গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘বাস্তবতা হলো নমিনি নয়, শুধু স্ত্রী-স্বামীই পাবেন অথবা তার যদি কোনো প্রতিবন্ধী সন্তান থাকে তাহলে বর্তমান ব্যবস্থায় আজীবন পেনশন পান। আর স্ত্রী-স্বামী ও প্রতিবন্ধী ছাড়া অন্য যে কেউ ১৫ বছরের অবশিষ্ট সময় ভাতা পান। অর্থাৎ ছেলের যদি ২৫ বছরের নিচের বয়স হয়, তাহলে তার বাবা মারা যাওয়ার সময় যদি পাঁচ বছর ভোগ করে যান, ছেলে আর ভোগ করতে পারবেন ১০ বছর। শর্ত হলো, বয়স ২৫ বছরের কম হতে হবে। অর্থাৎ স্ত্রী-স্বামী ও প্রতিবন্ধী সন্তান আজীবন পান আর অন্যরা ১৫ বছর পর্যন্ত পান।’
এখানে শিক্ষকরা দাবি করছেন, নমিনি কেন আজীবন পাবেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নমিনিরা আজীবন পেনশন পান না, শুধু স্ত্রী-স্বামী ও প্রতিবন্ধী সন্তান ছাড়া। অথচ নতুন সর্বজনীন পেনশনে তার স্ত্রী-স্বামীর যেকোনো স্কিমে ঢোকার সুযোগও আছে। অর্থাৎ বিদ্যমান ব্যবস্থায়ও কোনো সরকারি চাকরিজীবী পেনশনের আওতায় এলেও তার স্ত্রী বা সন্তান কোনো পেনশনের আওতায় থাকেন না।
গোলাম মোস্তফা বলেন, সর্বজনীন পেনশনে যে কেউ নতুন কোনো স্কিমে যুক্ত হতে পারেন। এখন সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী যদি মনে করেন তিনিও পেনশন স্কিমে যোগ দেবেন, তিনিও পারবেন। তিনি তার স্বামীর অবসরের পর মারা গেলে তার বয়স ৭৫ বছর পর্যন্ত অবশিষ্ট পেনশনও পাবেন, নিজেরটাও পাবেন। আরেকটি ইস্যু হলো, পেনশন হলো সামাজিক নিরাপত্তা। এর আওতায় প্রত্যেকটি মানুষকে যদি আনা যায়, তাহলে সবাই নিরাপত্তায় থাকবেন।
শিক্ষকদের বছরে পেনশনে ইনক্রিমেন্ট হয় ৫ শতাংশ, তাদের দাবি প্রত্যয় স্কিমে সেটি থাকছে না। পেনশন কর্তৃপক্ষ বলছে, ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার সঙ্গে ৫ শতাংশ হারে যুক্ত করলেও ৮০ বছর বয়সে এসেও দেখা যাবে ১ লাখ ২৪ হাজার টাকা তিনি পাচ্ছেন না।
শিক্ষকদের আরেকটি দাবি, অর্জিত ছুটির বিপরীতে যে টাকা পাওয়া যায় সেটি প্রত্যয় স্কিমে নেই। তবে পেনশন কর্তৃপক্ষ বলছে সেটি বহাল আছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘কারও অর্জিত ছুটি যদি জমা থাকে তাহলে তিনি অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) পান আর ১৮ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ টাকা পান। এ দুটি বিষয় প্রত্যয় স্কিমেও বহাল আছে। প্রজ্ঞাপনে এ দুটি বিষয় উল্লেখ নেই দেখেই, শিক্ষকরা ওই কথা বলছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছুটি জমা থাকলে আমি সেটি পাব, পেনশনের সঙ্গে সেটিকে লিংক করার কোনো প্রয়োজন নেই।’
শিক্ষকদের আরেকটি দাবি, তাদের অবসরের বয়স ৬৫ বছর, কিন্তু সর্বজনীন পেনশনে তা ৬০ বছর। এর ব্যাখ্যায় গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উনাদের যেহেতু ঘোষিত অবসর বয়স ৬৫ বছর, কারও সুবিধা কাটা যায় না। এ ঘোষিত বিষয়ে সরকার সংশোধন করে দেবে। এটাতে যে সংশোধনী আনার প্রয়োজন আমরা দ্রুতই সেটি আনব। আমরা ইচ্ছা করলেই তো তাদের বয়সসীমা ৬০-এ নামিয়ে আনতে পারব না, সুতরাং এটি সংশোধন করা হবে।’
শিক্ষকরা পেনশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসতে চান, পেনশন কর্তৃপক্ষও বলছে বসার সুযোগ আছে। পেনশন কর্তৃপক্ষের এ সদস্য বলেন, ‘আমরা সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ। নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষ সরকার। শিক্ষকদের বসতে হলে বসতে হবে সরকারের সঙ্গে। সরকার যদি মনে করে পেনশন কর্তৃপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে বসবে, সেটিও হতে পারে।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এগুলো হচ্ছে ফাঁদ, পেনশন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। এটি আমাদের চলমান আন্দোলন বিভ্রান্ত করার অপ্রকৌশল বলে মনে করি। তাদের ব্যাখ্যায় শুভংকরের ফাঁকি আছে।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের জন্য এটা কীভাবে বেনিফিট হবে, কোনো ক্যালকুলেশনেই আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। অবসরে যাওয়া পর্যন্ত আমার বেসিক টাকা ৭৮ হাজার টাকা পাব, সেখান থেকে কোনো টাকা কাটা হবে না। কিন্তু প্রত্যয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাটা হবে। আনুতোষিকে প্রত্যয় স্কিমে শূন্য দেবে। আরেকটা ফাঁকি হচ্ছে, মাসে মাসে ৫ হাজার টাকা কেটে সেটি জমা হবে, ৩০ বছর পর এই টাকার কোনো মূল্য থাকবে? মূল্যস্ফীতি হবে না? প্রত্যয় স্কিমে আমাদের জন্য সুবিধা শূন্য।’
বয়সের সংশোধনীর বিষয়ে ড. জিনাত বলেন, ‘বয়সের সংশোধনী করাও সহজ নয়, এটা একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হয়। এসবের জন্য অনেক আন্দোলন করতে হয়েছে আমাদের। পেনশন কর্তৃপক্ষ এমন শক্তিশালী হয়ে যায়নি যে, প্রেস রিলিজ দিয়ে সংশোধন করে দেবে।’
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একসঙ্গে আন্দোলন করছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। এটি আমাদের বাঁচা-মরার লড়াই। শুধু প্রত্যয় স্কিম নয়, আমাদের আরও দুটি দাবি আছে, সেসবও পূরণ হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এখনো পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে কেউই বসেনি, কথা বলেনি। আমাদের ভুল হলে সেটা আমাদের সঙ্গে বসে দেখিয়ে দিক, সেটাও তো করছে না। তারা যদি আমাদের বেশি সুবিধা দেয়, তাহলে তো আমরা খুশি হব, আন্দোলন করব কেন?’
প্রত্যয়ে ১৫ বছরে পাবে দুই কোটি ২৪ লাখ টাকা