কোটা আন্দোলনে যুক্তি মানতে হবে, দুর্ভোগ নিয়ে ভাবতে হবে

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৪, ০৯:৪৫ পিএম

‘কোটা’ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা হচ্ছে। বিশেষ করে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ কোটা। ১৯৭২ সাল থেকে চালু হওয়া কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে চাকরি প্রত্যাশী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’-এর নেতৃত্বে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ এবং মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করছে। লাগাতার আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৪৬ বছর ধরে চলা কোটাব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করে সরকার। পরবর্তীকালে হাইকোর্ট বাতিলকৃত কোটা পুনরায় বহাল করে। ফলে আবার আন্দোলন ছড়িয়ে পরে। যা এখনও চলছে। 

এই আন্দোলনের যৌক্তিকতা আছে বলে মনে করেন না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘সরকারি চাকরিতে কোটার বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি করা উচিত। হাইকোর্টের রায়, এটার বিরুদ্ধে এভাবে আন্দোলন করা তো সাবজুডিস। কারণ আমরা সরকারে থেকে কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে পারি না। কারণ হাইকোর্ট রায় দিলে সেটা হাইকোর্ট থেকেই আবার আসতে হবে।’ আগস্ট মাসে চূড়ান্ত শুনানিতে শিক্ষার্থীদের দাবি সুবিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেবেন আদালত।’ 

শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেছেন, আপিল বিভাগের রায়ের পর কোটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কোনো যৌক্তিকতা নেই।

তিনি বলেন, আপিল বিভাগের আগের রায়ের স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে বলেছেন। অর্থাৎ যেমন আছে, তেমন থাকবে। কোটা থাকছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, এখন যেহেতু স্থিতাবস্থা আছে তাই আগের চাকরি যেগুলো চলমান আছে, সেগুলো ঠিক থাকবে। কোটা বাতিলসংক্রান্ত ২০১৮ সালের পরিপত্রের ভিত্তিতে যেসব সার্কুলার দেওয়া হয়েছে, সে ক্ষেত্রে কোটা থাকছে না। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশের বেশি কোটা রয়েছে। যার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, জেলাভিত্তিক কোটা ১০ শতাংশ, নারীদের জন্য ১০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ। তবে এসব কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে ১ শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। 

১৯৭২ সালে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়। সে সময় মেধাতালিকা ২০ শতাংশ বরাদ্দ রেখে, ৪০ শতাংশ জেলাভিত্তিক, ৩০ শতাংশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য এবং ১০ শতাংশ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। একটি রাষ্ট্রের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে শাসন কার্যে অন্তর্ভুক্ত করাসহ জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য ক্ষেত্রগুলোতে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্যই এই ব্যবস্থার আবির্ভাব হয়েছে। তাহলে কোটা বিরোধিতার যুক্তি কী?

বর্তমানে কোটা বিরোধী আন্দোলনের যে চেহারা, তাতে জনগণের শতভাগ সমর্থন রয়েছে? এই যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একজন কর্মজীবীর রাস্তায় আটকে থাকা, শ্রমজীবীর অলস সময় কাটানো, নিম্নশ্রেণির শ্রমিকদের অসহায় মুখ কে দেখেছে? এর সমাধান কী? 

কোটা নিয়ে বিরোধিতার যেমন সুযোগ আছে, তেমনি একে সমর্থনেরও কারণ রয়েছে। আমরা যত কল্যাণমূলক আন্দোলনই করি না কেন, জনগণের ভোগ-দুর্ভোগের বিষয়টি মাথায় রেখে আান্দোলনের কর্মসূচি ঠিক করা দরকার। যত যাই হোক, যারা আন্দোলন করছেন তারা আমাদেরই সন্তান। একটা বিষয় বুঝতে হবে, যেহেতু বিষয়টি আদালতের কাছে, তখন আর কিছু করার থাকে না। এরপরও যদি আন্দোলন চলতেই থাকে, তাহলে যৌক্তিক আন্দালন নিশ্চিতভাবেই অযৌক্তিকতার দিকে গড়াবে। তখন জনগণের সমর্থন থাকবে না। পরিস্থিতি চলে যাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

এখনও সময় আছে। সুপরিকল্পনা এবং উদ্দেশ্য সৎ থাকলে কোনো সমস্যাই প্রকৃত অর্থে সমস্যা নয়। শুধু শুধু বিষয়টি জটিল করে তোলা কারও জন্যে কল্যাণকর হবে না।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত