বছরের প্রত্যেক মাসেই কোনো না কোনো পণ্য নিয়ে কারসাজি চলতেই থাকে। পণ্য মজুদ করে সৃষ্টি করা হয় কৃত্রিম সংকট। দেশব্যাপী সর্বস্তরের ক্রেতার, কিছু পণ্যের বারোমাস চাহিদা থাকায় বাড়তে থাকে পণ্যমূল্য। প্রায় সময়ই প্রশাসনের বিভিন্ন সেক্টরের মানুষজন দলবল নিয়ে, বিভিন্ন পণ্য মজুদদারদের চিহ্নিত করেন। বর্তমানে প্রায়ই দেখা যায় শত শত মণ ধান-চালের বস্তাসহ তারা ধরা পড়ছেন। এরপর সেই গুদাম সিলগালা করা হয়। ওই পর্যন্তই। এর পরের খবর কেউ জানেন না। কী ধরনের শাস্তি তারা পান? নাকি সবাই নির্দোষ! এই অবস্থা যখন বছরের পর বছর চলতে থাকে, তখন নিত্যপণ্যমূল্য সবসময় সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
চাল ও ধানের বাজারের অস্থিরতার জন্য মজুদদাররা দায়ী এমন ইঙ্গিত সরকারের পক্ষ থেকে অনেকেই করেন। আবার কেউ হুঁশিয়ারি দেন, অবৈধভাবে চাল মজুদ করলে মজুদদার যে দলেরই হোক, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। দাম বাড়তেই থাকে। তবে কোনো ধরনের তদন্তের আগেই ধান ও চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে মজুদদারদের ঢালাওভাবে দায়ী করার পক্ষে নন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতারা। সবার কথা, ‘যে অন্যায় করবে, তাকে শাস্তি দেওয়া হোক। কিন্তু আগে সঠিক তদন্ত করতে হবে, কেন দাম বেড়েছে।’ আবার দাম বৃদ্ধির জন্য দোকানিরা দায়ী নন, দাম ক্রেতার ওপর নির্ভর করে এমন দাবি করেন দোকানিদের নেতারা। চালকল মালিকরাই কারসাজি করে নানা অজুহাতে দাম বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ করেন আড়তদাররা। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মিল মালিকদের কারসাজিতে অস্থির হচ্ছে চালের বাজার। বিভিন্ন অজুহাতে তারা দাম বাড়িয়েছে। ঘটনা যাই হোক, ভোক্তা পর্যায়ে পাইকারি ও খুচরা বাজারে চালের দাম বেড়েছে। মিল মালিকদের দাবি, ধানের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। কিন্তু দায়ী করবে কাকে! বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় চালের বাজারে চলছে অস্থিরতা। মজুদ থাকে ধান নাকি চাল? নাকি উৎপাদনেই ঘাটতি! রবিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত হয়েছে- ‘বাজার শূন্য মজুদের ভাণ্ডার পূর্ণ’ প্রতিবেদন। দেশের শস্যভাণ্ডারখ্যাত উত্তরের জেলা দিনাজপুরে ধান ও চালের দাম বাড়ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৬ টাকা করে বেড়েছে চালের দাম। যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। আর এতে করে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। বিভিন্ন সময় নিত্যপণ্যে অস্থিরতার দায় কার?
দেশের বাজারে হঠাৎ করে চালের দাম এভাবে বেড়ে যাওয়া রোধে সরকারে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব রয়েছে বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। এজন্য দ্রুত বাজার তদারকি বাড়ানোর তাগিদ তাদের। বাজারে ধান, চালের অবৈধ মজুদবিরোধী অভিযান জোরদারে ইতিমধ্যে পাস হয়েছে মজুদবিরোধী আইন। দ্রুত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের তাগিদ বিশ্লেষকদের। চালের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে ধানের দাম বৃদ্ধি কতটা দায়ী, সেটা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। দেখা দরকার, এতে কৃষক উপকৃত হচ্ছে কি না? কারণ তাদের একটি বড় অংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি। ধানসহ খাদ্যশস্য উৎপাদনে এদের ভূমিকা প্রবল। আসলে ‘সাপ্লাই চেইন’-এর কোথায় মজুদদারি হচ্ছে, সে বিষয়টি খুঁজে দেখা দরকার। জনসংখ্যা বাড়ছে, আবার তার ওপর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। উৎপাদন বাড়াতে পারলেই মজুদদার থাকবে না। বর্তমানে সার, বীজ, সেচ, বিদ্যুৎ এসবের কোনো সংকট নেই। সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে দীর্ঘ সময় বিপুল পরিমাণ ধান-চাল মজুদ রাখা যে করেই হোক বন্ধ করতে হবে। মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর না হতে পারলে, দেশের সাধারণ মানুষকে কোনোভাবেই শান্ত রাখা যাবে না। আর অশান্ত পরিবেশে সরকার পরিচালনা করা খুবই কঠিন বিষয়। অন্যদিকে এই পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার জন্য, একটি পক্ষ কিন্তু প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। বাকিটা সরকারের ওপর নির্ভর করে।