বিএনপির আদর্শ থেকে পথনকশা

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১১ এএম

দেশের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান প্রাণহীন, জরাজীর্ণ ও শতধাবিভক্ত। এমন এক পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কারণ ১৯৭৫ সালে দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বাকশাল গঠন করে বামপন্থি দলসহ সব  রাজনৈতিক দলকে বেআইনি ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চারটি দৈনিক রেখে, সমস্ত সংবাদপত্র বন্ধ করে হরণ করা হয় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। ফলে দেশে সীমাহীন নৈরাজ্য, অস্থিরতা ও রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়। সেই বছরের ১৫ আগস্টে পটপরিবর্তনের পর, তারই ঘনিষ্ঠ সহকর্মী আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগেরই একটি অংশ ক্ষমতা দখল করে এবং সামরিক আইন জারি করে। কিন্তু খন্দকার মোশতাকের ৮৩ দিনের শাসনকাল ঘাত-প্রতিঘাতে পরিপূর্ণ ছিল। সংকট, সন্দেহ, পারস্পরিক দোষারোপ, ক্যু ও পাল্টা ক্যু-এর অগ্নিঝরা ’৭৫-এর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, সিপাহি-জনতা অবরুদ্ধ জিয়াকে মুক্ত করে কীভাবে দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব প্রদান করেছেন সে সম্পর্কে ইতিহাস সচেতন দেশবাসী জানেন।

বিদ্যমান পরিস্থিতি তাকে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ও নতুন রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ গঠনে উদ্বুদ্ধ করে। জিয়াউর রহমানের মস্তিষ্কজাত নতুন দলের সংযোজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কেমন হবে, এর দার্শনিক ভিত্তি কী হবে তার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা পাওয়া গেছে। গ্রহণযোগ্যতার বিচারে শীর্ষস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। কারণগুলোর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো ১) মুক্তিযুদ্ধে জনগণের অংশগ্রহণের মূল উদ্দীপক স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের ভিত্তিতে সরকার গঠনে নাগরিকদের অংশগ্রহণ (ভোটাধিকার) নিশ্চিত করার মাধ্যমে ‘গণতন্ত্র  প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার’ বাস্তবায়ন করা; ২) জাতির আত্মপরিচয় অন্বেষণ ও তদানুসারে শাসনব্যবস্থায় জাত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দেশবাসীর ইচ্ছার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা; ৩) জনগণকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি কূটনৈতিক দক্ষতার সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের সঙ্গে দুর্ভিক্ষকবলিত বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে এনে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লালিত স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করা; এবং ৪) দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষা করা। এই লক্ষ্যগুলো অর্জনই ছিল জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রভাবনার মূল প্রেরণা।

অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের প্রথম কর্মপন্থা হিসেবে নিজেকে তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরাসরি সম্পৃক্ত করেন এবং ৩ জুন, ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করেন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে তিনি নির্বাচনী রাজনীতি পুনর্বহাল করে দেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। লক্ষ্য অর্জনের দ্বিতীয় কর্মপন্থা হিসেবে জিয়াউর রহমান জাতির আত্মপরিচয় অন্বেষণে নিজেকে নিয়োজিত করেন। বাহাত্তরের সংবিধানে আমাদের পরিচয় ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত হলেও, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান এই ধারণায় পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করেন। নাগরিক হিসেবে সবার অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে, জাতি হিসেবে আমাদের পরিচয় কী তা স্পষ্ট হতে হবে। তিনি বলেন, ‘‘যদি আমরা জাতীয় পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘বাঙালি’ পরিভাষা ব্যবহার করি, তাহলে বাংলাদেশের ভূখ-ে বসবাসরত অবাঙালি বাংলাদেশি নাগরিকরা জাতীয় পরিচয়ের বলয় থেকে ছিটকে যাবে। এটি আমাদের জাতিসত্তার একটি খ-িত পরিচয় তুলে ধরে। জিয়াউর রহমান তাই দেশের বাঙালি ও অবাঙালিসহ সব নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় পরিচয়ের মাধ্যম হিসেবে ‘বাঙালি’র স্থানে ‘বাংলাদেশি’ পরিভাষা ব্যবহারের প্রস্তাব করেন। আমাদের জাতীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের তাত্ত্বিক বিচ্যুতি দূর করার লক্ষ্যে, কালোক্ষেপণ না করে তিনি ফরমান জারি করে একে আইনি কাঠামোর মধ্যে স্থিত করেন।”  বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভাবনার তুলনায়, জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রয়োগিক। এভাবেই তিনি দলকে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে’র সুদৃঢ় দার্শনিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন এবং জাতিরাষ্ট্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। “আওয়ামী লীগের বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির নিষ্পত্তি হয়েছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে।... একটি জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তার কার্যকারিতা সম্পন্ন করেছিল।” (মহিউদ্দিন আহমদ, বিএনপি : সময়-অসময়, ২০১৭, পৃ-১৩৪-১৩৫)। আওয়ামী লীগ এরপর পুরনো মনস্তত্ত্বের ঘেরাটোপ থেকে আর বের হতে পারেনি। যার ধারাবাহিকতা চলেছে কিছুদিন আগেও। 

 লক্ষ্য অর্জনের তৃতীয় কর্মপন্থা হিসেবে, জিয়াউর রহমান বিভিন্ন উন্নয়নমূলক অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করে জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। সংক্ষেপে বললে খাল খনন, গ্রাম সরকার, ভিডিপি ও গণশিক্ষার মতো বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তার পরিকল্পনায় ছিল দেশে যৌথ খামার ও কৃষি সমবায় চালু করা। তিনি শিল্প ও বাণিজ্য খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করে উদার ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির এক মিশ্র ধারা চালু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তৈরি পোশাক শিল্প, রপ্তানিমুখিকরণ এবং এই শিল্প বিকাশের জন্য সর্ব প্রথম স্পেশাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ স্কিম চালু করা, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট পদ্ধতির উদ্ভাবনসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে নানা ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করেছেন। বিশেষ করে পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্স, যার ওপর আজ দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে, তার শুরু হয়েছিল জিয়াউর রহমানের আমলে। তার ১৯ দফা কর্মসূচি দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও সুরক্ষার রক্ষাকবচ হিসেবে সর্বজনবিদিত। রাজনীতি ও অর্থনীতির পাশাপাশি তিনি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতিকেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ‘তার সময়ে একুশে ও স্বাধীনতা পদক প্রদান শুরু হয়। জাতীয় লোকসংগীত উৎসব, নাট্যোৎসব, বার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী, বেতার-টিভির সম্প্রসারণ, টিভির রঙিন সম্প্রচার, জাতীয় শিশু-কিশোর পুরস্কার প্রবর্তন, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, চলচ্চিত্রের জন্য অনুদান তহবিল গঠন, ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও আর্কাইভ এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করা হয়। আরও আয়োজিত হয় মেয়েদের স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট।           

নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে, জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল অধিক কার্যকর ও জাতীয় সত্তা এবং স্বার্থ সহায়ক। লক্ষ্য অর্জনের চতুর্থ কর্মপন্থা হিসেবে তিনি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছেন ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতি, জনগণের ধর্ম, আঞ্চলিক অবস্থান, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং পরাশক্তির হস্তক্ষেপের পরিধি। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষা ও জাতীয় স্বার্থরক্ষা করে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের জন্য প্রয়োজন শক্তি অর্জন। প্রশ্ন হচ্ছে, শক্তি কী এবং কোথায়? এর উত্তরে জিয়াউর রহমান বলেন “শক্তির উৎস জনগণ। দেশের জনগণের মধ্যেই রয়েছে শক্তি...গণসমর্থন না থাকলে যত দক্ষ ও শক্তিশালী ফরেন পলিসি করেন না কেন, তাতে কোনোই কাজ হবে না। এক ধাক্কায় সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে যাবে।” ( মাহফুজ উল্লাহ, পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জিয়ার অভিমত, প্রেসিডেন্ট জিয়া : রাজনৈতিক জীবনী, পৃষ্ঠা ৫০৩)। 

জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালে  জাপানকে হারিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করে। তার হাত ধরেই অধিকাংশ ইসলামি রাষ্ট্র থেকে স্বীকৃতি অর্জন, ওআইসি গঠিত আল-কুদস কমিটির সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জিত হয়েছে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক), ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ও বাংলাদেশের তদনীন্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকালে দুদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। উক্ত দুই নেতা সেই বছর পাঁচ বছরের পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন এবং জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান হিসেবে, জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির অর্জন ছিল প্রণিধানযোগ্য। সদ্য স্বাধীন অথচ দুর্ভিক্ষ ও চরম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিপতিত ডুবন্ত বাংলাদেশকে রক্ষার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। দেশ-বিদেশের সবাই জানেন।

সরকারের ছয় মাস পার হয়েছে। ইতিমধ্যে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও পথনকশা সম্পর্কে জনগণ অবহিত হয়েছেন। এখন দরকার, শহীদ জিয়াউর রহমানের সফল রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ। এরপর আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানিসম্পদ উত্তোলন, সততা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সমাজ নিশ্চিত করে আইনশৃঙ্খলা সমুন্নত এবং ঐক্য-সংহতি বজায় রাখা। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী যে গণআকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, তা পূরণের সর্বাত্মক প্রয়াসই ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি)’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।

লেখক : উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত