নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি এলাকায় চলছিল কোটা আন্দোলন। নয়ামাটি এলাকার নিজ বাড়ির ছাদে খেলছিলো শিশু রিয়া। বাইরে গোলাগুলির শব্দ শুনে আতঙ্কিত হয়ে বাবা দীপক কুমার গোপ রিয়াকে আনতে ছাদে যান। মেয়েকে কোলে নিয়ে দৌড়ে চলে আসেন সিঁড়ির কাছে। রিয়া তখন নিথর হয়ে বাবার কোলে ঢলে পড়ে। হঠাৎ মেয়ের মাথা থেকে রক্ত পড়তে দেখে আঁতকে ওঠেন দিপক। রক্তাক্ত মেয়েকে কোলে নিয়েই ছোটেন ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
সেখানকার ডাক্তাররা অবস্থা বেগতিক দেখে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যেতে বলেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে ভর্তি করা হয়। পাঁচদিন পর গত বুধবার বেলা ১১টার দিকে মারা যায় রিয়া। ঢাকা মেডিকেলে রিয়ার মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয় ‘গানশট ইনজুরি’। রাতেই মাসদাইর শ্মশানে দাহ করা হয় গুলিতে নিহত রিয়াকে।
রিয়ার বাবা দীপক কুমার গোপ একটি রড-সিমেন্টের দোকানের ম্যানেজার। পরিবারসহ তারা দুই ভাই নয়ামাটির নিজস্ব বিল্ডিংয়ের চারতলায় বসবাস করেন। রিয়াকে গত বছর নয়ামাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয় শিশু শ্রেণিতে। সেখানে বার্ষিক পরীক্ষায় সব বিষয়ে ৯০/৯৫ নম্বর পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছিল রিয়া।
রিয়ার চাচি পপি রানী জানান, শুক্রবার (১৯ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রিয়ার মাথায় গুলি লাগে। আমার মেয়ে স্নিগ্ধা ও তার চাচাতো বোন রিয়া একই বয়সের। তারা প্রায় প্রতিদিনই ছাদে খেলতে যায়। সেদিনও দুজনে ছাদে খেলতে গিয়েছিল। বাইরে গুলির শব্দ শুনে আমি ও রিয়ার বাবা গিয়ে তাদের দুজনকে ছাদ থেকে নিয়ে আসি। রিয়া ছিলো অত্যন্ত চঞ্চল প্রকৃতির। সে পুরো ঘর মাতিয়ে রাখতো। প্রথমবার আনার পর দ্বিতীয় বার রিয়া দৌড়ে ছাদে চলে যায়। এরপর তারা বাবা তাকে কোলে করে নিয়ে আসার সময় মাথায় গুলি লাগে। এই বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
একমাত্র সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় রিয়ার বাবা দীপক প্রথমে কথা বলতে চাননি। ছবি তুলতে গেলে বাঁধা দেন। বলেন, কী হবে ছবি তুলে। কী হবে কথা বলে। আমি কি আর আমার বুকের মানিককে ফেরত পাব? এই বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কিছুক্ষণ পর তিনি বলেন, আচ্ছা বলেন তো, নিজের ঘরের ছাদে যদি নিরাপদ না থাকতে পারি, আর কোথায় নিরাপদ থাকবো? পুরো বাড়ি সে মাতিয়ে রাখতো। আমার অবুঝ শিশুটা কার কি এমন ক্ষতি করলো যে এভাবে তাকে মরতে হলো। ডাক্তার বলেছেন, তার মাথার একদিক দিয়ে গুলি ঢুকে আরেকদিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। মাথার খুলি ভেঙে মগজ ছেদ করে গুলি বেরিয়ে গেছে। হাসপাতালের আইসিইউতে ৫ দিনে দুবার সে আঙ্গুল নেড়েছিলো। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো আমাদের বুকের ধন বেঁচে উঠবে। কিন্তু সব আশা শেষ হয়ে গেলো।
মামলা করবেন কিনা এমন প্রশ্নর জবাবে বলেন, মামলা করে কি হবে। সংঘর্ষের মধ্যে কে গুলি করেছে। কার গুলি আমার মেয়ের মাথা ছেদ করে গেছে আমরাতো জানি না। কার বিরুদ্ধে মামলা করবো?
স্বজনরা বলেন, এই শোক কখনো ভোলার নয়। আজ (বৃহস্পতিবার) সকালের দিকে সান্ত্বনা জানাতে এসেছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলর। এছাড়া আর কেউ আসেনি শোকাহত পরিবারটির কাছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়ে তারা বলেন, এমন ঘটনা যাতে আর কারো সাথে না ঘটে সেজন্য দেশের সরকারের কাছে আমরা জোর দাবি জানাই।
উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জে কোটা আন্দোলনে ১৮ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দিনে নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এই সময়ে ছাত্রলীগ ও পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এসময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট নিক্ষেপে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন চার শতাধিক মানুষ। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৩৪ জন সদস্যও রয়েছেন। অনেকে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে আছেন।
শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জাবি শিক্ষকের স্বেচ্ছায় অব্যাহতি
এইচএসসির আরও চার পরীক্ষা স্থগিত
ট্রেন চলাচলের বিষয়ে যা জানাল রেলের ডিজি