তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে মেঘনার ভাঙন কবলিত এলাকা লক্ষ্মীপুরের রামগতি-কমলনগর। এখানে প্রায় দেড় লাখ মানুষের বাস। কমলনগরের মতিরহাট থেকে রামগতির টাংকি চর পর্যন্ত টানা ৩৭ কিলোমিটার এলাকা ভেঙে গেছে। এতে হাজার হাজার পরিবার ভিটে-মাটি হারিয়ে নিঃস্ব।
সরেজমিনে দেখা যায়, মেঘনার জোয়ার এবং জলোচ্ছ্বাসে ১ কিলোমিটার এলাকার বাড়ি ঘরে পানি ঢুকেছে। অনেকে বাড়ির দরজায় জাল দিয়ে মাছ ধরছে। মেঘনার আশেপাশে বাড়ির পুকুরে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে কোটি টাকার চাষের মাছ বেরিয়ে গেছে।
সূত্রে জানা যায়, রামগতির আলেকজান্ডার, পৌরসভা, চর রমিজ, বড়খেরি, চর আগলী, পোড়াগাছা ইউনিয়নের প্রায় ২৫টি গ্রাম এবং বদ্বীপ চর আব্দুল্লাহ্, কমলনগরে সাহেবেরহাট, চর ফলকন, চর কালকিনি, চর লরেন্স, পাটোয়ারীর হাট ইউপিতে প্রায় ১৫টি গ্রাম জলোচ্ছ্বাসে পুরো প্লাবিত হচ্ছে। শুধু ভাঙনে বিলিন হয়েছে সরকারি, বেসরকারী স্কুল, মাদ্রাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয়। এছাড়াও মসজিদ ও বহু স্থাপনা এবং মানুষের পরিচয় বহনকারী কবর পর্যন্ত ভেসে গেছে।
প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু ছায়েদ জানান, টানা তিন দিন নদীর পানি এবং জলোচ্ছ্বাসে স্কুলের ভেতরে হাটু পানি উঠেছে। ছাত্রছাত্রীদের বই-খাতা ভিজে গেছে। আসবাবপত্র পানিতে ডুবে গেছে। জলোচ্ছ্বাস হলে স্কুলে ক্লাস হয় না। বাচ্চারা ক্লাস করতে চায় না।
চর কালকিনিতে কথা হয় ৮০ বছরের বৃদ্ধ জবিউল হকের সাথে তিনি জানান, ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে হলে কোমড় সমান পানিতে তার বাড়িতে থাকা ৪টি ঘর প্লাবিত হয়। ঘরে থাকা সব ধরনের আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে যায়। মাঝে-মধ্যে তীব্র স্রোতে সব লন্ডভন্ড হয়ে পড়ে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি ভর্তি হয়ে পড়ে বাড়ির ঘরগুলো। টেকসই বেড়িবাঁধ দরকার। তাহলে নদীর পাড়ের মানুষগুলো বেঁচে যাবে।
তিনি আরও জানান, মেঘনার ভাঙনে সাত বার বাড়ি-ঘর, সহায়-সম্পদ হারিয়েছেন। এবার ভাঙলে বা নষ্ট হলে আর দাড়াঁতে পারবেন না।
জবিউল হক আরও জানান, হঠাৎ ঘূর্ড়িঝড় রেমাল আঘাত হানে। তখন বাড়ি-ঘরের প্রচুর ক্ষতি হয়। সব কিছু ভেঙে যায়। ৭০ সনের বন্যা দেখেছেন, তবে রেমালের মত ঘূর্ণিঝড় দেখেননি। রেমাল খুবই ভয়ংকর ছিল। যারা নদীর পাড়ে বাড়ি-ঘর করে বসবাস করেন। তাদের জন্য টেকসই বেড়িবাঁধ দরকার।
নুর জাহান বেগম জানান,জলোচ্ছ্বাস হলে বাড়ি-ঘর পানিতে ভরে যায়। মাঝে-মধ্যে পানি কোমড় সমান হয়। তখন ঘরের জিনিসপত্র, ভাত রান্নার চুলা, কাপড় ভিজে যায়। জলোচ্ছ্বাস দেখা দিলে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে পড়ে। চিড়া-মুড়ি খেয়ে জীবন কাটতে হয়।
আমেনা বেগম, আব্দুল বারেক, মো.ইউছুফ এদের বাড়ি-ঘর নেই। শুধু সিমেন্টের ভাঙাচুরা পিলার দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক সপ্তাহ পূর্বে দাঁড়িয়ে থাকা ঘর এখন শুধু লন্ডভন্ড ভিটেতে পড়ে রয়েছে। ঘূণিঝড় রেমালে সব ধংস করে দেয়। তাদের দাবি, শক্ত বেড়িবাঁধ দিলে পানি ঢুকবে না
সচেতন মহলের দাবি, মেঘনার ভাঙন কবলিত প্রায় ৪০টি গ্রাম। এদের মেঘনার জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের পানি থেকে রক্ষা করতে টেকসই বেড়িবাঁধ প্রয়োজন। বেড়িবাঁধ একমাত্র রক্ষা কবজ। নদী ভাঙন রোধে কাজ চলমান রয়েছে। তবে কাজের গতি খুবই ধীর। প্রায় উপকূলীয় ৩৭ কিলোমিটার এলাকায় শক্ত বেড়িবাঁধ দিতে হবে। টেকসই বেড়িবাঁধের বিকল্প কিছুই নেই।
উপজেলা পিআইও কর্মকর্তা পরিতোষ কুমার বিশ্বাস জানান, মেঘনার উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস দেখা দিচ্ছে। বাড়ি-ঘরে পানি ঢুকছে। ক্ষতিগ্রস্তদের বিভিন্ন ত্রাণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। তবে শক্ত বা টেকসই বাঁধ হওয়া পর্যন্ত জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলা করতে হবে।
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আমজাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। মানুষ, গবাদি পশু, পুকুরের মাছ, ফসলের কোটি টাকার ক্ষতি হয়। মেঘনার ভাঙন দীর্ঘদিন চলছে। বাঁধ নির্মাণে কাজ চলমান। সব মিলিয়ে জলোচ্ছ্বাস বা জোয়ারের পানি থেকে রক্ষা পেতে টেকসই বা শক্ত বেড়িবাঁধ খুবই প্রয়োজন মনে করছি।
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রকৌশলী মো.নাহিদুজ্জামান দেশ-রূপান্তরকে জানান, ভাঙন রোধে কাজ চলছে। তবে বর্ষায় একটু কাজ হয়। টেকসই বেড়িবাঁধ হবে।
