কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ১৬ থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত সহিংসতার ঘটনায় দেশজুড়ে নিত্য নতুন মামলা হচ্ছে। সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই আন্দোলনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বেশি হওয়ায় তারাই গ্রেপ্তার আতঙ্কে বেশি আছেন। ইতিমধ্যে ঢাকাসহ ঢাকার বাইরে অনেক শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। আতঙ্কে ঢাকায় মেসে ছেড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, যারা ছাড়েননি তাদেরও বাসা ছাড়ার নোটিশ দিয়েছেন বাড়িওয়ালারা।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্র পরিচয়টাই তাদের জন্য নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেস ছেড়েও তারা নিরাপদ নয়। বাড়ি যাওয়ার পথে বাসে হচ্ছে তল্লাশি, আন্দোলনের ছবি ভিডিও থাকলে হেনস্তা এবং আটক করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া গ্রামের বাড়িতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় আছেন বলে জানান তারা। আটক হওয়া থেকে বাঁচতে অনেকেই নিজের ছাত্র পরিচয় লুকিয়ে রাখছেন। লুকিয়ে রেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্রও। নিজেদের নিরাপদ রাখতে দ্রুত সময়ের মধ্যে মেস ছাড়ার নির্দেশ দেন বাড়িওয়ালারা। কারফিউ থাকায় বাড়িতে যেতে না পারা অনেকে একেকবার একেক জায়গায় থাকছেন। বেশি আতঙ্কে আছেন নারী শিক্ষার্থীরা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, শুধু চট্টগ্রামেই অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থীকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সহিংস ঘটনার মামলায় গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের দুজন, সিটি কলেজের একজন, চট্টগ্রাম কলেজ ও হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের ১৪ জন এবং বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসার ১৩ জন রয়েছেন। ঢাকায় এরচেয়ে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী আটক হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেকের নাম মামলার এজাহারে না থাকলেও সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।
আজিমপুরে একটি মেসে থাকতেন গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সাইন্স এর শিক্ষার্থী সামিহাসহ বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন শিক্ষার্থী। আশেপাশে রেইড আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে পরেরদিনই তাদের মেস ছাড়ার নির্দেশ দেন বাড়িওয়ালা। এরপরই তাদের বাসা ছেড়ে এদিক-সেদিক চলে যেতে হয়েছে। কেউ পরিচিত আত্মীয়-স্বজনের বাসায় আর কেউবা বন্ধুর বাসায় গিয়ে উঠেছেন। সেখানেও গ্রেপ্তার আতঙ্কে রয়েছেন তাঁরা। কারফিউ কিছুটা কমলে তাদের কেউ কেউ বাড়িতে গেছেন।
সামিহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যখন আমরা শুনলাম আশেপাশে রেইড হচ্ছে এবং কয়েকজন মেয়ে শিক্ষার্থীকেও তুলে নেওয়া হয়েছে। এরপর থেকেই আতঙ্কে ছিলাম যদিও আমরা আন্দোলনেও ছিলাম না। এরমধ্যে বাড়িওয়ালা আমাদের রাখা ঝুঁকি ভেবে মেস ছেড়ে দিতে বলেন। কোনো উপায় না পেয়ে একজন পরিচিত মানুষের বাসায় উঠলাম। কিন্তু এখানেও একই অবস্থা। বাকিরাও এভাবেই দিন কাটাচ্ছে। ভয়ে রাতে ঘুমাতেও পারি না। এভাবে আর কয়দিন চলবে জানি না।
একই অবস্থা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষার্থীদের। কেউ বাসা বা মেসে থাকা নিরাপদবোধ করছেন না। এমনকি বাড়িওয়ালাদের অনেকে এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের রাখতে চাচ্ছেন না।
আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ঢাবি শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে জীবন পালাচ্ছি। ওয়ালেটের সব চেয়ে প্রিয় এবং পাওয়ারফুল ঢাবির আইডি কার্ডটা বের করে লুকিয়ে রেখেছি। এই কার্ডটা একসময় আমাকে এক্সট্রা নিরাপদ রাখত। অথচ এখন এই পরিচয়পত্র সাথে নিয়ে চলা অনিরাপদ। যেখানে আছি প্রায় ৩০/৩৫ ঘণ্টা পর পর একটু বের হই! এককাপ চা খাইতে যাই খুব সাধারণভাবে, যেন কেউ বুঝতেই না পারে আমি একজন স্টুডেন্ট। পুরোটা রাত আতঙ্কে কাটে অথচ আমি কোনো অপরাধী না! আতঙ্ক আর নির্ঘুম রাত পোহাতেই মাথার অসহ্য যন্ত্রণা সময়ে বেড়েই চলছে।
পরিবার নিয়েই ঢাকায় থাকেন ঢাবি শিক্ষার্থী হাসান। আতঙ্কে থাকার বিষয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন,
চলমান পরিস্থিতিতে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা চরম অস্বস্তিতে আছি। দেশের গণমাধ্যমের মতে, ইতিমধ্যে শতাধিক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন, আহত শিক্ষার্থীর সংখ্যা কয়েক হাজারেরও বেশি। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা ইতিমধ্যে কোটা সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবন কাটছে ভয়-ভীততে। ছাত্রাবাসগুলোতে চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধান, যাত্রাপথেও বিভিন্ন স্থানে সম্মুখীন হতে হচ্ছে জিজ্ঞাসাবাদের। এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ছাত্র পরিচয়টাই নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনরাত কাটে শুধু আতঙ্কে।
শুধু ঢাকা নয়। ঢাকার বাইরেও হামলা এবং আটকের ভয়ে আছেন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে বিরোধী মতের ছাত্র রাজনীতির সাথে যারা জড়িত তারা আছেন বেশি আতঙ্কে। ছাত্র ইউনিয়নের তথ্যমতে, গত ২৫ জুলাই রাত ৮টা ১৫ মিনিটে ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলায় নিজ এলাকায় ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের নেতা এনামুল হাসান অনয়। হামলায় অনয়ের মাথা, ঘাড় এবং পিঠে জখম হয়। ছাত্র ইউনিয়ন বলছে, সারা দেশে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নেতাদের হুমকি প্রদান করছে স্থানীয় ছাত্রলীগ এবং প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। কক্সবাজার জেলা এবং বগুড়া জেলা কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে। চট্টগ্রামে এবং কক্সবাজারে ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে গিয়েও একেকদিন এক বাসা থেকে অন্য বাসায় থাকছেন ঢাবি শিক্ষার্থী মাহিন ফয়সাল। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শহরের দিকে বাসা হওয়ায় এখানে অনেক বেশি রেড হচ্ছে। নিজেকে কোথাও নিরাপদ মনে হচ্ছে না। তাই একেকদিন একেক জায়গায় থাকার চেষ্টা করছি। শুধু আমি নয় আমার অনেক পরিচিতরাও এই কাজ করছেন।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাফিকুজ্জামান ফরিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকাসহ সারা দেশে গণগ্রেপ্তার চালানো হচ্ছে। মেস এবং বাসাবাড়িতে ‘ব্লক রেইড’ এর নামে তল্লাশি এবং আটক করা হচ্ছে। রাস্তা-ঘাট সর্বত্র– যেখানেই ছাত্রদের দেখছে পুলিশ আটক করছে। প্রতিদিন হাজার-হাজার মানুষকে আটক করা হচ্ছে। তাদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে। আমরা দেখেছি, পুলিশ আটক করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগ নেতাদের সহযোগিতা নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীসহ সারাদেশের মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত। আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের নামে কোন মামলা দেওয়া হবে না। কিন্তু আমরা দেখছি এরই মধ্যে শত-শত ছাত্রের নামে মামলা দেয়া হচ্ছে। আমরা অবিলম্বে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নামে হামলা-মামলা, গণগ্রেপ্তার বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি জানাই।
উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি রাগীব নাঈম বলেন, সারাদেশে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বাসা-মেস থেকে গণহারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এলাকায় এলাকায় পুলিশ-ছাত্রলীগের যৌথ মহড়ায় নির্যাতিত হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ ধরনের অসাংবিধানিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আন্দোলনের সমন্বয়কসহ সারাদেশে শিক্ষার্থীদের গণগ্রেপ্তার প্রমাণ করে জনমানুষের আন্দোলনে ভীত হয়ে সরকার দমন-পীড়নের লাইন গ্রহণ করেছে। কিন্তু ইতিহাস শিক্ষা দিয়েছে এই ধরনের কার্যক্রম হচ্ছে স্বৈরাচারের কফিনে শেষ পেরেক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজিম উদ্দিন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করেছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া, তুলে নিয়ে হয়রানি করা কোনোভাবেই উচিত নয়। আমরা ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন নিরাপদ শিক্ষার্থীকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করেছি। অন্যান্য আন্দোলনকারী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের যাদের তুলে আনা হয়েছে, তাদের যেন দ্রুত ছেড়ে দেওয়া হয় এবং কোনোরকম হয়রানি না করা হয় সে দাবি জানিয়েছি আমরা।
