আবু সাঈদসহ সমস্ত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দাবিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসেল চত্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। বৃহস্পতিবার (১ আগষ্ট) বিকাল তিনটায় এই কর্মসূচি পালন করেন রংপুরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক। বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদের নেতৃত্বে কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করেন রংপুরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, “ আবু সাঈদকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। সাইদকে যখন গুলি করেছে, আপনারা সবাই দেখেছেন তাকে কীভাবে গুলি করা হয়েছে। আপনারা সবাই দেখেছেন খুব কাছে থেকে সাইদকে গুলি করা হয়েছে কিন্তু আমরা এখন গণমাধ্যমে শুনছি ৫০ না ৬০ ফিট দূরে থেকে গুলি করা হয়েছে। দূরত্ব কমে যায় নাই,দূরত্বে দাঁড়ালে বোঝা যায়।”
হত্যা করার পর তাকে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো,হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তারা সেখানে যেভাবে আমাদেরকে দীর্ঘক্ষণ রেখে দিলো। কেন আবু সাইদের মরদেহ এতক্ষণ রাখা হলো কেন। তার বাবা-মা, আত্মীয় স্বজনরা চিৎকার আর আহাজারিতে মৃত আবু সাইদের মৃত মুখ দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলো। কর্মকর্তারা বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় রাত ১২ টা বাজিয়ে দিয়েছে।”
তুহিন ওয়াদুদ আরও বলেন, ” সেদিন ইংরেজি বিভাগের পক্ষে একটা এম্বুলেন্স ঠিক করা হয়েছিল। আমরা শুনলাম সে এম্বুলেন্স যাবে না। সরকারিভাবে একটা এম্বুলেন্স দেওয়া হবে। সেই এম্বুলেন্সে যাবে, আমরা বললাম ঠিক আছে। তারপর আমরা দেখলাম বিশাল গাড়ির বহর গেলো।”
তিনি জানান, ”পুলিশ দিয়ে গুলি করেছে, মৃত আবু সাইদকে ভয়ে বিশাল গাড়ির বহর নিয়ে রওনা দিয়েছে তারপর পথে আধাঘন্টা অপেক্ষা করতে হলো, কেন? একটা মৃত দেহকে রাস্তায় দাড় করিয়ে রাখা হলো? তারপর মরদেহ যখন জাফর পাড়ায় গিয়ে পৌঁছালো । সেখান থেকে কয়েক’শ গজ দূরে আবু সাইদের বাড়ি। অথচ সাইদের বাবা-মাকে স্বান্তনা দেওয়ার জন্য গাড়ির বহর থেকে তো একজনও আবু সাইদের বাড়ি যায় নাই । আমরা এরপর একটা তথ্য বিবরণী দেখেছি মামলার। মামলা করেছে পুলিশ, খুন করেছে পুলিশ, তদন্ত করবে পুলিশ আর এই পুলিশ চোখের মধ্যে ধুলি পড়ে আছে। সারা পৃথিবীর মানুষ যা দেখে বাংলাদেশের এই পুলিশ তা দেখে না “
ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মতিউর রহমান বলেন, ” মৃত আবু সাইদকে এখন রাজাকার বানানোর চেষ্টা চলছে। আমার চাকরির অভিজ্ঞতা ১৫ বছরের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনো রাজাকার বা অন্য কোনো দলের মিছিল মিটিং দেখি নাই। আমার শুধু প্রশ্ন এই ১৬ জুলাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী রাজাকার হয়ে গেলো। আমার মনে হয় রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে হবে। আমরা যদি উপরে উপরে চিন্তা করি যে শুধু কোটা আন্দোলন হয়েছে তা নয় এটা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। আমার মনে হয় সময় এসেছে আমাদের চিন্তা করতে হবে। রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রকে যারা পরিচালনা করছে তাদের ভাবার সময় এসেছে। সারাদেশে যে নৃশংস হত্যা বা গণহত্যা হয়েছে তার বিচার হওয়া দরকার।”
তিনি আরও বলেনে,”বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে সারা পৃথিবী তা দেখেছে। যেটি আসলে লুকানোর কারণ নেই। এইটাকে যদি এভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় তাহলে অন্য যে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে যেখানে ও রকম কোনো ভিডিও ফুটেজ নাই যেখানে সাক্ষী নাই সেটার কি হবে। আমরা আসলে কোনো পুলিশের উপর আস্থা রাখতে পারছি না।সব হত্যা কান্ডের বিচারের জন্য জাতিসংঘের অধীনে একটি কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।”
পরিসংখ্যান বিভাগের প্রভাষক ফারজানা জান্নাত তোশি বলেন, ”আবু সাঈদ আর কিছুদিন পরেই পড়াশোনা শেষ করতো। আমার ক্যাম্পাস থেকেই পুলিশ আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করেছে। এই ফুটেজটা সারা বিশ্বের মানুষ দেখেছে। একটু পরেই আবু সাঈদকে গুলি করা সেই পুলিশের পরিচয় সোশ্যাল মিডিয়ায় পাওয়া গেছে। অথচ এখন পর্যন্ত কোনো ইনিশিয়েটিভ নেয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ”কোটা আন্দোলনে যে মৃত্যুর মিছিল সেটা সাঈদকে দিয়েই শুরু হয়েছে যা সবাই দেখেছে। অথচ সেই মামলার বিবরণীতেই অন্যকিছু তাহলে অন্যগুলোর কি অবস্থা সেটা আর বলতে হয়না। আমরা বলতে চাই সাঈদ হত্যার বিচার যতদ্রুত সম্ভব করা দরকার।”
