দেশের রাজনীতিতে নানা জল্পনা কল্পনা আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বঙ্গভবন। প্রায় ১৮ বছর আগে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের ক্ষমতার মেয়াদ শেষে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সংকটের সময় একইভাবে সবাই তাকিয়ে ছিল বঙ্গভবনের দিকে। যদিও সে সময় ও বর্তমান সময়ের মধ্যে প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ফারাক রয়েছে কিন্তু সংকট মোকাবিলা করে দেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে এই মুহূর্তে বঙ্গভবনের বিকল্প নেই।
ছাত্র জনতার গণ আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। এরপর রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন সংসদ ভেঙে দিয়েছেন। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও তিন বাহিনীর প্রধানের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান করার। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানের বিষয়টি নিয়ে সুরাহা হলেও সেই সরকারের বাকি সদস্য কারা হবেন তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা ও তৎপরতা।
গত কয়েকদিনের পর্যালোচনায় দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশের প্রায় সব প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে এই তৎপরতায় যুক্ত রাখা হয়েছে। দফায় দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে গণভবনে রাষ্ট্রপতি ও সেনাবাহিনী প্রধানের বৈঠক চলছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে তাদের মতামত ও ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের মতামত ও দাবিকেই এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে আগামীকাল রাত ৮টায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। পাশাপাশি এই সরকারের সদস্য ১৫ জন হতে পারেন।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বঙ্গভবনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে লম্বা আলোচনা হয়। একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে সেখানে নানা বিকল্প নিয়ে আলোচনা হলেও সমন্বয়করা সরকারের প্রধান হিসেবে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিকল্প হিসেবে কাউকে মেনে নিতে রাজি হননি। সমন্বয়কদের জোরালো ভূমিকার কারণে নীতিনির্ধারকরা শিক্ষার্থীদের প্রাস্তাব মেনে নিয়ে বাকি সদস্যদের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন। নতুন সরকারে কারা থাকছেন এমন এক প্রশ্নের জবাবে এই সূত্র তাদের নাম প্রকাশে রাজি না হলেও জানিয়েছেন, সরকারে একাধিক উপদেষ্টা হিসেবে ছাত্র প্রতিনিধি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি অন্য উপদেষ্টাদের দপ্তরে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি রাখা হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দুই বা তার বেশি নারী সদস্য থাকতে যাচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই জন শিক্ষকও উপদেষ্টা হিসেবে থাকছেন যা অনেকটাই নিশ্চিত।
তবে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষার্থী বা সমন্বয়কদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে নাও রাখা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তারা সরকারের সঙ্গে বুদ্ধিভিত্তিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকবেন। নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটা গভীর সংযোগ থাকবে এমন নিশ্চয়তাও সমন্বয়কদের দেওয়া হয়েছে বলে এই সূত্র জানিয়েছে।
এই সূত্র জানিয়েছে আজ রাতের মধ্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্য উপদেষ্টাদের নাম ঘোষণা করা হতে পারে। উপদেষ্টা হিসেবে কারা থাকবেন সে বিষয়ে সমন্বক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতামতকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অন্য রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীদের মতামতও নেওয়া হয়েছে। সবার পরামর্শ ও মতামতকেই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে গিয়েই উপদেষ্টাদের নাম ঘোষণা করতে বিলম্ব হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে বিবেচিত হন। ফলে প্রধানমন্ত্রী কিংবা তার কার্যক্রম নিয়ে নাগরিকদের যতটা আগ্রহ থাকে বিপরীতে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে ততটা থাকে না। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিই সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাবান থাকলেও পদটি আলংকারিক হিসেবেই থেকে গেছে সবসময়।
তবে এবারই প্রথম নয় এর আগেও বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ক্রাইসিসে বঙ্গভবন ও রাষ্ট্রপতিকে উদ্যোগ নিতে দেখা যায়। এমনি একটা প্রেক্ষাপট ছিল ১/১১ এ। বিএনপি-জামায়াত জোটের মেয়াদ শেষে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হচ্ছিল না। দফায় দফায় আলোচনা ও সংলাপ চললেও তা ব্যর্থ হয়। এক পর্যায়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। কিন্তু সে সময় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের তীব্র বিরোধিতার কারণে সে উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ইয়াজউদ্দিন সরকার যতদিন দায়িত্ব ছিলেন ততদিন রাষ্ট্রের সব নাগরিকের চোখ ছিল বঙ্গভবনের দিকে। সেখান থেকে কী বার্তা আসে তা জানতে উদ্গ্রীব থাকতেন মানুষ। যদিও সেই সরকার সমাধান তো দিতেই পারেনি উল্টো অনেক জট পাকিয়ে দিয়েছিল। ঘনীভূত হয়েছিল রাজনৈতিক সংকট।
ফলে বাধ্য হয়ে জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। দেশের রাজনীতিতে যা পরিচিতি পায় ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে। ফখরুদ্দীন আহমদ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বঙ্গভবন থেকে মানুষের আগ্রহ সরে ফখরুদ্দীন ও সেনাবাহিনী প্রধান মঈন উদ্দিন আহমেদের দিকে নজর চলে আসে (যিনি মঈন ইউ আহমেদ নামে বেশী পরিচিত ছিলেন)।
তবে এরপরও বিভিন্ন সময় বঙ্গভবনের দিকে নজর দিতে হয়েছিল জনগণের। তেমনি একটা সময় ছিল ২০১৩ সাল। নবম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও সে সময়ের বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। বিরোধ নিরসনে সে সময় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করেছিলেন। এই সংলাপ আরও গুরুত্ব বহন করে যখন বিএনপি যোগ দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত সংলাপ ফলপ্রসু না হওয়ায় নির্বাচন থেকে বিরতই থাকে বিএনপি ও তার মিত্ররা।
