আন্দোলনে ২২ দিনে নিহত ৬৫০

অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৪, ১২:৫৩ পিএম

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট সংঘাত দমনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয় ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগের গুরুতর ও বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ পেয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। গতকাল শুক্রবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণমাধ্যম ও আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ জুলাই থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত বিক্ষোভ ও পরবর্তী সহিংসতায় অন্তত ৬৫০ বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী সে সময় প্রায়ই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা উভয় ক্ষেত্রেই নির্বিচার বলপ্রয়োগ করেছে। রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেডের পাশাপাশি পাখি শিকারে ব্যবহৃত অস্ত্র, বুলেটসহ নানারকম প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গত জুলাই মাসের শুরু থেকে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে চলতি মাসের ৫ তারিখে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। সেই দিন ও পরের দুদিনও সহিংসতার নানা ঘটনা ঘটে। গতকাল জেনেভা থেকে ‘বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও অস্থিরতা বিষয়ে প্রাথমিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক গতকাল এক ভিডিও বার্তায় বলেন, বাংলাদেশের এই সন্ধিক্ষণ, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতি মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সংঘাতের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিতে জোর দিচ্ছে।

সংস্থাটি বলছে, প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক, গুম, নির্যাতন ও অসদাচরণ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশে কঠোর বিধিনিষেধের মতো গুরুতর অভিযোগ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৬ জুলাই থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত গণমাধ্যম ও অন্যান্য সূত্রের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে ৬০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৪০০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সরকার পতনের পর ৫ থেকে ৭ আগস্টের মধ্যে বিক্ষোভের নতুন ধাক্কায় ২৫০ জন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংস্থাটি বলছে, আন্দোলনে সহিংসতায় অন্তত ৩২ শিশু নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আহত হয়েছে হাজারো মানুষ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে প্রথমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। পরে জুলাইয়ে বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা ও নিরাপত্তা বাহিনী গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে।

মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের করা এ প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং এ বিষয়ে উদ্বেগের প্রাথমিক পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে। গত জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। তবে এসব তথ্যের বিস্তারিত বিবরণ দেয়নি ওএইচসিএইচআর। ওএইচসিএইচআর বলছে, ওই সময়ে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকা এবং যোগাযোগে বিধিনিষেধের কারণে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হয়নি।

জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিতের জন্য এ সুপারিশ।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও এসব সুপারিশ করা হবে বলে জানায় জাতিসংঘ। সংস্থাটি বলছে, মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবর্তন মাথায় রেখে এ সুপারিশ করা হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের দাবি তোলার কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার ঘটনা স্বাধীনভাবে তদন্তের প্রস্তাব শেখ হাসিনার সরকারকে দিয়েছিল জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআর। ওই সময় এই বিশ্ব সংস্থা থেকে সহায়তা নেওয়ার কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও স্বাধীনভাবে তদন্তের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বাংলাদেশে গত কয়েক সপ্তাহে সহিংসতার ঘটনা তদন্তে জাতিসংঘের তথ্য অনুসন্ধানী মিশন (ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন) পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউএনএইচসিআর। আগামী সপ্তাহে প্রাথমিক তদন্তের জন্য একটি দল পাঠানোর আগে শুক্রবার প্রাথমিক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করল তারা।

নিহতদের মধ্যে প্রতিবাদকারী, পথচারী, খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য থাকার কথা তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজার হাজার প্রতিবাদকারী ও পথচারী আহত হয়েছে, রোগীদের ঢল নামায় হাসপাতালগুলো চিকিৎসা দিতে হিমশিম খায়। নিহতের এ সংখ্যা বাস্তবতা থেকে কম হতে পারে। কেননা, কারফিউয়ে চলাচল নিয়ন্ত্রণে থাকা, ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে তথ্য সংগ্রহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতালগুলোকে নিহত ও আহতের বিস্তারিত তথ্য দিতে সরকারের দিক থেকে বাধা দেওয়ার খবরও প্রকাশ হয়েছে।

এদিকে প্রাথমিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো, অন্তর্বর্তী সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য তিনটি গুচ্ছে সুপারিশমালা দিয়েছে জাতিসংঘ। মানবাধিকার সামনে রেখে গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা এবং আইনের শাসন ফেরাতে সমন্বিত ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া অবলম্বনের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ অন্তর্বর্তী সরকারকে দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

জাতিসংঘ বলছে, বিচার বিভাগ, নিরাপত্তা বাহিনী এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে ভেটিংয়ের পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করুন। বলপ্রয়োগ কমাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিন, যাতে তারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের নীতি মেনে চলে; বিশেষ করে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে।

মানবাধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিকসহ অন্যান্য সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারকে সহায়তা দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান রাখা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত