দেড় মাসের বেশি সময়ের অচলাবস্থা কাটিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে আজ রবিবার। প্রাথমিক থেকে শুরু করে সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুরোদমে চালুর নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। তবে সরকার পরিবর্তনের পর সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় একধরনের অচলাবস্থা চলছে। উপাচার্যসহ (ভিসি) শীর্ষ পর্যায়ের পদগুলোয় আসীনরা একের পর এক পদত্যাগ করছেন। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু নিয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। পাঠদান শুরু হবে কি না, ছাত্র-শিক্ষক কেউই জানেন না। হল, দপ্তর-দালান আছে, রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীও, কিন্তু নেই অভিভাবক। হাতে গোনা গুটিকয়েক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বাদে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র একই। এমন অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পদত্যাগের ফলে শূন্য হওয়া প্রশাসনিক শীর্ষ পদগুলোয় নতুন নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ সেশনজটে পড়ার শঙ্কাও দেখা দিয়েছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এমন পরিস্থিতি যতই দীর্ঘ হবে, ততই ক্ষতির সম্মুখীন হবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে গত ১৭ জুলাই থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর আগে শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে ১ জুলাই থেকেই বন্ধ হয়ে যায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পদত্যাগের হিড়িক পড়ে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উপাচার্যসহ এখন পর্যন্ত ১৯ জন উপাচার্য পদত্যাগ করেছেন। এ ছাড়া পদ ছেড়েছেন ১১ জন উপ-উপাচার্য এবং ১০ জনের বেশি প্রক্টর ও কোষাধ্যক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহও পদত্যাগ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রেজিস্ট্রার ও ছাত্র উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন আবাসিক হলের প্রাধ্যক্ষদেরও কেউ কেউ পদত্যাগ করেছেন। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরাও
পদত্যাগ করতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। গণপদত্যাগের ফলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বর্তমানে কার্যত কোনো প্রশাসন নেই। এতে অ্যাকাডেমিক-দাপ্তরিক কার্যক্রমসহ সবকিছুতে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা।
দেশের ইতিহাসে কখনোই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের পরে কখনোই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রশাসনবিহীন এমন অচলাবস্থা দেখা যায়নি। একযোগে ভিসি, প্রোভিসি, প্রক্টর এবং অন্যান্য প্রশাসনিক পদে থাকা ব্যক্তিদের পদত্যাগের নজির নেই। এটি একদিকে দেশের ইতিহাসে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলেও অন্যদিকে রয়েছে নিরাপত্তার শঙ্কা। প্রশাসনবিহীন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য কেউই নেই।
সবচেয়ে বেশি সংকটে দেশের স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সিন্ডিকেটও পুরোপুরি অচল। বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের কোনো কিছু করার নেই। কারণ সিন্ডিকেটের সভাপতি হলেন উপাচার্য। বিধান অনুযায়ী সভাপতির অনুপস্থিতিতে অন্য কেউ সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করতে পারেন না। কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে একমাত্র রেজিস্ট্রার এখন কাজ করছেন। কিন্তু আইনত রেজিস্ট্রার খুব বেশি কিছু করতে পারেন না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অতিদ্রুত ভিসি, প্রোভিসি নিয়োগ দিতে হবে। পরে অন্যান্য প্রশাসনিক পদে নিয়োগের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল হবে।
প্রশাসনবিহীন এমন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকেই। সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্যাম্পাস এলাকায় চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এমন অবস্থায় বেশিদিন থাকতে দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সেশনজটের সম্ভাবনা রয়েছে। কার্যত কোনো প্রশাসন নেই বলে বন্ধ রয়েছে দাপ্তরিক কাজ। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কবে পুরোপুরি ক্লাস শুরু হবে সেটিও বলতে পারছেন না কেউ। ভর্তি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আসা নবীন শিক্ষার্থীরাও ক্লাস শুরু করতে পারছেন না। হলগুলোতে নেই কোনো প্রশাসন, শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে করছেন সিট বণ্টন।
নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শামীম বলেন, ‘প্রশাসন না থাকায় হলের শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। বিশ্ববিদ্যালয় চালু রয়েছে, কিন্তু সৃষ্টি হয়েছে প্রশাসনিক অচলাবস্থা। বিভিন্ন দপ্তর খোলা রয়েছে, কিন্তু কোনো কার্যক্রম নেই। কারণ দপ্তর প্রধানরা পদত্যাগ করেছেন।’
প্রশাসনিক শীর্ষ পদ থেকে পদত্যাগ করা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো যোগ্য কাউকে নিয়োগ না দেওয়ায় প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিয়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, টানা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় এমনিতেই শিক্ষায় বড় রকম ক্ষতি হয়েছে। এখন শিক্ষাঙ্গনকে খুব দ্রুত কার্যকর করে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা উচিত। একই সঙ্গে দলীয়করণের বৃত্ত থেকে বের হয়ে পদত্যাগ করা পদগুলোতে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।
উপাচার্য নিয়োগ না হলে এবং ছাত্র-শিক্ষকরা ক্লাসে না ফিরলে স্বাভাবিক কার্যক্রমও ফিরবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে ঢাবির এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্লাস শুরু হওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। বৈধ শিক্ষার্থীদের হলে ওঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেটিও বন্ধ আছে। বেশিরভাগ হল প্রভোস্ট পদত্যাগ করেছেন। সব শিক্ষার্থী হলে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পরিবেশ তৈরি হলেই ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়া শুরু হবে।’
শিগগিরই খুলছে না চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় : চবি সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চালু হওয়ার কথা থাকলেও তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। গত বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সোমবার (১৯ আগস্ট) থেকে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চালুর বিষয়ে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়েছে। তা ছাড়া আবাসিক হলে নতুনভাবে সিট বরাদ্দ না দেওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য অ্যাকাডেমিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীসহ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সেশনজট নিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে সৃষ্টি হয়েছে দুশ্চিন্তা।
এ বিষয়ে চবি শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ঈদের ছুটি ও আন্দোলন মিলিয়ে প্রায় তিন মাস ধরে আমাদের কোনো পড়াশোনা নেই। রবিবার থেকে অন্যান্য ক্যাম্পাস খুলে দিলেও আমরা পড়েছি বিপাকে। এমন অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হলে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। এমনটা মেনে নেওয়া যায় না। এবার আমরা ক্লাসে ফিরতে চাই।’
উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে চবির সিন্ডিকেট সদস্য ও ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনহীন একটি অবস্থায় রয়েছে। ভিসি পদত্যাগের ফলে সিন্ডিকেটের কোনো কিছু করার নেই। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য অতিদ্রুত ভিসি, প্রোভিসিসহ প্রশাসনের অন্যান্য পদে নিয়োগ দিতে হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন সরকার উপদেষ্টা পরিষদ অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অতিদ্রুত সচল করতে হবে। দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীরা অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের বাইরে আছেন। আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানাব, অতিদ্রুত উপাচার্যসহ পদত্যাগ করা পদগুলোয় যোগ্যদের নিয়োগ দিয়ে সুষ্ঠু শিক্ষাকার্যক্রম ফিরিয়ে আনার।’
এ প্রসঙ্গে ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রায় তিন মাস ধরেই ছুটি, আন্দোলনসহ নানা কারণে অনেকটা অচল হয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। শিক্ষার পরিবেশ অনেকটা বিনষ্ট হয়েছে। নতুন সরকারের উচিত দ্রুত শিক্ষার এ বিষয়ে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় নজর দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পদত্যাগ করা পদগুলোতে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে পুনরায় সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। সে ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।’
আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিভাবক না থাকায় একটা সংকট দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে ছাত্রদের বড় ভূমিকা রয়েছে। তারা ক্লাসে ফিরতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও আন্তরিকভাবে সব কিছু শুরু করবে। আশা করি দ্রুত ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসবে এবং আগের রূপে ফিরবে বিশ্ববিদ্যালয়।’
খুলছে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান : আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর ৭ আগস্ট থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও স্কুলগুলোয় ভয় ও আতঙ্কে উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজ রবিবার থেকে খুলে দিয়ে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে নতুন করে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। গত বৃহস্পতিবার জারি করা এই নির্দেশনায় বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিয়ে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে গত বুধবার এক আদেশে পুরোদমে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো খুলে শ্রেণি কার্যক্রম চালুর নির্দেশ দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
