আফগানিস্তানে গোপন বিউটি সেলুন

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৪, ১২:৩৬ এএম

নারীদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। তাদের নিয়ন্ত্রণের ফাঁক গলে লুকিয়ে দেশটির নারীরা আনন্দ উপভোগ করেন। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সরে যাওয়ার পর আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে তালেবানরা। ক্ষমতায় আরোহণের পর থেকে নিজেদের বিশ্বাস ও রীতি অনুযায়ী তারা নারীদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। শিক্ষা, চাকরি থেকে শুরু করে নারীর পোশাক-চলাফেরায়ও তাদের কড়া বিধিনিষেধ। এসব নিষেধাজ্ঞার ফাঁক গলে নারীরা তাদের নিজের পছন্দমতো জীবনের রূপসুধা পান করছেন। চলতি বছর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এ বিষয়ে জানা যায়। সেখানে প্রকাশিত হয় আফগান নারীদের এক গোপন সেলুনের কথা। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, তালেবান হেডকোয়ার্টারের ঠিক পাশেই আছে এক বিউটি সেলুন। সেখানে নারীরা তাদের নিজের মতো সাজ নেন। তবে ভয়ে থাকেন, কখন ধরা পড়ে যান আর সাজা পেতে হয়।

দ্য নেশন জানাচ্ছে, তালেবান ক্ষমতায় এসে আফগানিস্তানে প্রায় ১২০০০ নারীর সেলুন বন্ধের নির্দেশ দেয়। তবে অনেক নারী হুমকি সত্ত্বেও কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য গোপনে তাদের সরঞ্জাম বাড়িতে সরিয়ে নেন। ক্রমাগত অভিযান এবং ভয়ের মুখেও অদম্য এসব নারী তাদের পরিবারকে সমর্থন করার জন্য তালেবানদের নিপীড়নমূলক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেন। জীবনের হুমকি, নির্যাতনের ভয় নিয়ে তারা মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধার এবং তাদের পেশা চালিয়ে নেওয়ার লড়াইয়ে অবিচল আছেন।

তালেবান নির্দেশ দিয়েছে, নারীদের এমন পোশাক পরা উচিত যাতে কেবল চোখ দেখা যায়। এ ছাড়া তাদের নির্দেশ অনুযায়ী নারীরা ৭২ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে ভ্রমণ করলে অবশ্যই সঙ্গে কোনো পুরুষ আত্মীয় থাকতে হবে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে তালিবানের নেওয়া বড় পদক্ষেপের একটি ছিল বিউটি সেলুনগুলো বন্ধ করা। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর সেগুলো আবার চালু হয়। পরে গত বছর আবার সেগুলো বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়।

ভীত কাঁচির শব্দ

আল-জাজিরার প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছে এভাবে, তালেবান সদর দপ্তরের কাছে এক অ্যাপার্টমেন্টে খুব সাবধানে চলাফেরা করছেন এক তরুণী। তার ছদ্মনাম ব্রেশনার, বয়স ২৪ বছর। গত বছরের মতো এবারও তার হাত ঘামছে এবং কাঁপছে। সেটা সামলে তাকে অবশ্যই সতর্কভাবে নড়াচড়া করতে হবে। কারণ তিনি তার এক ক্লায়েন্টের চুল কাটছেন। যার চুল কাটা হচ্ছে তার বয়স ৫০। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে তার ভাগ্নির বিয়ে। এটি একটি বড় খুশির মুহূর্ত তার জন্য। আর এ উপলক্ষে সবচেয়ে সেরাভাবে উপভোগ করতে চান তিনি। তাই এসেছেন ব্রেশনারের কাছে। ব্রেশনার নামের তরুণীটি এক হাতে চিরুনি, অন্য হাতে কাঁচি নিয়ে গভীর মনোযোগে চুল কাটছেন। বারবার তার কাঁচিতে শব্দ উঠছে। খুব পেশাদারির সঙ্গে তিনি চুল কাটছেন। কারণ এটি তার জীবিকা। ভুল করা যাবে না। এই কাঁচির শব্দ বা হেয়ার ড্রায়ারের গুঞ্জন যতদিন চলবে, ততদিন তিনি করে খেতে পারবেন। এগুলো বন্ধ হয়ে গেলেই বিপদ। আবার তালিবানি শাসনের তলায় এসব শব্দ চাপা দিয়ে রাখতে হচ্ছে তাকে। যদি একটু জোরে শব্দ হয় আর তালেবান শাসকরা শুনে ফেলে এ ভয়ে থাকেন ব্রেশনার। তিনি বলেন, ‘তালেবানরা আমাদের কথা শুনতে পেলে কী ঘটবে? আমি সারাক্ষণ ভয় পাই যে এই বুঝি ডোরবেল বেজে উঠল। এটা হতেই পারে. তারা যে কোনো মুহূর্তে আসতে পারে। ততক্ষণে চুল কাটা শেষ। তার ৫০ বছর বয়সী তার ক্লায়েন্টের মুখও আনন্দে আলোকিত। জানালেন, যত ভয় থাকুক তিনি আবার আসবেন ব্রেশনারের গোপন বিউটি পার্লারে।

ভয়ে কাবু নন তারা

দ্য গার্ডিয়ান একই ধরনের আরেকটি প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, কাবুলের একটি শহরতলি এলাকা, সকাল ৯টা বাজে তখন। বিষণœ আবহাওয়া বিরাজ করছে। গোলাপি রঙের বোরকা পরা দুই নারী খুব সন্তর্পণে একটি ভবনের দরজার বেল বাজালেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, আমরা কি ভেতরে আসতে পারি? সোনিয়া (ছদ্মনাম) নামে একজন নারী দরজা খুললেন। তার বয়স ৫৬ বছর। ২০২১ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানে আবার ক্ষমতায় এলে এই হেয়ার স্টাইলিস্ট এবং বিউটি সেলুনের মালিকের পার্লারটি বন্ধ করে দেয়। তিনি কখনো কল্পনা করেননি যে, তাকে গোপনে কাজ করতে হবে। ক্লায়েন্টদের ঘরে ঢুকতে দেওয়ার পর সোনিয়া যান্ত্রিকভাবে সৌন্দর্যবর্ধক যন্ত্রপাতি খুলতে শুরু করেন। এর মধ্যে রয়েছে মেকআপ প্যালেট, হেয়ার ড্রায়ার, ফ্ল্যাট আয়রন, মোম, মাশকারা, নেইল পলিশ, নকল নখ, ব্রাশ-ইত্যাদি। এভাবে গোপনে বিউটি সেলুন চালানোর জন্য তাকে জরিমানা, কয়েক মাস জেল বা আরও খারাপ শাস্তি পেতে হতে পারে। কিন্তু সোনিয়া ভয়ে কাবু হতে নারাজ। কারণ ভীত থাকলে মনোনিবেশে সমস্যা হবে। তখন আইলাইনার সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। আর একবার এমন হলে গ্রাহকরা ফিরে যাবেন। গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, তালেবানরা ২০২৩ সালের জুলাইয়ে আফগানিস্তান জুড়ে বিউটি সেলুন বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার সময় বলেছিল ভ্রু আঁকা এবং মেকআপ দেওয়া ইসলামিক আইনের লঙ্ঘন। তাদের ঘোষণায় ১২০০০-এর বেশি নারীর সেলুন বন্ধ হয়ে গেলে আনুমানিক ৬০ হাজার নারী কাজ হারান। তবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরও অনেক বিউটিশিয়ান অর্থকষ্ট মেটাতে তাদের পরিবারকে খাওয়াতে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যেমন ৩৭ বছর বয়সী এক নারী বলেন, ‘আমি টাকার জন্য আমার মেয়েদের বিয়ে দিতে রাজি নই। আমাকে অবশ্যই জীবিকা অর্জন করতে হবে।’

আল-জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে আরেক নারীর নাম জানাচ্ছেন মুরসাল (২২)। যদিও এটি ছদ্মনাম। অন্যান্য অনেক তরুণীর মতো তার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে অলস বসে থাকছিলেন। তবে এভাবে সময় পার করতে রাজি হননি মুরসাল। পড়াশোনা বন্ধ থাকায় পরিবারকে সহায়তার জন্য বিউটি পার্লারে খণ্ডকালীন কাজ করছিলেন তিনি। পরে বিউটি সেলুনও নিষিদ্ধ হয়ে গেলে তিনি গোপনে কাজ চালিয়ে যান। মুরসাল বলেন, যদিও এটি একটি বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত ছিল, তবে আমি এক সেকেন্ডের জন্যও দ্বিধা করিনি। ভয় আমার পরিবারকে খাওয়াবে না বা আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরিয়ে নেবে না। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সহপাঠীরা অনেকে একই রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যেমন আরেকজন বলছেন, আগে আমি পড়াশোনার খরচ জোগাড়ের জন্য কাজ করতাম। এখন আমি বেঁচে থাকার জন্য কাজ করছি।

কৌশল

দ্য গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, কিছু নারী তাদের ঘরকে সেলুনে রূপান্তরিত করেছেন। গ্রাহক এমনভাবে তাদের বাড়ি যান যেন বেড়াতে এসেছেন। তারপরও তালেবান শাসকদের এড়াতে তাদের অনেক কৌশল অবলম্বন করতে হয়। যেমন একজন বিউটিশিয়ান দ্য গার্ডিয়ানকে বলছেন, আমরা গ্রেপ্তার এড়াতে কৌশল ব্যবহার করি। উদাহরণস্বরূপ, আমার ক্লায়েন্টরা একটি নির্দিষ্ট রঙের বোরকা পরেন যাতে আমি জানি যে এটি তাদের। আমি কখনো একই রাস্তা ধরে এবং একই সময়ে বাইরে বের হই না। তিনি জানান, তাদের সরঞ্জাম বহনের জন্য প্লাস্টিকের ব্যাগও সাবধানে বেছে নেওয়া হয়। সাধারণ কোনো ব্র্যান্ডের ব্যাগের ভেতর তারা সেগুলো বহন করেন। কেউ বোরকার নিচে ‘নিষিদ্ধ’ এসব পণ্য লুকিয়ে বহন করেন। ব্রেশনারও আল-জাজিরাকে জানান, তাকেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। তার কাজের সময় কখনো একই হয় না এবং তিনি তার চলাফেরা সম্পর্কে খুব সতর্ক থাকেন। তিনি বলেন, আমি সবসময় শর্টকাট নিই এবং ক্যামেরা এড়িয়ে চলি। সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় হলো যখন আমি মেকআপ কিনি। তিনি জানান, তাকে নিয়মিত নতুন পণ্য কিনতে যেতে হয়। তবে তিনি কখনো এক জায়গায় খুব বেশি কেনাকাটা করেন না। ব্রেশনার জানান, বিউটিশিয়ানরা প্রায় সবাই সবাইকে চেনে। না চিনলে বিপদ। কারণ বিক্রেতা বা ক্রেতাদের মধ্যে তালেবানদের জন্য গুপ্তচরও থাকতে পারে। ব্রেশনার বলেন, যখন আমি কোথাও যাই, আমার বোরকার নিচে বা শপিং ব্যাগে স্ট্রেইটনার এবং হেয়ার ড্রায়ার লুকিয়ে রাখি, যাতে তালেবানরা মনে করে আমি মুদি দোকান থেকে এসেছি।

দ্য গার্ডিয়ানকে নুর (ছদ্মনাম) নামে একজন বলছেন, আমরা সবাই তালিবানের বন্দি। আমি একজন নারী হয়ে জন্মেছি এবং এটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ। আমার সৌন্দর্য আমার স্বাধীনতার সমান। তিনি বলেন, এক সময়ে যা অভ্যাস ছিল তা এখন বিপজ্জনক বিলাসিতা হয়ে উঠেছে। আমরা গান শুনতাম এবং পশ্চিমাদের মতো পোশাক পরতাম। এটা ছিল আমাদের স্বাধীনতা। তালিবানের আগের শাসনামলও এত কঠোর ছিল না বলে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জানাচ্ছেন গার্ডিয়ানকে। তিনি বলেছেন, আগে প্রতি দুই সপ্তাহে স্থানীয় বিউটি সেলুনে যেতেন। এখন তিনি প্রতি দুই মাসে নিজেকে গোপন করে বিউটি সেলুনে যান। বাইরে যাওয়ার সময় তার রঙিন নখ লুকাতে গ্লাভস পরেন।

লিলিও গার্ডিয়ানকে বলেন, পৃথিবীর প্রতিটি নারীর মতো আমিও সুন্দর হতে চাই। তালেবানরা আমাকে কাজ করা এবং একা চলা থেকে বিরত রাখতে পারে, কিন্তু তারা কখনো আমার সৌন্দর্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। আমার এক সহকর্মীকে তার গোপন সেলুনের কারণে তালেবানরা গ্রেপ্তার করেছিল। তার পর থেকে কেউ তার খবর জানে না। গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, তালেবান ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তানের ২১ মিলিয়ন নারী ধীরে ধীরে এমনকি তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তারা বাড়িতেই সীমাবদ্ধ জীবনযাপন করছেন। পড়াশোনা, কাজ বা অবাধে চলাফেরা তাদের জন্য নিষেধ। তবে দেশটিতে নারীদের আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়েছে এবং যৌন নিপীড়ন সর্বকালের সর্বোচ্চ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত