দিনের মধ্যভাগে আনসারদের সঙ্গে দৃশ্যত ফলপ্রসূ বৈঠক করলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। ঘণ্টাখানেক ধরে চলা বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো, আন্দোলনকারী বাহিনী সদস্যদের রেস্ট টাইম প্রথা বাতিলের। চাকরি জাতীয়করণসহ আনসার সদস্যদের অন্য দাবিগুলোর বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতেও বলা হয়। যে কমিটির প্রধান করা হয় আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আব্দুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদকে। ল্যাঠা মোটামোটি শেষ। গত রবিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ২৬ মিনিটের ভাষণ দিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ভাষণে কথা কম কাজ বেশির বার্তা। সেইসঙ্গে জনগণ যখন চাইবে তখন এ সরকারের বিদায় নেওয়ার সারকথা। এর কিছু সময়ের মধ্যে আনসার-ছাত্র সংঘর্ষের খবর। একদিনের মধ্যে এসব ঘটনার একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পৃক্ত না হলেও, যা ঘটার ঘটে গেছে। ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক সরকারের নানা কাণ্ডকীর্তির দায় না চাপলেও, অনেক কিছুরই দায়িত্ব নিতে হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদেরও সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হচ্ছে। বিচারপতিদের গেম ওভার করতে হয়েছে। একপর্যায়ে আনসারদের গেমও আপাতত ওভার হয়েছে। তাদের এ ওভারের অভিযাত্রায় আর কোনো ওভার যোগ হবে বা হতে পারে কি না, তা গুরুতর প্রশ্ন। দেশের ১২-১৩টা জেলায় বন্যা চলছে। এ সময় ছাত্র, এমনকি আনসারদেরও থাকার কথা বন্যার্তদের পাশে। তা না করে সচিবালয়ের সামনে অবস্থান। কে আনল তাদের সেখানে?
এই প্রশ্নের মধ্যেই সচিবালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে সব ধরনের গণজমায়েত, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি। কেন নিতে হলো এমন সিদ্ধান্ত? হোক বন্যা-দুর্যোগসহ আরও নানা দুর্গতি। দাবিতে কোনো ছাড় নেই। সবার সব দাবি এখনই পূরণ করতে হবে। মানতে হবে, মানে আদায় করে ছাড়া হবে। তাও সরাসরি প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের কাছে। জনাকয়েক একত্র হয়ে চলে যাচ্ছেন তার রাষ্ট্রীয় বাসভবন যমুনায়। সকাল-সন্ধ্যায় তার বাসভবন থেকে বের হওয়া বা ঢোকার সময় ঘিরে ধরা। নিরাপত্তায় নিয়োজিতদের ঘাম ছুটে যাচ্ছে বিক্ষোভরতদের সরিয়ে প্রধান উপদেষ্টার জন্য বাসায় ঢোকা বা বের হওয়ার পথ তৈরি করা। নগদে এবং খাড়ার মধ্যে আজই, এখনই দাবিনামা আদায় করে ছাড়ার মতো অবস্থা। এই দাবিদাররা এতদিন কোথায় ছিলেন, কেন তারা দাবি নিয়ে এভাবে সোচ্চার হননি বা হতে পারেননিতাও জানার বাইরে নয়। ১৫ বছরে তাদের ঘুম ভাঙেনি। আসলে সজাগই ছিলেন। এখন মন ভরে আওয়াজ দিতে পারছেন। যে কারণে অস্থায়ী দশা কাটিয়ে চাকরি পাকা করে বৈষম্য থেকে মুক্তি, চাকরি ফেরত দেওয়াসহ কত যে দাবি। সচিবালয় থেকে শুরু করে পুলিশ ভবন, শাহবাগ সবখানেই ‘চাই আর চাই, দিতে হবে দিয়ে দাও।’ গোটা দেশ বন্যায় ভাসুক, আন্দোলনে নিহতদের রক্ত না শুকাক বা আহতদের কাতরানি চলুক, তাতে কিচ্ছু যায়-আসে না। দাবি মানতেই হবে। ১৫-১৬ বছর ধরে যেসব মানুষ কথা বলার সাহস করেননি, ৫৩ বছরে যারা রাস্তায় নামার খুব একটা সাহস করেননি, তারাই অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাচ্ছেন সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাক। তর সইতে চান না তারা। রাজপথে নামছেন। সচিবালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঘেরাও করছেন। ড. ইউনূস বা তার উপদেষ্টাদের কেউ এখন আগের প্রধানমন্ত্রীর মতো বলে দেবেন, বেশি কথা বললে সব বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকব? না, তা মানাবে না। তা হলে তো আর তফাৎ থাকবে না। জাতির উদ্দেশ্যে তিনি সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান আশা না করতে।
জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ছোট ছোট করে কয়েকটি বড় বিষয় সামনে এনেছেন। জানিয়েছেন, ‘দেশবাসীকে ঠিক করতে হবে, কখন আমাদের ছেড়ে দেবেন’। এও যোগ করেছেন, কখন নির্বাচন হবে সেটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সরকারের নয়। দেশের সংকটকালে ছাত্রদের আহ্বানে তারা এই দায়িত্ব নিয়েছেন উল্লেখ করে বলেছেন, সরকার সমস্ত শক্তি দিয়ে এই দায়িত্ব পালন করবে। শক্তি দেখানো বা শাসনে আনার কথা এর আগ পর্যন্ত কখনো বলেননি ড. ইউনূস। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো জাতির উদ্দেশে ভাষণে বিচার বিভাগ, পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগের কথাও জানান দেন। ‘বুঝলে বুঝপাতা, না বুঝলে তেজপাতা’র মতো কথাগুলোর প্রতিটি শব্দই মেসেজে ঠাসা। যেমন ‘...আমরা কেউ দেশ শাসনের মানুষ নই। ...আমরা ছাত্রদের আহ্বানে এসেছি। তারা আমাদের প্রাথমিক নিয়োগকর্তা। দেশের আপামর জনসাধারণ আমাদের নিয়োগ সমর্থন করেছে। আমরা ক্রমাগতভাবে সবাইকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে যাব, যাতে হঠাৎ করে এই প্রশ্ন উত্থাপিত না হয়, আমরা কখন যাব’। এসব দিকনির্দেশনা না পেলে তারা দাতা সরকার এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনায় দৃঢ়তার সঙ্গে অগ্রসর হতে পারছেন না বলেও উল্লেখ করেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, ‘...লাখ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এবং লাখ লাখ মা-বোনের আত্মদানের বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের হাতে ধ্বংস হয়ে গেছে। দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে দুর্নীতি। বাংলাদেশ এমন এক দেশে রূপান্তর হয়েছে যেখানে স্বৈরাচারের পিয়নও দুর্নীতির মাধ্যমে ৪০০ কোটি টাকার সম্পদ করার মতো অকল্পনীয় কাজ করে গেছে নির্বিবাদে। শিক্ষা খাতকে পঙ্গু করে দিয়েছে, ব্যাংকিং ও শেয়ার বাজার খাতে লুটপাট, প্রকল্প ব্যয়ে বিশ্ব রেকর্ড, অবাধ সম্পদ পাচার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে নিজ দলের পুতুলে রূপান্তর, বাকস্বাধীনতা হরণ, মানবাধিকার হরণ এ সবই হিমশৈলের অগ্রভাগ মাত্র।’
বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সব উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন। পর্যায়ক্রমে এটি সব সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত এবং বাধ্যতামূলক করা হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে প্রতিশ্রুত ন্যায়পাল নিয়োগে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হবে। বলার আর অপেক্ষা থাকছে না, অনিবার্য কারণে ড. ইউনূসের শাসনের ভলিউমটা বেশ বড়। অনেক কাজ তার হাতে। অল্প সময়ের মধ্যে এ কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোও তা ভালো করে জানে। তারা সময় দিতে চায়। কিন্তু, ওই সময়টা কত সময় তা উহ্য। এরইমধ্যে বিএনপি থেকে বলা হয়েছে, ড. ইউনূসকে অন্তত নির্বাচনের একটি রোড প্ল্যান বা টাইম ফ্রেম দিতে। সহযোগী অন্যান্য দল এখনো তা এভাবে না বললেও কথা তৈরি করছে তারা। আবার আওয়ামী লীগ-বিএনপির চেয়ে এ সরকারের শাসন অনেক ভালো এবং নিজেদের জন্য যারপরনাই নিরাপদ মনে করার মহলও আছে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে মহলের ভেতরের মহল, বাইরের মহলসহ ইত্যাদি অংশীজনদের মতিগতি। সঙ্গে নানান যুক্তিও। পুলিশ কদাকার হয়ে গেছে বলে পুলিশের ড্রেস বদলে ফেলার পরামর্শ আসছে। আনসাররা ভেজাল করেছে বলে, গোটা বাহিনীটিই বাদ দেওয়ার পরামর্শ ও উৎসাহী মহলও আছে।
দেশের কোনো বিভাগ বা বাহিনীই অপ্রয়োজনে করা হয়নি। যত সমস্যা হয়েছে বাহিনী বা বিভাগের ইউজারদের কারণে। শাসকরা যেভাবে শাসন করেছেন বাহিনী বা বিভাগ সেভাবেই আত্মস্থ হয়েছে। আর শাসিত হয়েছে জনগণ। আইনের শাসনের বদলে কায়েম হয়েছে শাসনের আইন। আনসাররা সেদিন যা করেছে তা শাসন, আইন কিছুতেই পড়ে না। এটি বিদ্রোহও নয়। ট্রেড ইউনিয়ন ধাঁচের পাণ্ডামি। চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে রবিবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকেই টানা চতুর্থ দিনের মতো রাস্তায় ছিল আনসার সদস্যরা। সচিবালয়ের পাশে প্রেস ক্লাবের সামনের সড়ক আটকে সমাবেশও করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সচিবালয়ের দিকে অগ্রসর হলে কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মীরা সচিবালয়ের সব কয়টি গেট আটকে দেয়। এ সময় আনসার সদস্যরা কাউকে সচিবালয়ে প্রবেশ এবং বের হতে দেয়নি। এক পর্যায়ে বেলা দেড়টার দিকে দুই শতাধিক আনসার সদস্য ঢুকে পড়ে সচিবালয়ে। সচিবালয়ের ভেতরে স্লোগানও দেয়। স্বরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উপদেষ্টাদের সঙ্গে তাদের বৈঠকে একটি ফয়সালাও হয়। সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের পর তারা আবার উতলা। মারমুখী হয়ে ওঠে ছাত্রদের ওপর। যেখানে ৫ আগস্টের পর থেকে ছাত্ররা সম্মান-স্নেহের উচ্চাসনে। সেখানে সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহসহ কয়েক ছাত্রকে পিটিয়ে নাস্তানাবুদ করে আনসাররা রীতিমতো ইজ্জত অমর্যাদা করেছে এই তরুণরাজদের। কে করাল কাজটা?
আনসার দুই ধরনের। ব্যাটালিয়ন আনসার এবং অঙ্গীভূত আনসার। সচিবালয়ে তান্ডব চালানোরা অঙ্গীভূত আনসার। তাদের নিয়োগ প্রায় পুরোটাই রাজনৈতিক লাঠিয়ালের মতো। মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদকে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ডিজি হিসেবে সদ্য নিয়োগ দিয়েছে ড. ইউনূস সরকার। তিনি জানিয়েছেন, আন্দোলনকারী আনসার সদস্যদের সঙ্গে ব্যাটালিয়ন আনসারের কোনো সম্পর্ক নেই। ব্যাটালিয়ন ও অঙ্গীভূত দুই আনসারেরই ডিজি তিনি। তার জন্য পরিস্থিতিটা বিব্রতকর। তার নিজের ও বাহিনীরও যখন অন্যদের সঙ্গে বন্যার পানিতে কোমর ডুবিয়ে ত্রাণকাজে থাকার কথা, সেখানে কী নিয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে!
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
