ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আরজি কর হাসপাতালের এক তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ-আন্দোলন এবার রূপ নিয়েছে রাজ্য সরকার বিরোধী আন্দোলন। পশ্চিমবঙ্গ ছাত্রসমাজ-এর ব্যানারে গতকাল মঙ্গলবার রাজ্য সচিবালয় অর্থাৎ নবান্ন অভিযানের কর্মসূচি ছিল আন্দোলনকারীদের। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়ের পদত্যাগের দাবিতে ওই পদযাত্রায় ছিল বিজেপিসহ আরও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও। তবে পুলিশের বাধায় শেষ অবধি পণ্ড হয়ে যায় সেই কর্মসূচি।
এদিকে জনতার ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বিজেপি। আজ বুধবার পশ্চিমবঙ্গে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এ ধর্মঘট পালন করবে দলটি। আনন্দবাজার পত্রিকা জানাচ্ছে, গতকাল দুপুরের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে নবান্ন ঘেরাও করে হাজার হাজার মানুষ। তবে নবান্ন অভিযানের অনুমতি দেয়নি রাজ্য পুলিশ। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয় আন্দোলনকারীদের।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, নাশকতা করা হবে এমন প্রমাণ থাকায় সকাল থেকেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের দপ্তর ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয় পুলিশ। কলকাতা জুড়ে মোতায়েন করা হয় ৬ হাজারের বেশি পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের বাধা দিতে ১৯টি পয়েন্টে ব্যারিকেডও দেওয়া হয়। তবে সব বাধা উপেক্ষা করে নবান্ন অভিযান শুরু হলে কলকাতার রাস্তায় বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাসের শেল ও জলকামান ব্যবহার করে দাঙ্গা পুলিশ। বাধা পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাল্টা ইট-পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। কয়েকটি পয়েন্টে ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগোতে থাকেন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। এ সময় অনেক বিক্ষোভকারীকে ব্যারিকেডের ওপরে উঠে স্লোগান দিতে দেখা যায়। এছাড়া মিছিল এবং জমায়েত থেকেও স্লোগান উঠছে, ‘দাবি এক, দফা এক, মমতার পদত্যাগ।’ বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতে থাকা কালো পোস্টারেও এই স্লোগান দেখা যায়।
এদিকে বিক্ষোভে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছে আনন্দবাজার। পূর্ব মেদিনীপুরের বাসিন্দা প্রদীপ ঘোড়ুই নবান্ন অভিযানে এসে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তবে তিনি আন্দোলনকারী নন, চাকরি করেন বলে দাবি জানান।
এদিকে মঙ্গলবার সকালে বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, ‘বিক্ষোভে অংশ নেওয়া চার ছাত্রকে গতকাল মধ্যরাত থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ সময় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশ বাহিনী দিয়ে এই ছাত্রদের তুলে নিয়ে গেছে বলেও অভিযোগ জানান।
আর তার দল জনতার ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। আজ বুধবার পশ্চিমবঙ্গে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এ ধর্মঘট পালন করবে বিজেপি।
তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার জনগণকে সাধারণ ধর্মঘটে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধর্মঘট সত্ত্বেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ্য উপদেষ্টা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, পরিবহন পরিষেবা চলবে, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে। রাজ্যের সরকারি কর্মীদের কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
ধর্ষণ-হত্যার ঘটনা আড়াল করার অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও পুলিশ কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করেন বিজেপির মুখপাত্র গৌরব ভাটিয়া। মমতাকে স্বৈরশাসক উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংবিধানকে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে, অপরাধীদের পরিবর্তে মুখ্যমন্ত্রী ছাত্রদের টার্গেট করছেন, তবুও ইন্দিরা জোট নীরব।
ভাটিয়া বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্টতই অবস্থান নিয়েছেন যে তিনি নারীদের ন্যায়বিচার ও সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হলেও অভিযুক্তদের রক্ষা করবেন। কলকাতা হাইকোর্ট বলছে, ‘রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে’ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে, যার জন্য একমাত্র দায়ী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নৈরাজ্যবাদী নেতৃত্ব।
এদিকে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় বিক্ষোভকারীদের মোকাবিলায় কলকাতা পুলিশের কঠোর আচরণের সমালোচনা করলেন বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা। এক্স-এর একটি পোস্টে তিনি বলেছেন, দিদির পশ্চিমবঙ্গে ধর্ষক এবং অপরাধীদের সাহায্য করা মূল্যবান কিন্তু নারীর নিরাপত্তার জন্য কথা বলা একটি অপরাধ।
অবশ্য মমতার ভাবমূর্তি ক্ষন্ন করার জন্য বিজেপিকে দোষারোপ করছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলটির নেতাদের অভিযোগ, ‘বিজেপির গুণ্ডারা’ প্রতিবাদকে সহিংস রূপ দিয়েছে।
এক্সে দেওয়া পোস্টে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ লিখেছেন, বিজেপির বাংলা বন্ধ ব্যর্থ করুন। সবাই দেখেছেন, আজ বিজেপির গুন্ডারাই হামলা, ব্যারিকেড ভাঙা, পুলিশকে আক্রমণ করেছে। পুলিশ জখম। তবু সংযত। ওরাই গোলমাল করেছে। ওরাই অচলাবস্থার জন্য বন্ধ ডাকছে। এই বন্ধ ব্যর্থ করুন। জনজীবন স্বাভাবিক রাখুন।
পুলিশ জানিয়েছে, কর্মসূচি ঘিরে বড় ধরনের সহিংসতা ও হত্যাচেষ্টার ষড়যন্ত্র করছিল ছাত্ররা। জননিরাপত্তার স্বার্থে কয়েকজন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের পরিবারকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
গত ৯ আগস্ট কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজে ৩১ বছর বয়সী এক নারী চিকিৎসক ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন। এরপর বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো কলকাতা।
