পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশু লামিয়া। বাবাকে ছাড়া তার চলেই না। চার দিন ধরে বাবাকে দেখতে না পেয়ে মুখে কোনো খাবারই তুলতে চাইছে না। ঘুরেফিরে শুধু একটা কথাই বলছে, আর তা হলো, ‘আমি বাবার কাছে যামু। তোমরা আমারে বাবার কাছে নিয়া যাও। বাবার কাছে না নিলে আমি কিছু খামু না।’ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসীতে গাজী টায়ার্স কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ রয়েছেন শিশু লামিয়ার বাবা সোহেল রানা। পেশায় রিকশাচালক সোহেল তার স্ত্রীর মোবাইল ফোনে কল করে চার দিন আগে শেষবারের মতো শুধু একটা কথাই বলেছিলেন, ‘আমাকে বাঁচাও, আমি আগুনে আটকা পড়েছি।’
স্ত্রী শারমিন আক্তার জানান, দিনভর রিকশা চালিয়ে বাসায় ফেরার পথে প্রতিদিনই মেয়ে লামিয়ার জন্য দোকান থেকে কোনো না কোনো খাবার কিনে আনতেন সোহেল রানা। পরে মেয়েকে নিজ হাতে সেই খাবার খাইয়ে দিতেন। গত ২৪ আগস্ট রাত ৯টার দিকে গাজী টায়ার্স কারখানায় লুটপাটের খবর পেয়ে সেখানে যান তিনি। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে স্ত্রীর মোবাইল ফোনে কল করে বলেন, ‘আমার চারপাশে আগুন, আমাকে বাঁচাও।’ শিশু লামিয়া এখনো জানে না তার বাবা কোথায়। লামিয়াকে বলা হয়েছে তার বাবা কাজের অন্য এক জায়গায় গিয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ফিরে আসবে। গাজী টায়ার্স কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল বুধবার রাত পর্যন্ত ১২৯ জন নিখোঁজের কথা জানিয়েছেন স্বজনরা। এই নিখোঁজদের একজনের বাবা সাইফুল ইসলামকে গতকাল আগুনে পোড়া গাজী টায়ার্স কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে ছেলের ছবি হাতে বিলাপ করে কাঁদতে দেখা যায়। সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার পোলা রাব্বির লাশ লাগব না, শুধু হাড্ডিগুলা ফিরাইয়া দেন স্যার। আমি হাড্ডিগুলা নিয়াই জানাজা পইড়া আমার পোলারে দাফন করমু। আমার পোলা ছাড়া কেমনে বাঁচমু। ওরে নিয়া আমাগো অনেক বড় স্বপ্ন আছিল।’
সাইফুল ইসলাম বিলাপ করতে করতে জানান, তার ১৫ বছরের কিশোর ছেলে রাব্বি মিয়া গত ২৫ আগস্ট রাতে বন্ধু জিহাদের সঙ্গে গাজী টায়ার্স কারখানায় গিয়েছিল। এরপর থেকে তারা দুজন নিখোঁজ রয়েছে। শুধু সাইফুল ইসলামই নন, আগুন লাগা গাজী টায়ার্স কারখানার ছয়তলা ভবনে আটকে পড়ার পর নিখোঁজদের বহু স্বজন কয়েক দিন ধরে ভিড় করে আছেন কারাখানাটির সামনে। তাদের কেউ নিখোঁজদের ভাই, বাবা, স্ত্রী, সন্তান বা চাচা।
নিখোঁজ রাব্বি মিয়া স্থানীয় হাজি আনোয়ার হোসেন উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগে দশম শ্রেণিতে পড়ত। তার বাবা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি দিনমজুরের কাম কইরা কষ্ট কইরা সংসার চালাইলেও স্বপ্ন আছিল পোলাডারে ডাক্তারি পড়াইয়া ডাক্তার বানামু। আমার পোলা অনেক ভালা ছাত্র আছিল। ২৫ আগস্ট রাত ৯টার দিকে বন্ধু জিহাদের লগে আমার পোলা রাব্বি ঘর থেকে বাইর হইয়া গাজী ফ্যাক্টরির ভেতরে দেখতে যায়। তখন থেইকা আমার পোলার আর কোনো খোঁজ নাই।’
একই ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন কারখানাটির পাশের কাহিনা এলাকার শফিক মিয়া। তার ভাই রাজীব মিয়া বলেন, ‘আমার ভাই শফিক গাজী টায়ার কারখানায় রাত ৯টার দিকে গিয়েছিল। পরে রাত দেড়টার দিকে আমার ফোনে কল দিয়ে বলে, “ভাই আমারে বাঁচাও, আমি গাজী টায়ার কারখানায় আগুনে আটকা পড়ছি”। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।’
নিখোঁজ রয়েছেন রূপসী কলাবাগান এলাকার শেখ ফরিদ। তার স্ত্রী জোসনা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী গত ৫ আগস্ট গাজী টায়ার ফ্যাক্টরি থেকে টায়ার আইনা বন্ধুগো লগে বিক্রি করছিল। ২৫ তারিখও বন্ধুগো লগে গিয়েছিল টায়ার আনতে। রাত ৯টার দিকে আমার স্বামী আমারে কল দিয়া কইছিল, “আমরা ছয়তলা বিল্ডিংয়ের ভেতরে আটকাই আছি”।’
আরেক নিখোঁজ মিল্লাতের স্ত্রী সাদিয়া আক্তারকেও গতকাল আগুনে পোড়া গাজী টায়ার্স কারখানার সামনে স্বামীর সন্ধানে বিলাপ করতে দেখা যায়। সাদিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘গাজীর এই কারখানায় আমার স্বামী আইছিল মালামাল নিতে। কেডায় কইছিল আমার স্বামীরে এত লোভ করতে! লোভের লাইগাই আইজকা আমি তার কোনো খোঁজ পাইতাছি না। আমার এক ছেলে ও এক মেয়েরে অহন কেডা দেখব?’
