মহাশক্তির দুদক যেভাবে শক্তিহীন

ছোটখাটো দুর্নীতিবাজদের ধরলেও প্রভাবশালীদের বেলায় চুপ

  • দলীয় সরকারের চাপ
  • দুর্নীদি চক্রের সন্ধানে এখন আর মরিয়া নয়
  • দলীয় সরকারের সময় অনুগতদের নিয়োগ

 

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৪, ১১:০৪ এএম

এক-এগারোর পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুর্নীতি দমনে জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছিল। প্রায় দুই বছরে রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাসহ প্রভাবশালী অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুদকের কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে। ধীরে ধীরে ক্ষমতাসীনদের অনুগত হয়ে ওঠে সংস্থাটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নখদন্তহীন হয়ে পড়ে দুদক।

দুদকের শীর্ষপর্যায়ের সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংস্থাটির সবচেয়ে উজ্জ্বল সময় ছিল ২০০৭ ও ২০০৮ সাল বা ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সময়।

এরপর দলীয় সরকারের সময় সংস্থাটিতে অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। ছোটখাটো কিছু দুর্নীতিবাজকে আইনের আওতায় আনলেও প্রভাবশালীদের বেলায় নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগও আছে দুর্নীতি দমন কমিশনের বিরুদ্ধে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠিত হওয়ার আগে ছিল দুর্নীতি দমন ব্যুরো, যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন ছিল।

দুদকের কর্মকর্তারা বলেন, দুর্নীতি দমন ব্যুরো যখন ছিল, তখন তার কার্যকলাপ ছিল অনেকটা বিরোধী দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ অবস্থায় একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য দাতা দেশ এবং সংস্থাগুলোর তীব্র চাপ ছিল। সুশীল সমাজ থেকেও একইভাবে চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ২০০৪ সালে কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমে পাস হয় দুর্নীতি দমন আইন। গঠিত হয় কমিশন নিয়োগের বাছাই কমিটি। সবশেষ কমিশনের চেয়ারম্যান এবং কমিশনার নিয়োগের মাধ্যমে গঠিত হয় দুদক।

কর্মকর্তা বলেন, ওই সময় দাতাগোষ্ঠী এবং সুশীল সমাজ থেকে আশা করা হয়েছিল এটি হবে নিরপেক্ষ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। এমনকি তখনকার বিএনপি সরকারও দুদক প্রতিষ্ঠাকে অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে এর স্বাধীনতার কথাই বলেছিল। কিন্তু বাস্তবে সে সময়তো বটেই পরবর্তীকালেও সেটা আর বাস্তব হয়নি।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি সুলতান হোসেন খাঁন এবং কমিশনার পদে নিয়োগ পান অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা ও মনিরউদ্দিন আহমেদ। দৃশ্যত তখন থেকেই যাত্রা শুরু হয় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনের।

এরপর এক-এগারোর সরকারের সময় দুদক চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরী। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ মো. হাবিবুর রহমান ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য আবুল হাসান মনজুর মান্নান। দুই বছর এক মাস দায়িত্ব পালন করে দলীয় চাপে মহাশক্তির দুদক অসহায় হাসান মশহুদ চৌধুরী পদত্যাগের আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়াসহ তিন শতাধিক রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

ওই সময় দুর্নীতিবাজরা দুদকের হাত থেকে রক্ষা পেতে সরকারের গঠিত ট্রুথ কমিশনে নিজের দোষ স্বীকার করে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা করেছেন। অনেকে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ, গাড়ি, বাড়ি ফেলে আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ওয়ান-ইলেভেনের সময় দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যেসব দুর্নীতির মামলা হয়েছে ও যেসব মামলায় সাজা হয়েছে, সেগুলো আদালতের মাধ্যমে স্থগিত এবং বাতিল করে। একই সঙ্গে সাড়ে ১৫ বছরে নিজ দলের কোনো এমপি, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী ও আমলার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও তার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কোনো কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান শেষ না করেই উল্টো তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি পাওয়া যায়নি বলে ‘দায়মুক্তি’ দিয়েছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান-কমিশনাররা আওয়ামী লীগ সরকারের মদদপুষ্ট হওয়ায় তারা দলীয় দুর্নীতিবাজদের ধরতে চায়নি বা সাহস দেখায়নি। উল্টো তাদের রক্ষার দায়িত্ব পালন করে।

দলীয় সরকারগুলোর অধীনে দুর্নীতি পরিস্থিতির যে ক্রমাগত অবনতি ঘটেছে, সে চিত্র পাওয়া যায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) প্রতিবেদনে। গত ৩১ জানুয়ারি দেশের একটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশের দুর্নীতির চিত্রটি ধারণাসূচকে কেমন, টিআই তাদের প্রতিবেদনে সেটি তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর টিআইয়ের তালিকার শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। অর্থাৎ ওই সময়ে দুর্নীতির মাত্রা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ছিল বাংলাদেশে। ওই পাঁচ বছরের মধ্যে ২০০১ সালে দেশে তিনটি সরকার ক্ষমতায় ছিল। বছরের শুরুর দিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ, মাঝামাঝি সময়ে প্রায় তিন মাস ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আর ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি।

দুর্নীতি বেশি এমন দেশের তালিকায় ২০০৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল তৃতীয়, পরের বছর সপ্তম। ২০০৮ সালে দশম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। এরপর ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অবস্থান ঘুরেফিরে ১২ থেকে ১৭-এর মধ্যে ছিল। এবার তা ১০-এ নেমে এসেছে। অর্থাৎ ধারণাসূচক অনুযায়ী, দেশে দুর্নীতি আগের চেয়ে বেড়েছে।

সদ্য বিলুপ্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে যেসব প্রার্থী অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ১৮ জনের ১০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ আছে। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামার তথ্যবিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানায় টিআইবি। গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে এই বিশ্লেষণ তুলে ধরে সংগঠনটি। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জনের মধ্যে ১০ জন আওয়ামী লীগ মনোনীত। ৮ জন স্বতন্ত্র। এই ১৮ জনের মধ্যে সবার ওপরে আছেন গোলাম দস্তগীর গাজী। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী ছিলেন। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, তার সম্পদের মূল্য ১ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার বেশি।

তথ্যচিত্রে বলা হয়, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগে কোটিপতি প্রার্থী ছিলেন ২৭ শতাংশের কিছু বেশি। ১৫ বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ শতাংশ।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, দুদক শুধু এই সরকারের আমলেই এমন করেছে তা-ই নয়, অন্যান্য সরকারের আমলেও একই অবস্থা দেখা গেছে। দুদকের অবস্থা দেখে মনে হয় তারা ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে হাত দিতে পারে না, হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে। ক্ষমতার বাইরে গেলে, ক্ষমতাচ্যুত হলে অথবা ক্ষমতাসীন দলের উচ্চপর্যায়ের কোনো ব্যক্তি যদি কারও ওপর বিরাগভাজন হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। এ ছাড়া তারা চুনোপুঁটি ছাড়া অন্য কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না।

তিনি বলেন, এখন যাদের নিয়ে অনুসন্ধান করছে দুদক, তাদের সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ টিআইবি গত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে দুদকসহ অন্যান্য সংস্থার কাছে পাঠিয়েছিল। সেগুলোর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ তো গ্রহণ করেনি, এমনকি কোনো জবাবও দেয়নি। দুদক যে তৎপরতা দেখাচ্ছে, তার ফলাফল যাই হোক না কেন, এর মাধ্যমে তারা যে দায়মুক্ত হওয়া শুরু করেছে, তা ভাবার সুযোগ নেই।

দুদকের আমূল সংস্কার প্রয়োজন জানিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদক ঢেলে সাজাতে হলে উচ্চপর্যায়ে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে, বিশেষ করে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের, যাদের পেশাগত জীবনে উৎকর্ষ সাধন ও দুদকে কাজ করার সৎ সাহস আছে। এ ছাড়া আইন সংশোধনের মাধ্যমে দুদকের কিছু ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে, সেগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে।

সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ, দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন) মঈদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন যেসব বড় দুর্নীতিবাজদের কাহিনিগুলো বের হয়ে আসছে, দেখা যাচ্ছে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় যিনি আছেন, তিনি এসব লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি অন্য দুর্নীতিবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন।

মঈদুল ইসলাম বলেন, ‘ইতিমধ্যে বড় বড় দুর্নীতির খবর বেরিয়েছে। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের সে রকম কাজ দেখছি না। দুদক যদি সঠিকভাবে কাজ করত, তাহলে আজকে মন্ত্রী, এমপিসহ যাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতির অভিযোগ আছে, তাদের বিভিন্ন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এসব প্রশ্ন উঠত না, দুদক যদি কাজ করত, তারা যদি নিজেরা দুর্নীতিবাজদের গ্রেপ্তার করত।’

দুদকের অন্য একজন মহাপরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ওয়ান-ইলেভেনের সরকার আসার আগ পর্যন্ত দুদক তেমনভাবে কোনো মামলা-মোকদ্দমা বা অনুসন্ধান করতে পারেনি। কমিশনের বিধি তৈরি এবং দুর্নীতির মামলা-মোকদ্দমার যে প্রক্রিয়া, সেটা ওয়ান-ইলেভেনের সরকার আসার পর নতুন চেয়ারম্যানের অধীনে জোরদার হয়েছিল। ওই সময় দেশে জরুরি অবস্থা জারি ছিল। তখন দুদক থেকে নথিপত্র চাওয়া হলে দ্রুত পাওয়া যেত। ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই সম্পদের হিসাব পাওয়া যেত। এখন তো ৩৬ কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়। কিন্তু এই সময়ও পাওয়া যায় না। ওয়ান-ইলেভেনের সময় দলীয় সরকার ছিল না। ফলে দুদক ইচ্ছামতো কাজ করতে পেরেছে। দলীয় সরকার থাকলে দুদক ইচ্ছামতো কাজ করতে পারে না, নানা ধরনের চাপ থাকে। এ কারণে সব দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত