রাজনীতিতে তার শুরুটা হয়েছিল আওয়ামী লীগের হাত ধরে। মাঝে জাসদ হয়ে আবার ফিরেছেন আওয়ামী লীগে। হয়েছেন বড় নেতা ও মন্ত্রী। সড়কে দাপট শুরু হয়েছিল পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন দিয়ে। সেখান থেকে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের শীর্ষ নেতা হয়ে এ খাতের সম্রাট হয়ে ওঠেন। ক্ষমতা ও দাপটে অঢেল সম্পদও কামিয়েছেন। আর এ প্রভাবশালী নেতাটি হলেন শাজাহান খান।
শাজাহান খান সর্বশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নবম ও দশম সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত শেখ হাসিনা সরকারের নৌমন্ত্রী ছিলেন তিনি। একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জয়ী হলেও তাকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়নি। তবে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীতে আছেন শাজাহান খান। তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতিও।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনের আগে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, শাজাহান খানের বার্ষিক আয় ছিল ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। চলতি বছর ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দেওয়া হলফনামায় তিনি আয় দেখিয়েছেন ২ কোটি ২১ লাখ টাকা। অর্থাৎ তার আয় বেড়ে প্রায় ৩২ গুণ হয়েছে।
২০০৮ সালে শাজাহান খানের অস্থাবর সম্পদ ছিল প্রায় ৫৭ লাখ টাকার। এখন তা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় (আসবাব, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও বন্দুকের দাম বাদে)। অর্থাৎ তার অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে পাঁচগুণ।
মাদারীপুর-২ আসন থেকে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন শাজাহান খান। একই আসন থেকে তিনি পরের নির্বাচনগুলোতেও প্রার্থী হন। তিনি পেশা হিসেবে রাজনীতি, সাধারণ ব্যবসা ও অন্যান্য উল্লেখ করেছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করেন স্নাতক (পাস)।
হলফনামা অনুযায়ী, শাজাহান খানের দুটি গাড়ি রয়েছে, যার দাম ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এবার তার স্ত্রীর নামে ৮০ ভরি সোনা ছাড়া আর কোনো অস্থাবর সম্পদ দেখানো হয়নি। ২০০৮ সালে দুটি বাস, একটি গাড়ি ও একটি মাইক্রোবাস, ১৫ ভরি সোনাসহ প্রায় ৪১ লাখ টাকার সম্পদ দেখানো হয়েছিল।
শাজাহান খান ও তার স্ত্রীর বেশ কিছু কৃষি ও অকৃষিজমি রয়েছে। তার প্রায় ৬ কোটি টাকার ভবন ও সমজাতীয় স্থাপনা রয়েছে। দানসূত্রেও ফ্ল্যাট ও জমির মালিক হয়েছেন তিনি। তার স্ত্রীর নামে রয়েছে রাজউকের ১০ কাঠার প্লট ও অন্যান্য স্থাবর সম্পদ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শাজাহানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সার্বিক কনস্ট্রাকশন, সার্বিক শিপিং লাইন চট্টগ্রাম, সার্বিক ফুড ভিলেজ (সার্বিক হোটেল) সবকিছুই তার পরিবারের সদস্যদের নামে। বিশেষ করে ঢাকা-মাদারীপুর রুটের সার্বিক পরিবহন কোম্পানিতে একক আধিপত্য তার। এ পরিবহনের ব্যানারে ২০০টির বেশি গাড়ি চলাচল করত। এ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক করেছিলেন তার ছেলেকে।
শাজাহান খানের স্ত্রী সৈয়দা রোকেয়া বেগম একসময় একটি কলেজের প্রভাষক ছিলেন। তার জ্যেষ্ঠপুত্র আসিব খান আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং সর্বশেষ মাদারীপুরের সদর উপজেলার চেয়ারম্যান ছিলেন। ছোট ছেলে মাহাদী খান সামস। একমাত্র মেয়ে ঐশী খানকে বিয়ে দিয়েছেন টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনের আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) তানভীর হাসানের (ছোট মনির) সঙ্গে। ঐশীকেও বাসের মালিকানা দেওয়া হয়।
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকারের পতনের পর শাজাহান খানের সার্বিক পরিবহনের ৩২টি বাসে আগুন দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের মতো তিনিও গা-ঢাকা দিয়েছেন।
শাজাহান খানের এই পরিবহন সাম্রাজ্য শুরুতে চালাতেন তার চাচাতো ভাই পাভেলুর রহমান শফিক। একসময় তার সঙ্গে দ্বন্দ্বের পর ছোট ভাই ওবায়দুর রহমান খানকে (কালু) উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বানান এবং তার মাধ্যমে মাদারীপুর নিয়ন্ত্রণ করেন। সর্বশেষ তার নিজ বড় ছেলে আসিব খানকে মাদারীপুরের সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বানান। এ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগে ছিল ব্যাপক ক্ষোভ।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, শাজাহান খানের স্ত্রী সৈয়দা রোকেয়া বেগমের মাধ্যমে তার অবৈধ অর্থের লেনদেন হতো। এ ছাড়া তার আরেক ভাই হাফিজুর রহমান খানও অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন।
শাজাহান খানের উত্থান : শাজাহান খানের উত্থান ১৯৭২ সালে জানুয়ারি মাসে মাদারীপুর জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হওয়ার মধ্য দিয়ে। ওই বছরই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হন। এরপর ১৯৮০ সালে ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক ও ১৯৯৪ সালে কার্যকরী সভাপতি নির্বাচিত হন।
পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের শীর্ষ নেতা হওয়ায় শাজাহান খানের জন্য সড়কে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। পরিবহন শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ হানিফ খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, শাজাহান খানের নির্দেশে পুরো পরিবহন খাত চলত। তার ইশারায় পরিবহন বন্ধ বা চালু থাকত। পরিবহন শ্রমিকদের উন্নয়নে কোনো অবদানই ছিল না তার। প্রতিদিন সড়ক থেকে ৫ কোটির বেশি টাকা তুলত তার ফেডারেশন। কিন্তু সেসব টাকা শ্রমিকদের কোনো কাজেই আসত না। ওই শ্রমিক নেতার অভিযোগ, শাজাহান খান তার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলীকে নিয়ে সারা দেশে পরিবহন খাতকে চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্য বানিয়েছেন।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির আহ্বায়ক সাইফুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাস মালিকদের জিম্মি করে রাখতেন শাজাহান খান। তার জন্য সড়কে চাঁদাবাজি কোনোভাবেই ঠেকানো যেত না। তখনকার বাস মালিক নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে পরিবহন খাতকে নাজেহাল করেছেন তিনি। ফেডারেশনকে তার ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেছেন। পরিবহন খাতে নৈরাজ্যের জন্য দায়ীদের মধ্যে শাজাহান খান অন্যতম বলে জানান সাইফুল আলম।
শ্রমিক ফেডারেশনের এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, দেশেই আছেন শাজাহান খান। ফেডারেশনের খোঁজখবর নিচ্ছেন। তবে আড়ালে আছেন তিনি।
শাজাহান খান পাকিস্তান আমলে ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। এরপর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে হেরে যান। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জিতেছিলেন। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে শাজাহান খান জাসদের প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করলেও হেরে যান। এর ঠিক এক মাস পরই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং উপনির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হয়ে মাদারীপুর-২ আসন থেকে নির্বাচিত হন। এরপরের জাতীয় নির্বাচনগুলোতেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন।
শ্রমিক নেতা ও সিপিবির সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, শাজাহান খানের বাবা আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন। জাসদের যখন খারাপ সময় আসে তখন আবার আওয়ামী লীগে চলে গিয়েছিলেন শাজাহান খান।
তিনি বলেন, ‘ফেডারেশনের শীর্ষ নেতা হওয়ার সুবাদে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতা খন্দকার এনায়েত উল্লাহকে নিয়ে সড়ক থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করেছেন শাজাহান খান। তার ছিল মাস্তান বাহিনী। তাদের বলয়ে তিনি প্রভাব দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা বানিয়েছেন।’
সড়ক পরিবহন আইনের বিরোধিতা : ২০১৮ সালে ঢাকায় বাসচাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সময় সড়ক পরিবহন শ্রমিক নেতা শাজাহান খান বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচিত হন। ওই বছর সাজা কঠোর করে ও জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়। তাকে রেখে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কমিটি করা হয়, যা নিয়ে তখন ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে।
শাজাহান খানের নেতৃত্বে মালিক ঐক্য পরিষদ আইন সংশোধনসহ সাত দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট ডাকে। তাদের বিরোধিতার কারণে আইনটি কার্যকর করতে ১৪ মাস লেগে যায়। চলতি বছর মার্চে আইনের ১২টি ধারায় অপরাধের শাস্তি ও ৮টি ধারায় জরিমানার পরিমাণ কমিয়ে খসড়া সংশোধনীতে সায় দেয় মন্ত্রিসভা।
