যৌথবাহিনীর অভিযান শুরুর ১১ দিনেও চট্টগ্রাম নগরে দাগী কোনো অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়নি। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন নগর পুলিশের বিভিন্ন থানা থেকে লুট করা ৫০০ অস্ত্র ও ১২ হাজার গোলাবারুদও উদ্ধার হয়নি। তবে যৌথবাহিনীর অভিযান শুরুর ২২ দিন আগে ১৩ আগস্ট ৩৫টি অস্ত্র ২৭৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় র্যাব।
এ ব্যাপারে র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মাহবুব আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর যারা মামলার আসামি হয়েছেন, যারা প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি করেছে ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। চট্টগ্রামের বাসিন্দা যেসব মন্ত্রী, এমপি মামলার আসামি হয়েছেন সংশ্লিষ্ট মামলার এজাহারে বর্ণিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এছাড়া দাগী সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারীদের সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া ছাড়া অভিযানে যেতে পারছি না। এজন্য তাদের আইনের আওতায় আনতে একটু দেরি হচ্ছে।’
গত ৫ আগস্টের পর থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন থানা ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৩০-৩৫টি মামলা দায়ের হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে ছাত্র ও পথচারী খুন এবং হাজারের বেশি আহতের ঘটনা এবং থানা-ফাঁড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগে এসব মামলা দায়ের হয়।
এরমধ্যে থানার মামলাগুলোয় বাদী হয়েছেন হতাহতের শিকার পরিবারের সদস্য ও পুলিশ। এসব মামলায় নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে ১ লাখের বেশি মানুষকে। এছাড়া মামলাগুলোয় এজাহারভুক্ত আসামি হয়েছেন সাবেক মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, রেজাউল করিম চৌধুরী, নগরের সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য এম এ লতিফ ও মহিউদ্দিন বাচ্চু, আবদুচ ছালাম।
পাশাপাশি এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে মহানগর যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের অন্তত দুই ডজন নেতাকর্মীকে। এছাড়া মামলায় নগর পুলিশের এক সময়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, সাইফুল আলম লিমন, কাউন্সিলর যথাক্রমে ওয়াসিম উদ্দিন, এহসারুল, নুরুল মোস্তফা টিনু, আবুল হাসনাত বেলাল, শৈবাল দাশ সুমন, লালখানবাজার এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুম, সাবেক কাউন্সিলর আবদুল কাদের ওরফে মাছ কাদের, হাসান মুরাদ বিপ্লব।
এদিকে নগরের চান্দগাঁও ও পাঁচলাইশ থানা পুলিশের করা একাধিক মামলায় সাবেক মন্ত্রী, এমপি এবং মহানগর ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে নিরীহ ছাত্র-জনতা লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণকারী ৮ জন অস্ত্রধারীকে আসামি করা হয়। এরাও নগর যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিভিন্ন পদধারী নেতা।
ওই অস্ত্রধারী ৮ জন হলেন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মহিউদ্দিন মাহমুদ, মোহাম্মদ জালাল ওরফে ড্রিল জালাল, যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ ফরিদ, ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ তাহসিন, যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ জাফর, ও মো. ফিরোজ, এইচ এম মিঠু ও মোহাম্মদ দেলোয়ার। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে তাদের গুলিতে দুজন পথচারী এবং চারজন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। এছাড়া তাদের অস্ত্র প্রদর্শনের একাধিক ভিডিও ফুটেজ ও ছবি ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার ও প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক অপরাধী গা ঢাকা দিয়েছেন। যেসব দুর্বৃত্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করেছে তাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে।’
কিন্তু, গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে যৌথবাহিনীর অভিযান শুরুর ১১ দিনেও এসব অস্ত্রধারীদের একজনও গ্রেপ্তার হয়নি। যৌথবাহিনীর অভিযান শুরুর ১৮ দিন আগে গত ১৭ আগস্ট নগরের বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকা থেকে পতেঙ্গা-বন্দর সংসদীয় আসনের সাবেক এমপি এমএ লতিফ এবং গত ৮ আগস্ট শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান আজিজকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এই দুজন ছাড়া গত ১১ দিনে চট্টগ্রামের বাসিন্দা সাবেক মন্ত্রী, এমপি, মেয়র কিংবা দাগী কোনো সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়নি। এর মধ্যে গত ১২ সেপ্টেম্বর ভোরে কুমিল্লার আখাউড়ায় বিজিবির হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী।
তবে এখনো অধরা রয়ে গেছেন সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, রেজাউল করিম চৌধুরী, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সাবেক এমপি মোস্তাফিজুর রহমান, চট্টগ্রাম-১২ আসনের সাবেক এমপি শামসুল হক চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৮ আসনের সাবেক এমপি আবদুচ সালাম, চট্টগ্রাম-২ আসনের সাবেক এমপি তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সাবেক এমপি আবু রেজা মোহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী।
এছাড়া ধরা ছোঁয়ার বাইরে আছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার নেতৃত্ব দেওয়া কাউন্সিলর ওয়াসিম উদ্দিন, আবুল হাসনাত বেলাল, এহসারুল, নুরুল মোস্তাফা টিনু, শৈবাল দাশ সুমন, জসিম উদ্দিন, নেছার উদ্দিন আহমেদ, সাবেক কাউন্সিলর মো. হোসেন হিরণ, হাসান মুরাদ বিপ্লব এবং এক সময়ে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও সাইফুল আলম লিমন।
