পশ্চিম কেন ইসরায়েলকে ছাড়তে পারে না

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:৪৮ এএম

গাজায় ইসরায়েলের হামলায় এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি। তারপরও পশ্চিমারা কেন থামাচ্ছে না তাদের। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে সেখানকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ইসরায়েল যেভাবে সেখানে হামলা চালাচ্ছে, তাতে নিহতের সংখ্যা কোথায় গিয়ে থামবে তা কেউ বলতে পারছে না। এত প্রাণ হানি, ক্ষয়ক্ষতির পরও কেন পশ্চিমা বিশ্ব ইসরায়েলকে থামাচ্ছে না এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেয়েছেন জনাথন কুক। তিনি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সংঘাতবিষয়ক লেখক এবং সাংবাদিক। সম্প্রতি মিডল ইস্ট আইয়ে তিনি লিখেছেন, পশ্চিমা সরকারগুলো কখনো ইসরায়েলকে বিশ^ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুমোদন দেবে না। তাদের যুদ্ধ চলতেই থাকবে যদি না একে থামানো হয়, অথবা এটি সবাই ধ্বংস করে দেয়। গাজায় এখনো ইসরায়েলি হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চললেও কয়েক মাস ধরে পশ্চিমা প্রথম সারি সংবাদমাধ্যমের নজরের বাইরেই রয়ে গেছে তাদের খবর। অথচ ইসরায়েল পশ্চিমা সাংবাদিকদের আটকে রেখেছে এবং বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি সাংবাদিককে হত্যা করেছে, সে সঙ্গে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা এবং জাতিসংঘকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ইসরায়েলের হামলায় কমপক্ষে ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। কিন্তু আর কত, এ অঙ্ক কি দ্বিগুণ হবে? চারগুণ? ১০ গুণ? সত্য হলো, কেউ জানে না।

তিনি লিখেছেন, গত বছরের অক্টোবরে ফিলিস্তিনিদের খাদ্য, পানি ও বিদ্যুৎবঞ্চিত করেছিল ইসরায়েল। তাদের কারণে গাজায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর করিম খান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার অনুরোধ জানিয়েছেন। এই দীর্ঘায়িত দুর্ভিক্ষে যারা মারা যাচ্ছে, তারা টিভি পর্দায় বা পত্রিকার প্রথম পাতায় আসছে না। আফগানিস্তান, ইরাক এবং লিবিয়ার পর গাজায়ও প্রকৃত মৃতের সংখ্যা সম্ভবত কখনো জানা হবে না। পশ্চিমা রাজনীতিবিদদের সত্য জানার কোনো আগ্রহ নেই, আর পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমেরও তা আবিষ্কারের কোনো আগ্রহ নেই।

জনাথন বলছেন, এর কারণ ঐতিহাসিক ও করপোরেট মুনাফা। শুধু অস্ত্র বিক্রি নয়, গাজা পুনর্গঠন, প্রাকৃতিক সম্পদ, সমুদ্রপথের বাণিজ্য দখলে নিতে চায় করপোরেটরা।

ঐতিহাসিক সম্পর্ক

বিবিসি বাংলা তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, ইসরায়েলের এতটা শক্তির পেছনে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের বড় অবদান আছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তার সবচেয়ে বড় অংশ পেয়ে আসছে ইসরায়েল। আর ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা হলেও, এ অঞ্চলে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের প্রভাব বেশি ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয় ১৯৫৬ সালে দ্বিতীয় আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। লন্ডনের স্কুল অব আফ্রিকান অ্যান্ড ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের আওতাধীন মিডলইস্ট ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক ড. সেইয়েদ আলী আলাভি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ইসরায়েলের জন্মই হয়েছে মূলত পরাশক্তিদের বিশাল সমর্থনে, যেটা ইসরায়েলের ক্ষমতায়নে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া এটাও মনে করা হয় যে, ইহুদিদের সঙ্গে শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক এমন নানা দিক পশ্চিমা চিন্তাধারার সঙ্গে মিলে যেটা আরবদের থেকে ভিন্ন, এ জন্য ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে এক টুকরা পশ্চিমা দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। আর শুধু সামরিক নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও সমানভাবে দক্ষতার দিকে এগিয়েছে। ইসরায়েলের চমক জাগানো সাফল্যগুলোর মধ্য অন্যতম হচ্ছে তাদের কৃষি খাত।

পশ্চিমা গণতন্ত্র

জনাথন কুক মনে করছেন, গাজায় ইসরায়েলি হামলার খবর সক্রিয়ভাবে সমাহিত করা হচ্ছে। কারণ ইসরায়েলের গণহত্যা যদি সবার সামনে চলে আসে, তাহলে এটা প্রমাণ হয়ে যাবে যে, পশ্চিমা দেশগুলো গণতন্ত্র নয় এবং বর্বরতার দুর্গ। পশ্চিমা রাজনীতিবিদরা গণহত্যায় সম্পূর্ণভাবে জড়িত এ সত্য তাদের জনসাধারণের কাছ থেকে লুকানো অসম্ভব। বাইডেন প্রশাসনের ইচ্ছা থাকলে যেকোনো সময় হত্যা বন্ধ করা যেত। তিনি লিখেছেন, পশ্চিমা দেশের জনগণ স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, তারা হত্যাকাণ্ড শেষ করতে চায়। কিন্তু সত্য হলো, পশ্চিমা রাজনীতি এখন জনগণের চাহিদার প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়াহীন। ইসরায়েল সম্পূর্ণরূপে মার্কিন সামরিক, কূটনৈতিক এবং আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। গত অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ৫০ হাজার টন অস্ত্র পাঠিয়েছে ইসরায়েলে। গণতান্ত্রিক জবাবদিহির শেষ নিদর্শনগুলো বহু বছর আগে ধ্বংস হয়ে যায়, কারণ পশ্চিমের রাজনৈতিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করপোরেট সংস্থা দ্বারা সম্পূর্ণরূপে বন্দি আছে। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের অবৈধ আগ্রাসন থামানোর চেষ্টা করতে কয়েক মিলিয়ন মানুষ ইউরোপের রাস্তায় বেরিয়েছিল এবং তখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পশ্চিমের সরকারগুলো। গাজার অবস্থা আরও খারাপ। তারপরও আগের মতোই পশ্চিমা ক্ষমতাসীনরা কেউ জনগণের কথা শুনছে না। যারা ইসরায়েলের গণহত্যার বিরোধিতা করে তাদের অপমান করা হচ্ছে। গাজায় ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে মিছিলকারীর সংখ্যাও কমিয়ে দেখানো হয়েছে। উল্টো তাদের ‘অ্যান্টিসেমেটিক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পশ্চিমা রাষ্ট্র এবং তাদের জোট ন্যাটো জনস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে না। তারা প্রধানত করপোরেট অভিজাতদের সংকীর্ণ স্বার্থের প্রচারের বাহন হয়ে উঠেছে। যার উদ্দেশ্য হলো স্থায়ী যুদ্ধ থেকে লাভ ব্যক্তিগত হাতে তুলে নেওয়া।

হত্যার বিনিময়ে ব্যবসা

কেবল অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং উচ্চ প্রযুক্তি শিল্প, ক্রমবর্ধমান নজরদারি ব্যবসায়ীরাও গাজা এবং ইউক্রেনের হত্যার পেছনে যুক্ত বলে মনে করছেন জনাথন। তিনি জানান, ব্লুমবার্গ গত মাসে রিপোর্ট করেছে যে, গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ২.৩ মিলিয়ন ফিলিস্তিনির বাড়ি ৪২ মিলিয়ন টন ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। এসব ধ্বংসস্তূপ সরাতে যে পরিমাণ ডাম্প ট্রাকের প্রয়োজন হবে তা নিউ ইয়র্ক থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত একটি সারি তৈরি করবে। এসব জঞ্জাল দূর করতে যে বিশাল পরিচ্ছন্নতা অভিযান প্রয়োজন তা থেকে গাজার কোনো মুনাফা অর্জন হবে না। উল্টো মুনাফা হবে পশ্চিমা করপোরেটদের। গাজার শিল্প ও বাণিজ্য খাত ইসরায়েলের বর্তমান ধ্বংসযজ্ঞের আগেও খুব কম বিদ্যমান ছিল। যখন সব শান্ত হয়ে আসবে, তখন পশ্চিমা করপোরেশনগুলো গাজা পুনর্নির্মাণের জন্য দরপত্র জানাবে। অবশ্য ততদিনে কয়জন ফিলিস্তিনি বেঁচে থাকবে তা বলা মুশকিল। ধনী ইসরায়েলি ইহুদিদের বাজার বসবে সেখানে। নতুন শিল্পাঞ্চল ও বন্দরগুলো ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকায় রপ্তানি করতে পারবে সহজে। গাজার উপকূলের ঠিক অদূরে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসের দিকে পশ্চিমা করপোরেশনগুলো গত দুই দশক ধরে নজর রাখছিল।

অস্ত্র বিক্রি

জনাথন লিখছেন, যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার বোঝেন যে, তার টিকে থাকা নির্ভর করে জনসম্পদ দখলের এই করপোরেট অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ওপর। নতুন ব্রিটিশ সরকার পুরনোটির মতো বেসামরিক গণহত্যার জন্য ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কাছে অস্ত্র বিক্রি চালিয়ে যাওয়ার জন্য অজুহাত দেখায়। দেশটির পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড ল্যামি গত ২ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলকে বলেছিলেন, ইসরায়েলি তাদের অস্ত্র যুদ্ধাপরাধে ব্যবহার করছে। সে জন্য তারা মোট অস্ত্র বিক্রির আট শতাংশ স্থগিত করেছেন। তবে ৯২ শতাংশ অস্ত্র গণহত্যায় সক্রিয়ভাবে জড়িতই থাকছে। এরপর রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী কমলা হ্যারিস। যুক্তরাষ্ট্রে মূলধারার বাইরের কেউ নন তিনি। ফলে ইসরায়েলের পক্ষেই তার অবস্থান থাকবে, এটা স্বাভাবিক। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি ভোট হারাতে চান না। অবশ্য ইসরায়েলকে সমর্থন জানানোর কারণে বিভিন্ন দেশে ভোট হারিয়েছেন অনেকে। জনাথন বলেছেন, স্টারমার এবং হ্যারিস উভয়ই এমন আমলাতন্ত্রের প্রতি বিশ^স্ত যারা পশ্চিমের মুনাফালোভী করপোরেট মেশিনের কাছে জিম্মি। যাদের সবচেয়ে ‘প্রিয় পুত্র’ ইসরায়েল। এটি এমন সামরিক রাষ্ট্র, যা পশ্চিমের ঔপনিবেশিক প্রবৃদ্ধি। ইসরায়েল তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে গলায় আটকে থাকা হাড়ের মতো।

গণমাধ্যমে

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের খবর হলো, যারা গণহত্যা চালানোর পক্ষে তারাই ভালো লোক। যারা বিরোধিতা করে তারা ইহুদি বিদ্বেষী এবং সন্ত্রাসবাদের সমর্থক। স্বাধীন সাংবাদিক এবং ফিলিস্তিনি সংহতি কর্মীদের এখন ব্রিটেনে সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর আইনের অধীনে আটকানো এবং ভয় দেখানো হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ইসরায়েলের সমালোচনামূলক পোস্টের রিচ সীমিত করছে। গণহত্যার বিরোধিতাকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। সব মিলিয়ে ইসরায়েলকে রক্ষায় একজোট পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমগুলো। এর কারণও করপোরেটের কাছে তারা জিম্মি। এসব করপোরেট সংস্থা শুধু সংবাদমাধ্যম নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গেও যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা যে কারণে বিক্ষোভ করেছিলেন। তারা দাবি তোলেন ইসরায়েলের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সম্পর্ক ছেদ ঘটাতে। তবে তাদের সেই দাবি পূরণ হয়নি। সংবাদমাধ্যমগুলোও করপোরেট মুক্ত হতে পারেনি। যে কারণে তারা এখনো হামাসকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে হাজির করলেও, ইসরায়েলকে নিয়ে কিছু বলে না। এত সাংবাদিক নিপীড়ন, নির্যাতনের শিকার হলেও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের কিছু যায় আসে না। তবে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলো এ বিষয়ে বেশ সতর্ক। তারাই এখন ইসরায়েলির বর্বরতাকে জানা ও বোঝার একমাত্র উপায় হিসেবে টিকে আছে। পশ্চিম নিজেদের গণতন্ত্রের বাহক হিসেবে বিশ্বে হাজির করলেও, ইসরায়েলের বেলায় চুপ। জনাথন বলতে চেয়েছেন, এর গোড়াটা হলো করপোরেট ব্যবসা। এসব ব্যবসায়ী ইসরায়েলকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বল যেন তারা মুনাফা করতে পারে। আর সেই মুনাফা শুধু অস্ত্র বিক্রি করে নয়, বরং নজরদারি প্রযুক্তি, কৃষি, সমুদ্র ও স্থলপথে বাণিজ্যের সুবিধা নিতে চায়। ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের যে লেনদেনের সম্পর্ক, সেখানে প্রাণের কোনো মর্যাদা নেই। বরং ফিলিস্তিনিদের প্রাণ তাদের মুনাফার উপায়। গাজায় বোমা হামলা হলে করপোরেটদের লাভ। আর প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎস তো থাকছেই। যে কারণে পশ্চিম কখনো গাজায় হামলা বন্ধে ইসরায়েলকে চাপ দিতে পারে না। কারণ পশ্চিমের সরকারগুলোর হাত-পা এসব করপোরেটের দড়িতে বাঁধা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত