বিচারহীন বিচারের ভয়াবহতা

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৫:৩৮ এএম

দেশের প্রচলিত আইনের তোয়াক্কা না করে সংঘবদ্ধ জনতা সন্দেহভাজন বা তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে দোষী বানিয়ে পিটিয়ে হত্যা, ভাঙচুর, আগুন দেওয়া কিংবা নাজেহাল করছে। এমন বিচারবহির্ভূত কর্মকা-কে হাল আমলে ‘মব জাস্টিস’ বলা হচ্ছে। গত দেড় মাসে সারা দেশে এমন অনেক ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে, যা খুবই উদ্বেগজনক।

বর্তমান সময়ে এ প্রবণতা কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে সেটা উঠে এসেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের গত আগস্ট মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। সংস্থাটির আগস্ট মাসের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ‘মব জাস্টিসের’ মাধ্যমে আইন হাতে তুলে নিয়ে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে ২০টি। এতে নিহতের সংখ্যা ২০। গুরুতর আহত হয়েছেন চারজন। এর আগে জুলাই মাসে সারা দেশে গণপিটুনির ঘটনা আছে ছয়টি, নিহত হয়েছিল চারজন। চলতি মাসের এ পর্যন্ত অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত বুধবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে দুজন।

আইন হাতে তুলে নেওয়া এমন সংঘবদ্ধ মানুষদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা কর্মকর্তারা। জবরদস্তি করে তাদের পদত্যাগে বাধ্য করা, মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া, আদালত এলাকায় আসামিদের ওপর হামলা, পর্যটন এলাকায় নারী পর্যটককে হেনস্তার ঘটনা ঘটছে। ভাঙা হয়েছে মাজার ও মন্দির। এর মধ্যে মাত্র দুটি ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় নেওয়া হয়েছে।

এসব ঘটনায় মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার হরণসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মীরা। এ বিষয়ে আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা একটা (মব জাস্টিস) জঘন্য, বেআইনি, সংবিধান পরিপন্থী ও মানবাধিকারবিরোধী কাজ। মধ্যযুগীয় পন্থায় এমন নিষ্ঠুর কর্মকা- কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। এটা কোনো প্রকারেই, কোনো যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য না।’

গত ৮ সেপ্টেম্বর রাজশাহীতে পিটিয়ে হত্যা করা হয় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা পঙ্গু আবদুল্লাহ আল মাসুদকে। আট বছর আগে আরেক হামলায় তিনি একটি পা হারান। তারপর থেকে তিনি প্লাস্টিকের পা লাগিয়ে চলাফেরা করতেন। ঘটনার দিন তিনি ওষুধ কিনতে বের হয়েছিলেন। ৫ আগস্ট ছাত্রদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৩ সেপ্টেস্বর তিনি এক কন্যাসন্তানের জনক হয়েছিলেন।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জে বিএনপির নেতাকর্মীদের গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের ক্রীড়া সম্পাদক শওকত হোসেন দিদার (৪৮) নিহত হয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী, তার স্ত্রী গোপালগঞ্জ জেলা মহিলা দলের সভাপতি রওশন আরা রতœা, তাদের সন্তানসহ বিএনপির কমপক্ষে ২০ নেতাকর্মীকে বেধড়ক মারধর ও কুপিয়ে আহত করেছে হামলাকারীরা। এ ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে দুজনকে আটক করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বাদ যায়নি নারী হেনস্তার মতো ঘটনাও। গত ১৪ সেপ্টেম্বর আলোচনায় আসে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে দুই নারী পর্যটককে হেনস্তার ঘটনাটি। ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একদল উৎসুক জনতা এক নারীকে কান ধরিয়ে উঠবস করাচ্ছে। আর তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কাঠের তক্তা হাতে ফারুকুল ইসলাম নামে এক যুবক। যুবকটি ওই নারীর মুখের সামনে কাঠের তক্তা তুলে নানা ধরনের প্রশ্ন করছিলেন। এ সময় তিনি ধমকের স্বরে বারবার মেয়েটিকে তার মাস্ক খোলার আদেশ দিয়ে বলেন, ‘চিনস নাই আমারে? খুল এইটা!’ যদিও হেনস্তার নেতৃত্ব দেওয়া ফারুকুলকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে খুলনার পুলিশ কার্যালয়ের ভেতরে হেফাজতে থাকা উৎসব ম-ল নামে এক কিশোরকে গণপিটুনি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাকে পুলিশের হেফাজত থেকে কেড়ে নিয়ে শরিয়া আইনের মাধ্যমে বিচার করার দাবি তোলেন কতিপয় তরুণ। সেটা করতে না দেওয়ায় পুলিশ কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে উৎসব ম-লকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর গুরুতর আহত অবস্থায় সেনাবাহিনী তাকে হেফাজতে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।

এ ধরনের ঘটনাগুলো দেশের বর্তমানে কার্যকর সংবিধানের ৩১, ৩৩ ও ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ, আইন অনুযায়ী ব্যবহার লাভ, বিচার লাভ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ লাভ, অপরাধী-নিরপরাধী নির্বিশেষে সবার মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

এ ছাড়া অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের আইনগত দায়িত্ব। আর এ দায়িত্বে বাধা দেওয়ার অধিকার কারও নেই। বরং এমন কোনো ব্যক্তিকে যদি কেউ আটকে রাখে এবং পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়, তাহলে ওই বাধাদানকারী দ-বিধির ১৮৬ ধারা অনুযায়ী অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদ- বা অনূর্ধ্ব ৫০ টাকা জরিমানা বা দুই ধরনের দ-েই দ-িত হতে পারেন। আটক রাখার পর যদি ওই ব্যক্তিকে পিটুনি বা মারধর করা হয় তবে কারাদ-ের মেয়াদ বেড়ে দাঁড়াবে অনূর্ধ্ব ৩ বছর ১ মাস। সঙ্গে অনূর্ধ্ব ৫০০ টাকা জরিমানাও করা হবে। আঘাত যদি গুরুতর হয় তাহলে ৩৩৪ ধারা দ-বিধি অনুযায়ী কারাদ-ের মেয়াদ বাড়বে আরও এক বছর। আর অর্থদ- হবে অনূর্ধ্ব ২ হাজার টাকা। অবশ্য এ ক্ষেত্রে উভয় দ-ই হতে পারে। দ-বিধির ৩৪ ধারা অনুযায়ী, গণপিটুনিতে যদি আটক থাকা ব্যক্তি নিহত হয় তবে তার দায় বর্তাবে অপরাধ সংঘটনকারী সব ব্যক্তির ওপর। কেননা আইনে ‘যৌথ দায়িত্বশীলতা’ বলে একটি নীতি আছে। সেখানে বলা হয়েছে, একই অভিপ্রায় নিয়ে একাধিক ব্যক্তি কোনো অপরাধ সংঘটন করলে, তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তি এমনভাবে দায়ী হবেন, যেন তিনি নিজেই অপরাধটি করেছেন। তাই গণপিটুনিতে কোনো ব্যক্তি মারা গেলে, সবাইকে সমভাবে এজন্য দায়ী করা যাবে।

‘মব জাস্টিসের’ সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন জেড আই খান পান্না। তিনি বলেন, ‘যারা মব জাস্টিসের সঙ্গে যুক্ত এবং এ ধরনের কার্যক্রম যারা পরিচালনা করে, তারা অপরাধী, এদের চূড়ান্ত শাস্তি দেওয়া উচিত। যেহেতু আমি ব্যক্তিগতভাবে মৃত্যুদ-ের পক্ষে নই, কাজেই আমি মৃত্যুদ- চাই না। তবে তাদের চূড়ান্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত।’

১১ জেলায় ৩৭ মাজার ভাঙচুর : গত ৫ আগস্টের পর থেকে এমন ‘মব জাস্টিসের’ বলি হয়েছে দেশের অনেক মাজার। কবি ও সুফি ঘরানার অনুসারী সৈয়দ তারিক ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব মাজার ভাঙচুরের হিসাব রেখেছেন। তার সংরক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, সংঘবদ্ধ জনতার হামলায় ও নেতৃত্বে দেশের ১১ জেলায় ৩৭টি মাজার ভাঙচুর করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ছয়টি মাজার ভাঙা হয়েছে কুমিল্লায়। এ ছাড়া নরসিংদীতে ভাঙা হয়েছে পাঁচটি মাজার। সৈয়দ তারিকের দেওয়া তথ্য যাচাই করে এর সত্যতা পেয়েছে দেশ রূপান্তর।

সংখ্যালঘুদের বাড়ি-উপাসনালয়ে হামলা : গত ৪ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত ১৬ দিনে সংখ্যালঘু লোকজন, তাদের বাড়িঘর, উপসনালয় ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সহিংসতায় ১ হাজার ৭০৫টি পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৭টি পরিবারের বাড়িতে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবারের মধ্যে আদিবাসী পরিবার ৩৫টি। তাদের বাড়িঘর লুটপাট, ভাঙচুর এবং আগুন দেওয়া হয়। কিছু পরিবারের জমি জবরদখল করা হয়। সেইসঙ্গে ৬৯টি উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। হামলায় নিহত হয়েছে ৯ জন।

গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের সদর দপ্তরে এক সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর কাছে ‘মব জাস্টিস’ সম্পর্কে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন। জবাবে তিনি বলেন, ‘একজন অন্যায় করলে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করেন। আইন তো আপনার হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার নেই।’ এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত