একসঙ্গে পাঁচ সন্তানের খরচ জোগাতে দিশেহারা দম্পতি

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫২ এএম

দীর্ঘ ১০ বছরের অপেক্ষার পর একসঙ্গে কোলজুড়ে এসেছিল পাঁচ সন্তান। পরিবারে ছড়িয়ে পড়েছিল আনন্দের বন্যা। তবে সেই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড় ইউনিয়নের মো. ওয়াহিদুল ইসলাম সুমন ও এ্যানি আক্তার দম্পতি। পাঁচ শিশুর ভরণপোষণ ও চিকিৎসার খরচ সামলাতে গিয়ে এখন পুরোপুরি দিশেহারা তারা। ঋণের বোঝা মেটাতে এরই মধ্যে বিক্রি করতে হয়েছে ভিটাও।

সন্তানহীনতার ১০ বছর পর রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজের ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ ডা. ফরিদা ইয়াসমিন সুমির শরণাপন্ন হয়েছিলেন এই দম্পতি। চিকিৎসকের পরামর্শে তারা গ্রহণ করেন ‘ইন্ট্রা-ইউটেরাইন ইনসেমিনেশন’ (আইইউআই) পদ্ধতি। এরপর মাত্র এক মাসের মাথায় আসে কাক্সিক্ষত ফল। আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে প্রথমে চারটি শিশুর কথা জানা গেলেও ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় অলৌকিকভাবে দেখা মেলে পঞ্চম শিশুটির। প্রিম্যাচিউর বা অপরিপক্ব অবস্থায় জন্ম নেওয়া তিন মেয়ে ও দুই ছেলের বাবা-মা হন তারা।

সন্তানদের নাম রাখা হয়েছে ফরিদা ইয়াসমিন সুমি, জান্নাত ওয়াহিদ, আরিশফা ওয়াহিদ, আবরার ফাহাদ ও শরীফ ওসমান হাদী। এর মধ্যে প্রথমজনের নাম রাখা হয় চিকিৎসকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সুমন স্থানীয় একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। সব মিলিয়ে প্রতি মাসে তার আয় ২৫ হাজার টাকা। এই সীমিত আয়ে বয়স্ক বাবা-মা, স্ত্রী ও নতুন আসা পাঁচ সন্তানসহ ৯ সদস্যের সংসারের খরচ চালানো যেন এক অসম্ভব যুদ্ধ।

সুমনের দেওয়া তথ্য মতে, শিশুদের পেছনে প্রতি মাসে শুধু মৌলিক পরিচর্যা ও খাবার বাবদই খরচ হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। এতগুলো সন্তানের জন্ম একসঙ্গে হওয়ায় মা প্রয়োজনীয় বুকের দুধ দিতে পারছেন না। ফলে পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে গুঁড়া দুধ বা কৌটার ফর্মুলার ওপর। শিশুদের প্রতিদিন দেড় থেকে দুটি ফর্মুলার প্রয়োজন হয়, যার প্রতিটির বর্তমান বাজারমূল্য ৯৮০ টাকা। দিনে শুধু দুধের পেছনেই খরচ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার টাকা।

শিশুদের জীবনের শুরু থেকেই লেগে রয়েছে একের পর এক চিকিৎসার ধকল। গত মাসে পাঁচ সন্তান একসঙ্গে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। আট দিন স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা করাতে গিয়ে গুনতে হয়েছে ৮০ হাজার টাকা।

এর আগে জন্মের পরপরই শিশুদের শারীরিক জটিলতা ও অপরিপক্কতার (৩২ সপ্তাহ) কারণে চট্টগ্রাম নগরীর পার্কভিউ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) রাখতে হয়েছিল বেশ কিছুদিন। সেখানে মোট বিল এসেছিল ২২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

হাসপাতালের বিপুল অঙ্কের এ বিল মেটাতে সুমনকে বিক্রি করতে হয়েছে বসতবাড়ির পাশের একটি ভিটা। জমি বিক্রির টাকা দিয়েও হাসপাতালের পুরো খরচ মেটানো সম্ভব হয়নি, ফলে ঘাড়ে চেপেছে বিশাল অঙ্কের ধারের বোঝা।

সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মো. ওয়াহিদুল ইসলাম সুমন বলেন, ‘১০ বছর পর সৃষ্টিকর্তা আমাদের মুখ তুলে চেয়েছেন, এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। কিন্তু এখন প্রতিটি দিন কাটে আতঙ্কে। তাদের মুখে ঠিকমতো খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা তুলে দিতে পারছি না। ধারদেনা করে চলছি। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায় থেকে যদি একটু সহায়তা পেতাম, তবে সন্তানদের অন্তত মানুষ করার স্বপ্নটুকু বাঁচিয়ে রাখতে পারতাম।’

বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিটি শিশুই আমাদের দেশের সম্পদ। আমরা চাই এই পাঁচ শিশুও সুস্থভাবে বেড়ে উঠুক। পরিবারটি আমাদের কাছে আসলে আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সহায়তার ব্যবস্থা করব।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত