একজন কমিশনারকে দপ্তরবিহীন করে পদত্যাগে বাধ্য করা, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠক না করে এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদ ঘন ঘন পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে অদক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন এসইসির নতুন চেয়ারম্যান। প্রথা ভেঙে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। তথ্য গোপন রাখতে এসইসিতে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এসবের মধ্যে দিয়ে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তির এক মাসেই নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ।
গতকাল রবিবার বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে এসইসি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছেন এসইসির চেয়ারম্যান। সাংবাদিক প্রশ্নের মুখে সংবাদ সম্মেলন ছেড়ে দ্রুত চলে যান তিনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন প্রতিবাদের পরও আগের গভর্নরের আমলে নিয়োগ পাওয়া দুজন ডেপুটি গভর্নরকে পদে রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে পুনর্গঠিত এসইসির চেয়ারম্যান কমিশনের সবচেয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ কমিশনার এ টি এম তারিকুজ্জামানের পদত্যাগে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এসইসির কমিশনার এ টি এম তারিকুজ্জামানকে তিন মাসের সময় দিয়ে অব্যাহতি দিলেও কয়েকদিনের মধ্যে তাকে দপ্তরবিহীন করার নির্দেশনা জারি করেন বর্তমান এসইসি চেয়ারম্যান। কমিশনারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে এমন উদ্যোগ তিনি কেন নিয়েছেন সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, কিছু কাজ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কো-অর্ডিনেটর হয়ে করতে হয়। এ বিষয়ে পাবলিকলি কিছু বলার বিষয় নেই। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এ কাজ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মানলে এসইসি কীভাবে স্বাধীন সংস্থা এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের সুস্পষ্ট জবাব না দিয়ে বলেন, আমার একটি মিটিং আছে, সেখানে যেতে হবে। এসইসিতে সাংবাদিকদের প্রবেশে কেন কড়াকড়ি আরোপ করা হলো। জবাবে চেয়ারম্যান বলেন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেম আছে। তাই সিস্টেমে আসতে হবে। সাংবাদিকরা আগের কমিশন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে পরে কথা বলব।
সাংবাদিকদের আরও প্রশ্ন ছিল, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে কীভাবে স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদে নিয়োগ দিলেন, যার কোনো জবাব দেননি তিনি। এসব বিষয়ে সাংবাদিকরা একাধিক প্রশ্ন করতে থাকলে দ্রুত এসইসি ত্যাগ করে বেরিয়ে যান চেয়ারম্যান। অন্যান্য কমিশনারও আর সেখানে থাকেননি।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে এসইসি কমিশনার ফারজানা লালারুখ বলেন, আমরা সার্ভিলেন্স ও গভর্নেন্সের ওপর জোর দিয়েছি। আমরা খুব দুর্বল সার্ভিলেন্স নিয়ে কাজ করছি, যা ২০১২ সালে ইনস্টল করা একটা সফটওয়্যার। এটাকে আমাদের দ্রুত আপডেট করতে কাজ করতে হবে। এটা ইনস্টলমেন্টের পরে আপডেটও হয়নি। এটাকে খুব দ্রুত বিশ্বমানের নেওয়ার জন্য চেষ্টা করছি। এর জন্য বিশ^ব্যাংকের সহায়তা চেয়েছি। তারা টেকনিক্যাল বিষয়গুলোসহ সব বিষয়ে আমাদের সহায়তা দেবে। তিনি আরও বলেন, গভর্নেন্স আমরা আমাদের থেকেই শুরু করতে চাই। নিজেদের জবাবদিহি আমরা সবার আগে নিশ্চিত করব।
জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদ গঠন নিয়ে এই বিতর্কে পড়ে এসইসি। এ বিষয়ে তিনবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে কমিশন। এরপরও নিয়েছে ভুল সিদ্ধান্ত। বিষয়টি নিয়ে বাজারে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। এ ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. নাহিদ হোসেনকে ডিএসইসির পর্ষদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসইসির নতুন চেয়ারম্যানসহ কমিশন সদস্যদের বাজার সম্পর্কে ধারণা না থাকায় বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে বাজারে কমিশনের অদক্ষতা ফুটে উঠছে। এ ছাড়া গত আগস্ট দেশের রাজনৈতিক অবস্থা পরিবর্তন হলে এসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনার পদত্যাগ করেন। এ সময়ে দায়িত্ব পালন করেন দক্ষ কমিশনার ড. তারিকুজ্জামান ও মোহসিন চৌধুরী। ওই সময় সাংবাদিকদের এসইসিতে অবাধ প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু নতুন চেয়ারম্যান এসেই কড়াকড়ি আরোপ করেন। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে দূরত্ব চলছে।
