চমকে দিয়েছে শ্রীলঙ্কা। প্রথম কোনো বামপন্থি নেতাকে তারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছে। তাদের আশা অনূঢ়া দিশানায়েকে আমূল পরিবর্তন আনবেন। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
মার্ক্সবাদী রাজনীতিবিদ অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে শ্রীলঙ্কার নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন। শনিবারের নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় তাকে। এরপর সোমবার সকালে কলম্বোর রাষ্ট্রপতি সচিবালয় ভবনে শপথ নেন দিশানায়েকে। শপথ অনুষ্ঠানে অনূঢ়া বলেন, তিনি শ্রীলঙ্কার সমস্যার জটিলতা বুঝতে পারেন এবং জনগণের আশা উপলব্ধি ও সমস্ত শ্রীলঙ্কার আস্থা অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করবেন। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব। শপথ নেওয়ার পর অনূঢ়া আরও বলেন, আমি একজন জাদুকর নই। তবে আমি সেরা পরামর্শ চাইব এবং আমার সেরাটা করব। এজন্য সবার সহযোগিতা চাই। শ্রীলঙ্কার নির্বাচন কমিশনের হিসাবে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (জেভিপি) পার্টি এবং ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) জোটের ৫৫ বছর বয়সী এ নেতা ৪২ দশমিক ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি পদে জয়ী হয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্রে দুর্নীতি মোকাবিলা এবং পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রতিশ্রুতি নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামেন দিশানায়েকে। ২০২২ সালে অর্থনৈতিক পতনের মধ্যে গণবিক্ষোভে গোতাবায়া রাজাপাকসে পালিয়ে যাওয়ার পর প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হলেন অনূঢ়া। এনপিপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা এবং সংসদ সদস্য হরিণী অমরাসুরিয়া বিবিসিকে বলেন, এটি পরিবর্তনের জন্য হওয়া ভোট। ফলাফল সেটাই হয়েছে যা আমরা প্রচার করেছি, অর্থাৎ বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে একটি আমূল পরিবর্তন।
দুটি সংকট
শ্রীলঙ্কার নিয়ম অনুযায়ী, দিশানায়েকে শিগগিরই সংসদ ভেঙে দিয়ে সংসদ নির্বাচন ডাকবেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার জয় দেশটির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এই অনূঢ়া ২০১৯ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মাত্র তিন শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। আর এবার তিনি ভোটারদের একটি বড় অংশকে বোঝাতে পেরেছেন তার সক্ষমতা ও স্বপ্ন সম্পর্কে। যদিও দিশানায়েকে এবং তার রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগ ছিল জনমনে। ১৯৮০ এর দশকের শেষ দিকে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ তার দলের বিদ্রোহ। ১৯৮৭ সাল থেকে তার দল জেভিপি তৎকালীন শ্রীলঙ্কা সরকারের বিরুদ্ধে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয়, যা ‘সন্ত্রাসের মৌসুম’ হিসেবে পরিচিত। তবে দিশানায়েকে ১৯৯৭ সালে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত হন এবং ২০০৮ সালে এর নেতা হন। তার পর থেকে দলের সহিংসতার জন্য ক্ষমা চেয়ে আসছেন তিনি। এখন নির্বাচনে তার বিজয় প্রশ্ন তুলেছে যে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে জেভিপি কী ভূমিকা পালন করতে পারে। কলম্বোয় সেন্টার ফর পলিসি অল্টারনেটিভস (সিপিএ)-এর সিনিয়র গবেষক ভাবানি ফনসেকা বলেন, জেভিপির সহিংসতার ইতিহাস রয়েছে এবং নতুন সরকারে এ দলের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আমি মনে করি দিশানায়েকে জনসাধারণের সামনে প্রচারের সময় র্যাডিকেল অংশকে সরিয়ে রেখেছেন। আমার প্রশ্ন হলো, জেভিপির পুরনো নেতাদের কী হবে? নতুন সরকারে তারা কোথায় অবস্থান করবেন? দিশানায়েকের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হবে তার দেশের তামিল সংখ্যালঘুদের কাছে পৌঁছানো। যারা মে ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে উত্তর ও পূর্বে ক্ষমতা সমাধান চাচ্ছে। ১৯৮৩ সালে তামিল টাইগার বিদ্রোহীদের এবং শ্রীলঙ্কা সরকারের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। দ্বীপদেশটির উত্তর ও পূর্বে একটি স্বাধীন অঞ্চলের জন্য লড়াই করে তামিল টাইগাররা শেষ পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণে বিশাল এলাকা নিয়ে নেয়। কিন্তু ২০০৯ সালে সামরিক অভিযানে তারা পরাজিত হয় এবং সবই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এরপর গত পনের বছরে তামিল সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক কর্র্তৃত্ব হস্তান্তরে শ্রীলঙ্কা সরকারের প্রতিশ্রুতি অনেকাংশে বাস্তবায়িত হয়নি। যদিও উত্তর ও পূর্বে অনূঢ়ার জোট এনপিপির ভোট বেড়েছে। তামিলরা তাদের রাজনৈতিক দাবির প্রতি এনপিপির নীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা কমই ভোট দিয়েছে অনূঢ়াকে। আবার এদিকে জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনারের কার্যালয় শ্রীলঙ্কাকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে। শ্রীলঙ্কার নতুন সরকারকে গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে এবং রাজনৈতিক কর্র্তৃত্বের জবাবদিহির জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করা উচিত বলে জানিয়েছে।
ধ্বংস থেকে শুরু
শ্রীলঙ্কা অনূঢ়াকে নির্বাচিত করলেও তার দলের রয়েছে একটি ভয়ংকর ইতিহাস। সেই ইতিহাস ভুলিয়ে জনগণের মন জয় করেছেন তিনি। তার দল এক সময় যাদের শত্রুজ্ঞান করেছিল, তাদের সঙ্গে তিনি বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে ১৭৭ কিলোমিটার দূরে আনুরাধাপুরা জেলার থামবুটেগামা গ্রামে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন অনূঢ়া দিশানায়েকে। তিনি কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তিনি স্কুলজীবন থেকে তার দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ২০০০ সালে প্রথম সংসদ সদস্য হন। অনূঢ়াকে ২০১৪ সালে জেভিপি নেতা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার পর থেকে তিনি দলের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিবিড়ভাবে কাজ করে চলেছেন। তার দল ১৯৭১ সালে এবং তারপর ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে, ব্যর্থ মার্ক্সবাদী বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিল। আবার ১৯৮৮-৮৯ সালে জেভিপি প্রেসিডেন্ট জেআর জয়াবর্ধনে এবং আর প্রেমাদাসার সাম্রাজ্যবাদী এবং পুঁজিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে তাদের উৎখাতের আহ্বান জানায়। যা শ্রীলঙ্কার ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ হিসেবে বিবেচিত। ওই সময় ব্যাপক আকারে হত্যাকাণ্ড চলে। কারফিউ, নাশকতা এবং ধর্মঘট ডাকে জেভিপি। মার্ক্সবাদীরা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে বলে মনে করা হয়, যাদের মধ্যে বুদ্ধিজীবী, শিল্পী এবং ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সরকার গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন, অপহরণ ও গণহত্যার মাধ্যমে বিদ্রোহকে নির্মমভাবে দমন করে। সরকারি ক্র্যাকডাউনে কমপক্ষে ৬০ হাজার মানুষ নিহত হয়, যার বেশিরভাগ জেভিপি নেতা ছিলেন। ব্যর্থ বিদ্রোহের পর যখন পার্টি সহিংসতা পরিত্যাগ করে এবং নির্বাচনী গণতন্ত্রের দিকে ঝুঁকতে থাকে তখন দিশানায়েকে পলিটব্যুরোতে নিযুক্ত হন। ২০১৪ সালের মে মাসে বিবিসির সঙ্গে আলাপচারিতায় অনূঢ়া দিশানায়েকে পার্টির অতীত অপরাধের জন্য ক্ষমা চান। এর পর থেকে তিনি বেশ কয়েকবার দুঃখ প্রকাশ করেছেন দলের অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য। অপরদিকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিক্রমাসিংহে ১৯৮০-এর দশকে জেভিপি বিদ্রোহের সময় প্রেমাদাসা সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ রয়েছে, তিনি তখনকার ক্র্যাকডাউনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। অনেক বয়স্ক শ্রীলঙ্কানের মনেও জেভিপির ওই রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহের ঘটনা মনে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অনূঢ়া দিশানায়েকে বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ এবং সামরিক কর্মকর্তাসহ সমাজের এমন অংশকে নিয়ে একটি বিস্তৃত জোট গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন, যারা ওই বিদ্রোহের সময় জেভিপির প্রতিপক্ষ ছিল। এখন তাদের সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন নেতারাও রয়েছেন। আর দলের সবচেয়ে বড় পরিচিতি দুর্নীতি মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি। ভিয়ানগোদা বলেন, আমি মনে করি জেভিপি ৮৯-৯০ সালে যা করেছিল, তার জন্য এখন নিন্দা করা ভুল। কারণ আমরা আজ যা দেখছি, তা ১৯৮০-এর দশকের জেভিপি নয়।
শ্রীলঙ্কার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি দুটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) এবং শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির (এসএলএফপি) নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। এই প্রথা অনূঢ়াকে ভেঙে দিতে হবে। অনূঢ়া দিশানায়েকে আশা করছেন, ২১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে জয়ী হবেন।
চীন ও ভারত
তবে শুধু দেশীয় প্রতিপক্ষ নয়। শ্রীলঙ্কার দুশ্চিন্তার কারণ প্রতিবেশীরাও। অনূঢ়া দিশানায়েকের উত্থান ভারত এবং চীন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিবিসি জানাচ্ছে, এ দুটি দেশ শ্রীলঙ্কায় প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। উভয়েই কলম্বোকে বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। অনূঢ়াকে তার মার্ক্সবাদী ঝোঁকের কারণে মতাদর্শগতভাবে চীনের কাছাকাছি ভাবা হয়। অতীতে তার দল জেভিপি শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ভারতীয় নীতির সমালোচনা করেছিল। তারা শ্রীলঙ্কায় দেশটির হস্তক্ষেপকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ বলে বিরোধিতা করেছিল। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারাভিযানের বক্তৃতায় দিশানায়েকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ বলে যাকে মনে করা হয় সেই ব্যবসায়ী টাইকুন গৌতম আদানির অর্থায়নে শ্রীলঙ্কার উত্তরে বায়ুবিদ্যুতের একটি প্রকল্প বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আদানি প্রকল্পের ব্যয় হ্রাস করা উচিত। স্পষ্টতই এটি দুর্নীতিগ্রস্ত চুক্তি, এবং আমরা অবশ্যই এটি বাতিল করব। এ থেকে বুঝা যায়, দিশানায়েকে চীনের দিকেই ঝুঁকে আছেন। তবে সবার প্রত্যাশা তার সফল হওয়া নিয়ে। বিবিসিকে কলম্বোর বাসিন্দা সিসিরা পদ্মসিরি বলেন, যে-ই ক্ষমতায় আসুক খাদ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম কমাতে হবে। মজুরি বাড়ানো দরকার। নতুন রাষ্ট্রপতির উচিত জনগণকে অবিলম্বে স্বস্তি দেওয়া। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, শ্রীলঙ্কাকে বাইরের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং ঋণের বাধ্যবাধকতা মেটাতে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দায়িত্ব নেওয়ার পরে, দিশানায়েকে বুঝতে পারবেন তিনি কতটা বাস্তবসম্মতভাবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন।
অর্থনীতিতে দিশানায়েকে কী করবেন তা সময়ই বলে দেবে। তিনি আইএমএফের ঋণের বিরোধিতা করলেও, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তা কতটা করতে পারবেন সেই প্রশ্ন রয়েছে। অবশ্য পুরোপুরি আইএমএফকে খারিজ তিনি হয়তো করবেন না বলে অনুমান বিশেষজ্ঞদের। তারা মনে করছেন, দিশানায়েকে ব্যবসায়ীবান্ধব হবেন। তিনি সনাতন পদ্ধতির মার্ক্সবাদী নন যিনি বিশ্ব থেকে শ্রীলঙ্কাকে আলাদা করে রাখবেন। তিনি যেহেতু ইতিমধ্যে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন, তার পক্ষে সম্ভব শ্রীলঙ্কার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা।
