দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে সংসার দিনমজুর জহিরের। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দিনমজুরি ছেড়ে শুরু করেন সেদ্ধ মটরশুঁটি বিক্রি। বছর দুই আগে সে কাজটি করতেও অক্ষম হয়ে পড়েন তিনি। সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে বড় ছেলে সায়েমের কাঁধে। সে সময় পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র সায়েমের বয়স মাত্র ১১। তবে অসুস্থ বাবার ওষুধ, মা, ছোটভাইয়ের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে পড়াশোনা ছেড়ে যোগ দেন বাবার ব্যবসায়। দুই বছর ধরে শিশু সায়েমের আয়েই চলছে চার সদস্যের এই পরিবার।
শিশু মেহেদী হাসান সায়েম কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার আড্ডা গ্রামের জহির মিয়ার ছেলে। এখন পার্শ্ববর্তী বেওলাইন গ্রামে বসবাস করেন তারা।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সায়েমের বাবা জহির একজন দিনমজুর ছিলেন। ২০১৪ সালে হঠাৎ ব্রেনে সমস্যা দেখা দেয় তার। তারপর থেকে এই অসুস্থতা বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। আগের মতো দিনমজুরের কাজ করতে না পেরে শুরু করেন সেদ্ধ মটরশুঁটি বিক্রি। নানা মসলা মিশিয়ে মুখরোচক এই খাবার আশেপাশের এলাকায় বিক্রি করতে তিনি। দুই বছর আগে সে সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। বাধ্য হয়েই ছেলে সায়েমকে নিয়ে আসেন ব্যবসায়।
সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বেওলাইন এলাকায় সায়েমের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তর প্রতিনিধির। সায়েম জানায়, অসুস্থ বাবা, ছোট ভাই আর মাকে নিয়ে সংসার চলছিল না তাদের। পঞ্চম শ্রেণি পাশের পর অর্থকষ্টে আর স্কুলে ভর্তি হননি। বাবার ব্যবসা নিজের কাঁধে নিয়ে শুরু করেন জীবনসংগ্রাম। এখন তাঁর আয়েই চলছে চার সদস্যের পরিবার।
সায়েম জানায়, বাবাকে সাথে নিয়েই ব্যবসা চালায়। সে বেচাকেনা করে আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে অসুস্থ বাবা। সারাদিনে ৮০০-৯০০ টাকার মটরশুঁটি বিক্রি করতে পারেন তাঁরা। তাতে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা লাভ হয়। এই টাকা বাবার ওষুধ, সংসারের চাল-ডাল কিনতেই শেষ হয়ে যায়।
সামনে দিয়ে যখন বন্ধুরা স্কুলে যায় তখন খুব কষ্ট হয় সায়েমের। তিনি বলেন, আমিও পড়তে চাই, মানুষের মতো মানুষ হতে চাই। সামনে দিয়ে যখন বন্ধুরা স্কুলে যায় আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। খুব ইচ্ছা করে ওদের সাথে স্কুলে যেতে। কিন্তু ব্যবসা ছেড়ে স্কুলে গেলে বাবার ওষুধ কিনব কীভাবে, সংসারই বা চলবে কীভাবে?
সায়েমের বাবা জহির মিয়া বলেন, খুব কষ্ট হয় ভাই। ব্রেনের সমস্যা। সবসময় আমার ওষুধ খেতে হয়। সময়মতো ওষুধ না খেলে অসুস্থ হয়ে যাই। দুইটা ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে খুবই কষ্টে আছি। চোখের সামনে ছেলেটার জীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তা দেখেও কিছুই করতে পারছি না। সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা এখন পর্যন্ত জোটেনি। ছেলেটার স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ আছে। কিন্তু সে স্কুলে চলে গেলে সংসারটা থেমে যাবে, না খেয়ে মরব আমরা। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এসে নিজের ওষুধ আর ছেলেটার পড়ালেখা করার সুযোগ করে দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
