বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন

খোকনের ঠোঁট, মাড়ি, তালু, নাক নেই আছে শুধু গর্ত

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৪, ০৯:০৫ পিএম

'মুখ, ঠোঁট, মাড়ি, তালু, নাক কিছুই আমার নেই আছে শুধু গর্ত। মুখ দিয়ে খেতে পারি না, নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে পারি না, নেব কেমনে নাক-মুখই তো নেই। নলের সাহায্যে খাবার খাই, নিঃশ্বাস নেই। মানুষ আমাকে দেখলে ভয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। মানুষ আমাকে দেখতে আসে কিন্তু ভয়ে তাকাতে পারে না, সাংবাদিকরা নিউজ করতে আসে, ভয়ে ভয়ে আমার দিকে তাকায় কেউ কেউ চোখ ফিরিয়ে নেয়। আমার জীবন এখন আর জীবন নয় এ যেন মরণ যন্ত্রণা'— বুধবার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদককে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন কোটা আন্দোলনে আহত খোকন চন্দ্র বর্মণ (২৩)।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সরকার পতনের এক দফা দাবিতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি চলাকালে গত ৫ আগস্ট দুপুরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে পুলিশের গুলিতে মারাত্মক আহত হন খোকন।

খোকন চন্দ্র বলেন, সরকারের লোকজন আসে, ছাত্ররাও আসে সবাই কেবল আশ্বাস দেয়। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বললেন আমাকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠাবেন। কিন্তু এখনও কেউ তা করছে না। এভাবে এই মরণযন্ত্রণা নিয়ে কতদিন বেঁচে থাকতে হবে জানি না।

খোকন চন্দ্র বর্তমানে বার্ন ইনস্টিটিউটের ৭০১ নম্বর ওয়ার্ডের ৮ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন আছেন। হাসপাতালে খোকনের দিকে তাকালে ডান চোখ ছাড়া মুখের আর কোনো অবয়ব স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল না। তার ঠোঁট, মুখ, দাঁত, নাক কোনোকিছুই নেই, সেসবের বদলে কেবলে একটা গর্ত মনে হচ্ছিল।

এদিকে খোকন চন্দ্র বর্মণকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর চিন্তা করছে সরকার। ইতোমধ্যে  বাংলাদেশে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আলেকসান্দার মান্টিটস্কি তার চিকিৎসার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়েছেন।  স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খোকনের চিকিৎসার বিষয়ে রাশিয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে। গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সঙ্গে বৈঠককালে এ বিষয়ে রুশ রাষ্ট্রদূত ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার মুখ প্রায় বিকৃত হয়ে গেছে। উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে তার মুখ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তার যে ধরনের সার্জারী প্রয়োজন তা বাংলাদেশে নেই। এ ধরনের চিকিৎসার জন্য জন্য জাপান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো দেশ ভাল।

এক প্রশ্নের জবাবে খোকন জানান, তিনি আয়নার দিকে তাকাতে ভয় পান। তিনি বারবার কল্পনা করতে চেষ্টা করেন, তার কিছুই হয়নি, এটা একটা দুঃস্বপ্ন। ঘুম ভাঙলেই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে আর দুঃস্বপ্ন কেটে যাবে। কিন্তু বাস্তবে সেসবের কিছুই হয়না। আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের মুখ দেখে নিজেই আঁতকে ওঠেন।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আগস্ট পেরিয়ে সেপ্টেম্বর শেষ হয়ে অক্টোবরের মাঝামাঝি অথচ আমাকে কেবল বিদেশ নেওয়ার আশ্বাসই দেওয়া হচ্ছে। আমার অপেক্ষা করতে কষ্ট হয়। কেন যে সরকার এত সময় নিচ্ছে আমি জানি না। সরকার কি আমাকে  সত্যি বিদেশ নেবে? ছাত্ররাও আমার বিষয়ে এখন আর কিছু বলে না! আমার মতো যারা হাসপাতালে কষ্টে মরছি তাদের নিয়ে কারও মাথাব্যাথা নেই। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত