বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ নেই। আর তা না থাকায় দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও (এফডিআই) অনেক কম। ব্যবসার পরিবেশ না থাকার পাশাপাশি শুল্ক, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সময়ক্ষেপণ, জ্বালানি সংকট ও ঋণপ্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতাসহ নানা কারণে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় বাংলাদেশে অনেক বেড়ে গেছে।
গত মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে থাকে। প্রবৃদ্ধিতে বড় অবদান রেখেও সবচেয়ে অবহেলিত অপ্রচলিত খাতগুলো। এসব অনানুষ্ঠানিক খাত অর্থনীতিতে আধিপত্য বজায় রেখেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো মোট কর্মসংস্থানের ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ সৃষ্টি করেছে। এর বিপরীতে নানা সংকটে বড় শিল্পে কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়েছে। রেডিমেড গার্মেন্টস কারখানাগুলো দেশের মোট প্রাতিষ্ঠানিক রাজস্ব আয়ের প্রায় অর্ধেক তৈরি করে। কিন্তু এসব তৈরি পোশাক কারখানাগুলো প্রতি ১২টি আনুষ্ঠানিক বেসরকারি খাতের চাকরির মধ্যে মাত্র ১টি প্রদান করে।
এছাড়া বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কম বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এর কারণ হিসেবে সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের উল্লেখযোগ্য ত্রুটি রয়েছে। এ ত্রুটিগুলোর মধ্যে অর্থ ও জ্বালানিপ্রাপ্তির চ্যালেঞ্জ, ব্যবসা করার উচ্চখরচ উল্লেখযোগ্য। ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা খরচের বেশিরভাগ ব্যয় করেন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করা এবং বাণিজ্য ও শুল্ক প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা নেওয়ার সময়।
উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির জন্য চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত শ্রমের জোগান রয়েছে বলে মনে করে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঋণদাতা সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, মোট বেকারের একটি অংশ যুব বেকার। শিক্ষিত বেকার যুবকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২৭ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যেটি ২০১৩ সালে ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। অনেক যুবক তাদের দক্ষতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকার পরও সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি খোঁজার জন্য লড়াই করছেন। স্নাতকদের দক্ষতা এবং নিয়োগকর্তাদের চাওয়া দক্ষতা ও জ্ঞানের মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যেখানে অনেক দেশ উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ তৈরিতে নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের তরুণদের সুযোগ ও দিকনির্দেশনার অভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। জামানতের অভাবে অর্থায়নের পর্যাপ্ত সুযোগ না পাওয়া এবং ব্যাংকগুলো লিঙ্গ বৈষম্য করায় নারী উদ্যোক্তারাও অগ্রসর হতে পারছেন না।
অন্যদিকে, বেশ কিছু গবেষণার বরাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে স্নাতকদের দক্ষতা ও চাকরির বাজারে চাহিদা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বেকারত্ব বাড়ে। তুলনামূলক কম বয়সী, এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশের সামগ্রিক বেকারত্বের হার কমা সত্তে¡ও, প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তরুণ বয়সী নারী বেকার রয়ে গেছেন। উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর উপযুক্ত চাকরি পেতে নারীদের তুলনামূলক বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এখনো নারীদের বেতন বৈষম্য ও নিয়োগের সময় বৈষম্যের শিকার হতে হয় বলে প্রতিবেদনে বলেছে বিশ্বব্যাংক।
ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের কার্যালয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় বাংলাদেশ ও ভুটানে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুলায়ে সেক বলেন, তরুণরা, বিশেষ করে যারা শহরাঞ্চলে থাকেন তাদের চাকরি পেতে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়।
তিনি আরও বলেন, কর্মসংস্থানের বেশিরভাগ সুযোগ তৈরি হয়েছে কৃষি খাতে। এই খাতে বড় একটি অংশের নিয়োগ হয় অনানুষ্ঠানিকভাবে এবং বেতনও কম। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশের বেশিরভাগ কৃষি খামার আকারে ছোট এবং প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ১ শতাংশ হলেও এই খাতে কর্মসংস্থান ৯ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।
সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশে করোনা মহামারী পরবর্তী সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি, আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়া, বিশেষ করে নারী ও শিক্ষিত তরুণদের জন্য চাকরির সুযোগ সীমিত হয়েছে।
বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ নানা অভিঘাত সামষ্টিক অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৫ দশমিক ২ শতাংশে। দুর্বল ভোগব্যয় ও রপ্তানি কমে যাওয়ায় চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
