সরকার নির্ধারিত প্রতি পিস ডিম ১১ টাকা ৮৭ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে না কোথাও। তবে গত কয়েকদিন ডিমের বাজারে যে অস্থিরতা ছিল তা কিছুটা থেমেছে। খুচরায় খুব বেশি প্রভাব না পড়লেও গতকাল বুধবার পাইকারিতে ডিমের দাম ডজনপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা করে কমেছে। গেল সপ্তাহের তুলনায় দাম কমেছে কাঁচা মরিচেরও। ৬০০ টাকা ছোঁয়া কাঁচা মরিচ গতকাল ৩০০-৩২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। রাজধানীর বাজারে পেঁয়াজের দামে কোনো পরিবর্তন না হলেও শিগগিরই এ পণ্যটির দাম কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্দর এলাকায় পাইকারিতে পণ্যটির দাম গতকাল কেজিপ্রতি ১৫ টাকার বেশি কমেছে। আলোচ্য তিন পণ্যে আপাতত স্বস্তির আভাস মিললেও আগের মতো বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে সবজি, মাছ, মাংস ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় মুদি পণ্যের দাম।
গতকাল রাজধানীর কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম ১০ থেকে ২০ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা দরে। যদিও পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে বিক্রি হয়েছে ১৭০-১৮০ টাকা দরে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুসারে, গতকাল বাজারে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হয়েছে ১৬২-১৭৪ টাকা দরে (হালি ৫৪-৫৮ টাকা)।
ডিমের পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উৎপাদক পর্যায় থেকে একাধিক হাত ঘুরে আড়তে ডিম আসে এবং তাদের কাছে আসার আগেই ডিমের দাম বেড়ে যায়। এ কারণে গত কিছুদিন তারা সরকার নির্ধারিত দামে ডিম কেনা কিংবা বিক্রি কোনোটিই করতে পারছেন না। উল্টো কেনা দামের ভিত্তিতে ডিম বিক্রি করতে গিয়ে জরিমানার মুখে পড়েছেন তারা। এ কারণে তারা দুই দিন ডিম বিক্রি বন্ধ রাখেন।
গতকাল আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, বিভিন্ন অজুহাতে গতকালও বন্ধ ছিল ডিমের পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত পাহাড়তলী বাজারের অধিকাংশ দোকান। কিছু কিছু দোকান ডিম বিক্রি করেছে তাও বাড়তি দামে। অন্যদিকে সোমবার ও মঙ্গলবার ভোক্তা অধিদপ্তরের লোকজনকে ডিমের বাজার তদারকিতে দেখা গেলেও বুধবার হঠাৎ করে তারা চুপসে গেছেন।
ডিমের বাজারের অস্থিরতা কাটাতে সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া দামে বুধবার থেকে চট্টগ্রামে ডিম বিক্রি করবেন বলে জেলা প্রশাসনকে কথা দিয়েছিলেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। কিন্তু বুধবার পাহাড়তলী বাজারে গিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।
আড়ত থেকে ডিম কিনতে যাওয়া দেওয়ানহাটের খুচরা দোকানদার আবদুল হাকিম বলেন, শুনেছিলাম সরকারের ঠিক করে দেওয়া দামে ডিম বিক্রি হবে, তাই এসেছিলাম। এসে দেখলাম, একশ ডিম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। এই দামে কিনলে তো স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের বেশি দামে বিক্রি করতে হবে।
ডিমের মতো নতুন আমদানিকৃত পেঁয়াজের দামও পাইকারিতে কেজিপ্রতি ১৬ টাকা কমেছে। যদিও রাজধানীর বাজারগুলোতে এখনই এর কোনো প্রভাব পড়েনি। গতকালও প্রতি কেজি পেঁয়াজ ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে নতুন পেঁয়াজ রাজধানীতে পৌঁছালে আগামী দুই একদিনের মধ্যে মসলাজাত এই পণ্যের দাম কমবে বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল আমাদের হাকিমপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, হিলি বন্দর দিয়ে গতকাল ৩৮টি ট্রাকে ১১ হাজার ৭৭ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এতে পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়ায় প্রতি কেজি পেঁয়াজে অন্তত ১৬ টাকা কমেছে। আমদানিকৃত পেঁয়াজগুলো ইন্দোর ও সাউথ পেঁয়াজ। সপ্তাহ পূর্বে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৯৬ টাকায় বিক্রি হলেও আমদানির পর দাম কমে তা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা করে।
এদিকে রাজধানীর কাঁচা বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে কাঁচা মরিচের দাম অর্ধেকে নেমেছে। পণ্যটির দাম কেজিতে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা কমেছে। অবশ্য বাজার ভেদে গতকাল পণ্যটি ২৮০ থেকে ৩২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
তবে, কাঁচা মরিচ ছাড়া মাছ, চাল, আলু ও সবজিসহ অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দামে এখনো স্বস্তি ফেরেনি। চড়া দামে সব ধরনের সবজি বিক্রি হচ্ছে। গতকালও খুচরায় প্রতি কেজি ঢেঁড়স ১০০ টাকা, গোল বেগুন ২০০-২২০ টাকা, লম্বা বেগুন ১৩০-১৪০ টাকা, করলা ১২০ টাকা, ঝিঙে-ধুন্দল ১২০ টাকা, বরবটি ১৪০ টাকা এবং শসা বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকা কেজি দরে। যদিও পাইকারি বাজারে এসব সবজির দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
কারওয়ান বাজার ক্ষুদ্র আড়তদার সমিতির সভাপতি এ টি এম ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজারে এখন যেসব সবজির দাম চড়া তার অধিকাংশের এখন সিজন নেই। তাছাড়া কিছুদিন আগেই টানা বন্যা গেল। এতে অনেক ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া কৃষকের পর আড়তদারদের হাতে সবজি আসার আগ পর্যন্ত আরও তিন হাত ঘুরে। মূলত তাদের হাতেই সবজির দাম বেড়ে যায়। তবে আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সবজির সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ে অনেক ব্যবসায়ীকে বন্যার অজুহাত দিতে দেখা যায়। তার বলছেন, বন্যার জন্য অনেক জেলা তলিয়ে গেছে এবং সেখানে ফসলের বড় ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু ঢাকার বাজারে আসা সবজিগুলো যেসব জেলায় উৎপাদন হচ্ছে, সেখানে এবার কোনো বন্যা হয়নি। অতি মুনাফা করার জন্য ব্যবসায়ীরা কেবল অজুহাত দিচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের এটাই স্বভাব।
