বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অন্তর্র্বর্তী সরকার ‘জাতির পিতা’ মনে করে না বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক ফাউন্ডিং ফাদারস রয়েছে। তাদের লড়াইয়ের ফলে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।’
অন্তর্বর্তী সরকার আটটি জাতীয় দিবস বাতিল করার সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণার পর গতকাল বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ দল হিসেবে ফ্যাসিস্টভাবে ক্ষমতায় ছিল। মানুষের ভোটাধিকার হরণ ও গুম-খুন করে এবং গণহত্যা করে তারা ক্ষমতায় ছিল। কাজেই তারা কাকে জাতির পিতা বলল, তারা কোন দিবসকে জাতীয় দিবস ঘোষণা করল, নতুন বাংলাদেশে সেটার ধারাবাহিকতা থাকবে না।’
গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্র্বর্তী প্রশাসন বাংলাদেশকে ‘নতুনভাবে গড়তে যাচ্ছে’ মন্তব্য করে নাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইতিহাসের প্রতি আমাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনতে হবে।’
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘যেসব জাতীয় দিবস বাতিল করা হচ্ছে, সেগুলো চাপিয়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ফ্যাসিস্ট আচরণ ছিল সেটা। সরকার মনে করেছে সেগুলো গুরুত্বহীন, তাই বাতিল করা হচ্ছে।’
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এক ফেসবুক পোস্টে এদিন সকালে আটটি জাতীয় দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়, যার মধ্যে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসও রয়েছে।
সাংবাদিকরা দুপুরে ওই সিদ্ধান্তের বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি আওয়ামী লীগের করা সবকিছু মনে করেন জাতীয়...। ভোটবিহীন সরকারেরই কোনো বৈধতা নেই। সেই সময়ে অনেক কিছু করা হয়েছে। সবগুলোকে পুনর্গঠন ও পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।’
একজন সাংবাদিক এ সময় বলেন, সব দেশেরই জাতির পিতা থাকে। বর্তমান সরকার কি তাহলে বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশেরও জাতির পিতা হিসেবে মানে না?
জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘অবশ্যই না। সেটা কেন মনে করতে হবে?’ এ সময় তিনি আরও বলেন, আমেরিকাসহ অনেক দেশেই জাতির পিতা নেই।
তাহলে বাংলাদেশে কোনো জাতির পিতা থাকবে না? এমন প্রশ্নে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের এই ভূখণ্ডের লড়াইয়ের ইতিহাসে বহু মানুষের অবদান রয়েছে। আমাদের ইতিহাস কিন্তু ৫২-তেই শুরু হয়নি, আমাদের ব্রিটিশবিরোধী লড়াই আছে, ৪৭ ও ৭১-এর লড়াই আছে, ৯০ ও ২৪ আছে। আমাদের অনেক ফাউন্ডিং ফাদারস রয়েছে। তাদের লড়াইয়ের ফলে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, আবুল কাশেম, সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশেম, যোগেন ম-ল, মওলানা ভাসানী এমন বহু মানুষের লড়াইয়ের ফলে আমরা ভূখ- পেয়েছি, স্বাধীনতা পেয়েছি। এখানে শুধু একজনের অবদান নয়। সুতরাং জাতির জনকের বিষয়টি শুধু একটা দল বা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চাই না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ইতিহাসের যে বহুমুখিতা রয়েছে, তা আওয়ামী লীগ এত দিন অস্বীকার করছে। মওলানা ভাসানীর অবদানকে সব সময়ই অস্বীকার করছে তারা। অথচ এই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। তাকে তো ইতিহাস থেকে মোছা যাবে না। আমাদের সেই ইতিহাসগুলো আনতে হবে।’
ঐতিহাসিক ৭ মার্চকে জাতীয় দিবস হিসেবে বাতিল করার বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘৭ মার্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস, গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা সেদিন হয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করছি না যে সেটি জাতীয় দিবস হওয়ার মতো গুরুত্ব বহন করে। অনেক কিছু হয়তো আমাদের ইতিহাসের অংশ। কিন্তু আওয়ামী লীগ আসলে ইতিহাসকে নষ্ট করে ফেলেছে। ফলে অনেক কিছু এই মুহূর্তে নেওয়া যাচ্ছে না, যে রকম ৭ মার্চ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তো ৭ মার্চকে ইতিহাস থেকে নাই করে দিচ্ছি না। শেখ মুজিবুর রহমানের গুরুত্বকে ইতিহাস থেকে নাই করে দিচ্ছি না। যেটা ইতিহাসের অংশ, নির্মোহভাবে ইতিহাস নতুন করে লেখা হবে, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে। কিন্তু সেটিকে দিবস হিসেবে যে চর্চা, এটির একটি রাজনীতি আছে। গণ-অভ্যুত্থানের সরকার সেই রাজনীতি চলতে দিতে পারে না।’
উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানকে আওয়ামী লীগই নষ্ট করে ফেলেছে। যেভাবে তার মূর্তি করে তার পূজা বাংলাদেশে শুরু করেছে, সেগুলো ফ্যাসিস্ট আইডিওলজির (আদর্শ) অংশ হয়ে গেছে। একটি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে সরকার, যে নতুন বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশে এই ফ্যাসিস্ট প্রবণতা রাখতে পারি না।’
সংবিধান দিবস বাতিলের বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, সংবিধান তো সেদিন (৪ নভেম্বর) থেকে কার্যকর হয়নি। যেদিন থেকে সংবিধান কার্যকর হয়েছে, সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। সেজন্য মনে হচ্ছে, ৪ নভেম্বরকে দিবস হিসেবে আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই।
তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, এতগুলো জাতীয় দিবস দরকার নেই বলে মনে করে সরকার। যেগুলো সিগনিফিকেন্ট (তাৎপর্যপূর্ণ) সেগুলোই রাখা হবে। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান কেন্দ্র করে নতুন দিবস আসতে পারে বলেও জানান তিনি।
