ইংরেজি ভাষার প্রতি তার আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। গুগল, ইউটিউব ও অ্যাপস থেকে ইংরেজি শেখার চেষ্টা করতেন। এক সময় ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলা ও লেখার দক্ষতা অর্জনের পর তার মনে হলো মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরও ইংরেজি শেখানো উচিত। এর ফাঁকে নিজে আবার ইংরেজিতে একটি ডিপ্লোমা কোর্সও সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশের আটটি মাদ্রাসায় প্রায় ৯ শতাধিক শিক্ষার্থীকে ইংরেজি ভাষার ওপর কোর্স করিয়েছেন তিনি এবং তার সঙ্গীরা। সফল এই ইংরেজি প্রশিক্ষকের নাম মোহাম্মাদ মুনিরুল ইসলাম বাবু। খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি উপজেলার মুসলিমপাড়া গ্রামে তার বাড়ি। পবিত্র কোরআন শরিফ হিফজ সম্পন্ন করার পর মুনির এখন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানাধীন জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর মাদ্রাসায় মেশকাত জামাতে অধ্যয়নরত আছেন।
‘মুনির হস্তলিপি একাডেমি’, ‘আল মুনির ইংলিশ একডেমি’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার তিনি। তার সঙ্গে ইংরেজি কোর্সের জন্য তিনজন এবং হস্তলিপি প্রশিক্ষণের জন্য ১৫ জন লোক কাজ করে। এরা সবাই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি তারা আয় করছেন এসব কোর্স করানোর মাধ্যমে। দশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতি কোর্সে আয় হয় তাদের।
ইংরেজি ভাষা শেখার গুরুত্বের শেষ নেই। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের। এ প্রসঙ্গে মুনির বলেন, আন্তর্জাতিক মহলে এই ভাষা শেখার গুরুত্ব আসলে অপরিসীম। বিশেষ করে যুগ চাহিদার মোকাবিলায় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য এটা আরও জরুরি ও কল্যাণকর।
ইংরেজি ভাষা তো অনেকেই শেখায়। মুনিরের এমন কী আছে, যার জন্য তার কাছে শিখতে শিক্ষার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে? এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাই যেহেতু আমাদের এই কোর্সের মূল প্রশিক্ষণার্থী, তাই তাদের প্রতি লক্ষ রেখে ইংরেজি ভাষাকে অত্যন্ত সহজভাবে শেখানোর জন্য আমরা আরবি ব্যাকরণের সঙ্গে সমন্বয় এবং সামঞ্জস্য বজায় রেখে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সর্বনিম্ন সাতদিন, সর্বোচ্চ দশ দিন এবং ক্ষেত্রবিশেষে পনেরো দিন পর্যন্ত সময় নিয়ে কোর্স সম্পন্ন করে থাকি। মুনিরের হাতের লেখা শেখার জগতে আসার ঘটনা বেশ চমকপ্রদ। মুনির হাতের লেখার এক কোর্সে এত ভালো ফলাফল করেন যে কর্তৃপক্ষ অত্র কোর্সে তাকে একজন প্রশিক্ষক হওয়ার প্রস্তাব দেয়। এভাবেই তিনি হস্তলিপি প্রশিক্ষণের সঙ্গে জড়িত হন। ত্রিশটি জেলার প্রায় পঁয়ত্রিশটি প্রতিষ্ঠানে শুধুমাত্র অফলাইনেই হাতের লেখার কোর্সে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন তিনি। যেখানে পাঁচ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে।
হাতের লেখা শেখানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে মুনির বলেন, মূলত প্রাথমিকভাবে হোয়াইট বোর্ডের মাধ্যমে ছাত্রদের লেখা বা বর্ণের মূলনীতিগুলো দেখিয়ে দেওয়া হয়। অতঃপর প্রতি শিক্ষার্থীর খাতার প্রথম লাইনে আমরা বর্ণ ও শব্দগুলো লিখে দিয়ে নিচের লাইনগুলোতে হুবহু লেখানোর অনুশীলন করাই। আমাদের হাতের লেখার কোর্সগুলো অধিকাংশই চারদিনব্যাপী হয়ে থাকে। তবে সর্বনিম্ন তিনদিন, সর্বোচ্চ সাতদিন এবং ক্ষেত্রবিশেষে দশদিনব্যাপীও হয়ে থাকে।
হাতের লেখা শেখানোর কোর্স সবার জন্য উন্মুক্ত। তবে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাই এই কোর্সগুলোতে বেশি অংশগ্রহণ করে বলে জানান তিনি। এক সময় ঢাকাতে অফলাইনে কোর্স পরিচালনা করলেও এখন তা বন্ধ আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধার কোর্সের জন্য যোগাযোগ করলে তখন গিয়ে শিখিয়ে আসেন মুনির ও তার দল। হোক সেটা ইংরেজি শেখা কিংবা হস্তলিপির কোর্স।
মুনিরের ইংরেজি শেখানোর কাজে মাদ্রাসা প্রধানরাও খুশি। আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম খিলগাঁও ঢাকার স্বনামধন্য মহাপরিচালক আল্লামা জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের এই একাডেমিকে কবুল করুন। তোমরা পড়ালেখা চলাকালে এই অল্প বয়সেই যে মহৎ পরিকল্পনা নিয়ে দেশব্যাপী অত্যন্ত সাফল্য ও সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছ, যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। ইংরেজি কোর্সটা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য যুগোপযোগী একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে তোমরা কওমি শিক্ষার্থীদের অনেক বড় একটা শূন্যতা পূরণে এগিয়ে এসেছ।’ জামিয়া আরাবিয়া নুরুল উলুম কুলিয়ারচর কিশোরগঞ্জের শিক্ষা সচিব মুফতি জয়নুল আবেদীন রংপুরীও তার সম্পর্কে এমন মন্তব্য করেছেন।
মুনির যাদের শেখান সেই শিক্ষার্থীদের ভালোবাসার একটুও কমতি নেই তার প্রতি। ২০২৩ সালে উত্তরার বায়তুস সালাম মাদ্রাসায় কোর্স শেষে বিদায় নেওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা দোতলা থেকে নিচতলা পর্যন্ত তাকে কোলে করে নামায়। এই দৃশ্যের কথা স্মরণ হলে এখনো মুনিরের চোখদ্বয় আনন্দাশ্রুতে ছলছল করে ওঠে। আবার কোর্স শেষে বিদায় বেলায় শিক্ষার্থীদের মলিন মুখ আর জল ছলছল চোখগুলোর প্রতি চেয়ে প্রতিবারই তাদের জন্য বিরহের বেদনা অনুভব করেন তিনি।
তবে আজকের এই অবস্থানে আসার নেপথ্যে বড় ভাই মুহাম্মাদ আফতাব ইসলাম, মেজ ভাই শরীফুল ইসলাম, মা-বাবা ও ওস্তাদদের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তার। পড়ালেখার পাট চুকিয়ে এমন একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তার যেখানে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরাই আরবি ও ইংরেজিতে অনর্গল কথোপকথনে সক্ষম হবে এবং তাদের সবার হাতের লেখা সুন্দর থাকবে।
