বিএমডব্লিউ গাড়িতে উসাইদের গ্রাফিতি

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৪, ০৮:৩৭ এএম

সাম্প্রতি ‘স্বাধীনতার সূর্যোদয়’ গ্রাফিতি নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা হয়েছে। আলোচিত এই গ্রাফিতির কারিগর উসাইদ মুহাম্মদ। তিনিই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে দুটি বিএমডব্লিউ গাড়িতে গ্রাফিতি করেছেন। তিনি আর্টফ্লো একাডেমির কর্ণধার। তার কাছে ক্যালিগ্রাফি ও গ্রাফিতি শিখেছে এক হাজারেরও বেশি আর্টিস্ট।

ছোট থেকেই আরবি হরফের প্রতি তার খুব টান। স্কুলের এক প্রতিযোগিতায় তিনি আঁকেন তিতুমীরের ছবি। তার বড়বোন ডিজাইন করে আরবি লিখে পুরস্কার পান। অতঃপর উসাইদ ভাবলেন, আরবি লিখলে বুঝি পুরস্কার পাওয়া যায়। এরপর বোনের কাছে আরবি লেখার হাতেখড়ি। মাদ্রাসার হিফজ সমাপনী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন রকম আঁকাআঁকি করে। উসাইদ আরবি লিখলে শিক্ষকসহ সবাই সেটার অনেক প্রশংসা করেন। এই প্রশংসা তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। ২০১৬ সালে মুফতি হামিদুল্লার কাছে প্রথম ক্যালিগ্রাফি কোর্স করেন। এরপর একে একে মোল্লা মো. হানিফ, মাহবুব মুর্শিদ ও আকরাম হোসেনের কাছে রঙ ও ফন্টের ব্যবহার শেখেন। পাশাপাশি অবসর সময়ে চর্চা তো ছিলই।

২০১৮ সাল থেকে পেশাগতভাবে গ্রাফিতি ও ক্যালিগ্রাফি করে আসছেন তিনি। ২০২১ সালে আল আহনাফ ক্যালিগ্রাফি একাডেমির সঙ্গে তার যাত্রা শুরু হয়। ২০২৩ সালে নিজে প্রতিষ্ঠা করেন আর্টফ্লো একাডেমি। তিনি বাংলাদেশের অনেকগুলো জেলায় গিয়ে ক্যালিগ্রাফির প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে অসংখ্য মানুষ ফোন কিংবা সরাসরি ক্যালিগ্রাফি ও গ্রাফিতি বিষয়ে তার থেকে সাহায্য নেয়। বিরক্ত না হয়ে হাসিমুখে তিনি সাহায্য করেন।

ঢাকার জামিয়া কোরআনিয়া লালবাগে দাওরায়ে হাদিস শেষ করে বর্তমানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন তিনি। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। বাবা হারুন অর রশীদ অটো মেকানিক্সের একটি ওয়ার্কশপ চালান। মা হালিমা বেগম গৃহিণী। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে উসাইদ মেজ। পরিবার নিয়ে বর্তমানে ঢাকার মোহাম্মদপুরে বসবাস করেন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে গ্রাফিতি করতে গেলে বাধা আসে। উসাইদ চাচ্ছিলেন, তার শিল্পসত্তাকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে। তিনি গ্রাফিতির বিষয়ে এমন চিন্তা করছিলেন যে, একটি জরাজীর্ণ অবস্থার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সূর্যোদয় হবে এবং পাশে থাকবে বাংলার চির সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি। এই ভাবনাকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৌর মার্কেট এলাকায় অবকাশের সামনে একটি প্লাস্টার খসে পড়া দেয়াল বেছে নেন তিনি। যেখানে রঙতুলির আঁচড়ে আঁকেন স্বাধীনতার সূর্যোদয় গ্রাফিতিটি। এই কাজে একটি হাত অপর হাতকে ধরে রেখেছে। যার অর্থ হলো, সংহিংসতা ও সংঘাত আর নয়। আমরা একতাবদ্ধ হয়ে একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসব। পৃথিবীর যে জায়গাতেই মজলুম আছে তার পক্ষে দাঁড়াব। গ্রাফিতিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ঐতিহ্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহাসিক বিষয়গুলো যেমন : জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসা, ব্যাপ্টিস্ট চার্চ ও তিতাস গ্যাসক্ষেত্রকে তুলে ধরা হয়েছে। এই অঙ্কনটিতে কোনো বৈষম্য রাখা হয়নি। যেকোনো ধর্ম বা গোত্রের লোকজন চিত্রটির সামনে এসে ছবি তুলতে পারবেন। ‘স্বাধীনতার সূর্যোদয়’ গ্রাফিতির বিষয়ে উসাইদ বলেন, ‘স্বাধীনতার সূর্যোদয় আমরা মাত্রই দেখতে পাচ্ছি। এখনো সূর্যের আলো আমাদের ওপর পুরোপুরি আসেনি। অঙ্কনে কিছুটা সূর্যোদয় করা হয়েছে, কিন্তু পুরো উদয় করা হয়নি। তাছাড়া অঙ্কনের ভেতর যে ভাঙা দেয়ালটি রয়েছে সেটি হচ্ছে, কিছুদিন আগে আমাদের ওপর যে জরাজীর্ণ ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়েছিল সেই জরাজীর্ণ অবস্থা থেকে সূর্য উদয় হচ্ছে, এই বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। তাছাড়া কিছুটা সুবজ-শ্যামল ঘনঘটা দেওয়া হয়েছে। এই গ্রাফিতি করতে আমাকে সাহায্য করেছে জুনায়েদ আহমেদ। সময় লেগেছিল প্রায় ১২ ঘণ্টা।’

উসাইদ বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বিএমডব্লিউ গাড়িতে গ্রাফিতি করেছেন। গাড়ির মালিক উসাইদের সাঙ্গে গ্রাফিতি করার জন্য যোগাযোগ করেন। তখন কীভাবে কোনটা করলে ভালো হয় সেটা তাকে বুঝিয়ে বলা হয়। গাড়িতে গ্রাফিতি সাময়িক ও স্থায়ী দুই রকম হতে পারে। যে যেটা করে। দুটি বিএমডব্লিউ গাড়িতে গ্রাফিতি সম্পন্ন করতে দুদিন লেগেছে। একটি গাড়ির মালিক কুমিল্লার অপরটির মালিক ঢাকার। এই দুটি কাজ দেখে এখন অনেকেই তাদের গাড়িতে গ্রাফিতি করার জন্য যোগাযোগ করছেন বলে জানান উসাইদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত