কার্তিকের নাভিমূলে বাংলার তিন কবি

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৪, ০৮:১৭ এএম

কবিকে বলা হয় ‘ত্রিকালদর্শী’। তিন কালকে যিনি একত্রিত করতে পারেন তিনিই কবি। নিজের সমগ্রকে, সময়কে, সমাজকে কবি যেমন ধারণ করেন, তেমনি প্রকাশও করেন। কল্পনায় ও কাব্যপ্রজ্ঞায় সত্যসলতেটাকেই উদ্ভাসিত রাখেন। সময়সত্যের ভেতরে বিচরণ করেও প্রত্যেক কবিই একটা কাব্যিক উত্তরাধিকারকে বহন করেন। সেই উত্তরাধিকারের ‘নাভিমূল’ থেকে বিকশিত হয় প্রত্যেকের কাব্যজগৎ, কল্পনা ও কবিভাষা। একই ভাষা ও সাংস্কৃতিক আশ্রমে বিচরণ করলেও সময়ের প্রতিবেশী হয়ে সাধক কবির চোখ থেকে নামে জারুলতলার মতো চিরসুন্দর ভাষা। এ সূত্র ধরে বলা যায় বাংলা কবিতার রোমান্টিকতার আশ্রমে বিচরণ করেও জীবনানন্দ দাশ-শামসুর রাহমান-মোহাম্মদ রফিক এক স্বতন্ত্র কাব্যভুবন নির্মাণ করেছেন।

দুই

জীবনানন্দকে জানার আগেই কুসুমকুমারী দাশকে চিনেছি। আরও পরে জেনেছি তার কবিতার ‘কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হওয়া’ আদর্শ ছেলেটি জীবনানন্দ দাশ। আমার মনে হয় পারিবারিক আজ্ঞার ভেতরেই বিকশিত হয়েছে জীবনানন্দের কবিতার নাভিমূল। মায়ের কাব্যনিষ্ঠা তাকে প্রাণিত করেছে। ‘সকল লোকের মধ্যে বসে’ ‘নিজের মুদ্রাদোষে’ আলাদা হওয়ার শিক্ষাটি তিনি শৈশবের পারিবারিক নির্জনতা থেকেই গ্রহণ করেছিলেন। নিজের জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়ের মধ্যেই সংগুপ্ত আছে তার প্রাত্যহিকতা ও কবিত্বের উৎস। ঘাসের ভেতরে ঘাস হয়ে জন্মানোর বাসনা এখান থেকেই পেয়েছেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা-রোমান্টিকতাকে পাঠ করেছেন কিন্তু লেখার জগতে নিজের সাধনা নিজের ভাষায় স্থাপন করেছেন। তিনি রবীন্দ্রবিরোধী এই বিজ্ঞাপন তার দরকার হয়নি। ঝরাপালকের প্রথম যুগেই তিনি স্পষ্ট করেছেন তার স্বর ও কাব্যমঞ্জুরি :

‘আমি কবি সেই কবি আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি! আনমনা আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙুল-মেঘের পানে! মৌন নীলের ইশারায় কোন্ কামনা জাগিছে প্রাণে! বুকের বাদল উথলি উঠিছে কোন্ কাজরীর গানে! দাদুরী-কাঁদানো শাঙন-দরিয়া হৃদয়ে উঠিছে দ্রবি!’ এই কাব্যে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের প্রভাব থাকলেও দ্রুতই তিনি ‘বিজন তারার সাঁঝে’ নিজের জগৎ স্পষ্ট করেছেন। সতীর্থদের সাহিত্যিক আড্ডা, হইচই থেকে দূরে বরিশালের ধানসিঁড়িটির তীরে খুঁজে নিয়েছিলেন ব্যক্তিত্বের ধীরতা। রবীন্দ্রনাথ যেমন বাংলাদেশের মাটিতে খুঁজে পেয়েছিলেন সোনার তরীর কাব্যভাষা, গান ও ছোটগল্পের জগৎ, তেমনি জীবনানন্দও বরিশালের সংকুচিত নদীমৃত্তিকায় হাঁটতে হাঁটতে দৃষ্টিক্ষেপে পৃথিবীতে কাব্যের আবাদ করেছেন। কবিতা থেকে কবিতায় তিনি মূলত সময় ও পৃথিবীর গভীরতর কথা বলার দিকে ঝুঁকেছেন। নাটোরের বনলতা সেনকে নিয়ে ইতিহাসের চলিষ্ণু রূপরেখা ধরে শ্রাবস্তী ও বিদিশার বিচূর্ণ জগতে বিচরণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও ব্রাহ্মপরিবারের সন্তান। সময়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রগতি ও ইতিহাস নির্ভরতায় দেখেছেন। কবির প্রতিবেশই তার কাব্য জগৎ।

‘মানুষ জীবনানন্দ’ গ্রন্থে কবি-পত্নী লাবণ্য দাশ লিখেছেন : ‘কবিতার খাতা ছিল কবির প্রাণ। যে সব খাতা তিনি কাউকে ছুঁতে দিতেন না। এমনকি তার টেবিলের কাছে গেলেও তিনি তটস্থ হয়ে উঠতেন। ...বরিশালের বগুড়া রোডে ৫/৬ বিঘা জমির উপর কবির ঠাকুরদাদা বাড়ী করেছিলেন। সেই জমির কোথায় কোন আনারসের রং হলুদ হয়েছে, গাছে ক’টা আম, ক’টা কাঁঠাল পেকেছে, কোন গাছটার জাম বেশী সুস্বাদু সবই ছিল তাঁর নখ-দর্পণে।’ জীবনানন্দ সারা জীবন কাব্যদৃষ্টির কাছে বিশ্বস্ত থাকতে চেয়েছেন। সত্য সুন্দরের আলো বাতাসের ভেতর দিয়ে আবহমান বাংলাকে তিনি অনুভব করেছেন। প্রকৃতি ও আশাবাদী তার কবিতা শক্তি। কবি বলেন :

ইতিহাস খুঁড়লেই রাশি রাশি দুঃখের খনি

ভেদ কোরে শোনা যায় শুশ্রুষার মত শত শত শত জলবার্ণার ধ্বনি। (হে হৃদয়, বেলা অবেলা কালবেলা)

তিন

বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন : ‘জীবনানন্দ পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত আগাগোড়া রোমান্টিক।’ কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মতো তিনি ‘জন্মরোমান্টিক’ নন। বাংলা রোমান্টিক কবিতার ঐতিহ্যে তিনি স্বতন্ত্র পথের নির্মাতা। অসহিষ্ণু-অস্থির যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে, সাম্রাজ্যবাদের নিষ্পেষণ ও বীভৎসতার বিপরীতে জীবনানন্দ দাশের কবিতা একটা শান্তির জগৎ তৈরি করে। কবিতার সুস্থির চেতনা ও জিজ্ঞাসায় মানুষ নিজেদের চিনতে পারে। অতি বাস্তবতার আলোতে আলোকিত হলেও কবি সময় ও ইতিহাসের বিকিরণায় কবিতায় নতুন ডাইমেনশন তৈরি করেছেন। প্রকৃতির দৃশ্যময়তাকে মানবিক আশা-নিরাশা ও সত্যের প্রতীক রূপে দেখেছেন। বাংলা কাব্যে ইতোপূর্বে অনুপস্থিত প্রকৃতি ও মানুষের রূপকল্পের উদ্বোধন জীবনানন্দ ঘটিয়েছেন। শুধু অন্ধকার, নিরাশা, ক্লান্তি, ধ্বংসের হাহাকার নয়, আশা ও স্নিগ্ধতায় উদ্ভাসিত হয়েছে জীবনানন্দের কবিতা।

চার

বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যেমন শেষ কথা নন, তেমনি জীবনানন্দ শেষ কথা হতে পারে না। বাংলা কবিতায় বিমূর্তধারার সংযোগের মাধ্যমে জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করেছেন। জীবনানন্দ যেখানে শেষ করেছেন সেখান থেকে শুরু করেছেন ঢাকার শামসুর রাহমান। কবিকে আমরা সত্যদ্রষ্টা বলি। কবিতার ভেতর দিয়ে একটা সমাজের হয়তো সামান্যই পরিবর্তিত হয় কিংবা হয় না। কিন্তু কবিতার ভেতরে সময় ও সমাজের বাস্তবতাটা প্রকাশিত হয়। সত্যটা উন্মোচিত হয়। সময় ও সমাজ পরিশুদ্ধকরণে কবিতা খুবই ইতিবাচকভাবে কাজ করে। সময়ের সূত্র ধরে এভাবেই প্রকাশিত হয় কাব্যের আধুনিকতা। জীবনানন্দ দাশের উত্তরাধিকারকে ধারণ করে শামসুর রাহমানও বাংলা কবিতায় নতুন যুগের সূচনা করেছেন। আধুনিক বাংলা কবিতায় ঢাকার কবিতা কিংবা বাংলাদেশের কবিতা বলে যে একটা আলাদা বিষয় আছে শামসুর রাহমান ভাষা, বিষয় ও কাব্য প্রকরণে এটাই উন্মোচিত করেছেন।

‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ কাব্যগ্রন্থে আমরা নিভৃতচারী, আত্মমগ্ন, স্বল্পবাক, স্বপ্নচারী, আড়ালিত এক কবিকে পাই। কল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে এই কাব্যগ্রন্থের সর্বাংশেই আছে জীবনানন্দের ছাপ। কিন্তু একজন বড় কবি নিজেকে আবিষ্কার করতে পারেন। নিজের জগৎকে নিজের ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন। নিজের ভাষা কী হবে সেটা বুঝতে পারেন। কাব্য চেতনায় শামসুর রাহমান বাংলাদেশের দর্পণটা দেখতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি স্বাধিকারের লড়াই শামসুর রাহমানের কবিতাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। কবি নিজেও স্বীকার করেছেন : ‘যখন প্রথম কবিতা লিখতে শুরু করি তখন চতুর্দিকে কড়া পাহারা বসিয়ে দিয়েছিলাম যাতে আমার কাব্যক্ষেত্রে রাজনীতির অনুপ্রবেশ না ঘটে।’ কিন্তু এই শামসুর রাহমান তার গুরু জীবনানন্দকে অতিক্রম করলেন। নিজের ভূমির দিকে তাকিয়ে ভূমির কবিতা লিখলেন। সময়ের দিকে তাকিয়ে সময়ের কবিতা লিখলেন। সময়ের ধ্বনিতে উদ্ভাসিত হয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের ভেতর দিয়ে উচ্চারিত হলো নতুন কবিতা।

কবি নিজেই বলেছেন : ‘আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে আমার কাব্যপ্রয়াস একটা নতুন বাঁক নেয় বলে মনে করি। যে-আমি ছিলাম পুরোপুরি বিবরবাসী অন্তর্জীবনে সমর্পিত, সে-আমি ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠলো বহির্জীবনের প্রতি মনোযোগী এবং রাজনীতি-মনস্ক। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগত না হয়েই আমি রাজনীতি থেকে, গণসংগ্রাম থেকে শোষণ করে নিলাম আমার কবিতার নানা উপাদান।’

দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্র করোটিতে’ থেকেই তার কাব্য ভাষায় পরিবর্তন এসেছে। ‘নিরালকে দিব্যরথে’ স্পষ্ট হয়েছে সেই পরিবর্তনের পথরেখা। বাংলাদেশের মানচিত্রের স্বপ্ন ও ইতিহাসের সচলতাকেই কাব্যভাষা দিয়েছেন কবি। ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’, ‘নিজ বাসভূমে’, ‘বন্দী শিবির থেকে’, ‘দুঃসময়ের মুখোমুখি’, ‘অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ এমন সময় নির্ভর কাব্য ভাষায় বাংলা কবিতাকে জীবন্ত করেছেন তিনি।

পাঁচ

শামসুর রাহমান শুধু একজন বড় কবি নন, একটা সমাজের কাব্যরুচি ও মূল্যবোধ গড়ে তোলার পেছনে তার অবদান অনেক। তিনি যে কাব্য সাধনা করেছেন সেই কবিতার শিল্পরূপে মানুষকে ফাঁকি দেননি। দেশ ও দেশের মানুষই তার কবিতার প্রধান অবলম্বন। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নাগরিকদের সামনে থেকে তিনি প্রতিবাদ করেছেন জীবনানন্দ দাশের মতোই লাজুক মানুষটি কাব্যে ও ব্যক্তিত্বে মানুষকে ভালোবেসে গেছেন।

ছয়

বাংলা কবিতায় মোহাম্মদ রফিকের আত্মপ্রকাশ ১৯৬০-এর দশকে। পাকিস্তান আমলে ছাত্র আন্দোলন এবং স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কাব্যিক রসদ জুগিয়ে তিনি বিখ্যাত হয়েছেন। বাংলা কবিতায় জীবনানন্দের উত্তরাধিকারকে ধারণ করে এক স্বতন্ত্র অভিযাত্রী। তিনি মনে করেন দেশের ভেতর থেকেই উঠে আসে দেশের কবিতা। কীর্তিনাশা, গাওদিয়া, কপিলা, স্বদেশী-নিঃশ্বাস তুমিময়, মেঘ এবং কাদায়, রূপকথার কিংবদন্তী, মৎস্যগন্ধা, বিষখালি সন্ধ্যা, নোনাঝাউ, দোমাটির মুখ মানুষ ও মানবিকতানির্ভর এক নতুন কবিকে পাই। বাংলার লোকায়ত কাহিনি কবিতার ধারায় শিকড় নিংড়ানো সাংস্কৃতিক বাংলাকেই খুঁজে পাই আমরা। এই কবিতাগুলো মাটি ও প্রকৃতিনির্ভর হলেও জীবনানন্দের ভাষা থেকে দূরবর্তী এ আয়োজন। কবি মোহাম্মদ রফিকের এই কবিতায় বিষাদ-বিষন্নতা কেটে যায়। মানুষ খোঁজেন মহাজীবনের পথ।

জীবনানন্দ মোহাম্মদ রফিকের প্রিয় কবি। ‘আমার জীবনানন্দ’ বইটি প্রকাশিত ২০১৬ সালে। গ্রন্থটি পড়লে জীবনানন্দের প্রতি তার ভালোবাসা, নিবেদন এবং জানা-বোঝার এক অকৃত্রিম জগৎ আবিষ্কৃত হয়।

কার্তিক ঋতুকে বাঙালি ভাবুক সম্প্রদায় খুব পছন্দ করেন। এই ঋতুতেই জীবনানন্দ দাশ বাংলার মাটিতে ঢেলে দিয়েছেন। ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ হাতে নিয়ে শামসুর রাহমানে এবং গাওদিয়া কপিলার হাতে হাত রেখে বাগেরহাটের মাটিতে এসেছেন। এরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের আত্মীয়। এরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের আশ্রমে বিচরণ করেছেন। শেষে কাব্যভাষার সৌরভে পূর্ণছাতিমের সঙ্গে ফুটে আছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত