দলে সিনিয়র-জুনিয়র বিভাজন উড়িয়ে দিলেন সাবিনা 

'এই মেয়েদের আপনারা সিনিয়র ডাকেন কেন? ওদের বয়স তো গড়ে ২২-২৩ বছর। এখনই তো ওদের পিক টাইম'

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৪, ১০:৫১ পিএম

'আচ্ছা বলেন তো, এই মেয়েদের আপনারা সিনিয়র ডাকেন কেন? ওদের বয়স তো গড়ে ২২-২৩ বছর। এখনই তো ওদের পিক টাইম। সিনিয়র বলা মানে তো বুড়িয়ে যাওয়া, বিদায়ের কথা ভাবা। এই বয়সেই কী ওদের বিদায় নেওয়ার কথা ভাবতে বলবেন?'
ফোনের ওপাশে সাবিনা খাতুনকে খানিকটা বিক্ষুদ্ধ শোনালো। দলের ভেতর যে সিনিয়র-জুনিয়র বিভাজনের কথা প্রকাশ্যে এসেছে, তা ফুতকারে উড়িয়ে দিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক, 'দলের ভেতরে যে কোন সমস্যা নেই, ভাগ নেই, সেটা কী ভারত ম্যাচে প্রমাণ হয়নি? আপনাকে সত্যিটা বলি, আমাদের মধ্যে কোন সমস্যা নেই। সমস্যা যা করার, তা...' এরপর এ প্রসঙ্গে আর কথা এগুতে চাইলেন না। বরং গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সাফের সেমিফাইনালে ওঠা এবং পরের দুই ম্যাচেই সব মনযোগ দেওয়ার কথা বললেন দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ সদস্যটি।

দলের ভেতরে যে কোন সমস্যা নেই, ভাগ নেই, সেটা কী ভারত ম্যাচে প্রমাণ হয়নি?

দলের ভেতরে গত কয়েক মাসে কী কী হয়েছে। তার এখন মোটামুটি জানা সবারই। গোলাম রব্বানী ছোটন যুগের সমাপ্তির পর থেকে নারী দলের কোচ নিয়ে হয়েছে নানা নাটক। কিছুদিন সাইফুল বারী টিটু দায়িত্বে ছিলেন। এরপরই এলিট অ্যাকাডেমির ব্রিটিশ কোচ পিটার জেমস বাটলারকে দেওয়া হয় সাবিনাদের দায়িত্ব। এই কোচ দায়িত্ব নিয়েই তড়িঘড়ি আনতে চাইলেন পরিবর্তন। সেটা তিনি করতে চাইলেন অভিজ্ঞদের পাশ কাটিয়ে, তারুণ্যে ভরসা রেখে। ভবিষ্যত চিন্তায় সেটা কোচ করতেই পারেন। তবে তিনি ভুলে গেলেন যাদের সিনিয়র তকমা দেওয়া হয়েছে, তাদের বয়সও কিন্তু ২২-২৩-এর গন্ডিতে। অর্থাৎ একজন ফুটবলারের সেরাটা দেওয়ার সঠিক সময়ে সিনিয়র তকমায় নিঃশেষ করে দেওয়া হচ্ছে আত্মবিশ্বাস। আর এখানেই যত আপত্তি অভিজ্ঞদের। এ নিয়ে কোচের সঙ্গে সাফের আগেই একাধিকবার ফুটবলারদের কথা কাটাকাটি হয়েছে। নেপালে গিয়েও হয়েছে এবং হচ্ছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে গ্রুপের প্রথম ম্যাচে কোচ তার ইচ্ছেমত একাদশ সাজিয়েছেন, পরিবর্তন করিয়েছেন। ফলাফল ১-১ ড্র। সেই ম্যাচের পর মনিকা চাকমা মিডিয়ায় কোচের এমন আচরণেই সমালোচনা করে গরম তেলে ঘি ঢেলে দেন। তার দেখাদেখি বাকী সিনিয়রদের কেউ কেউ কথা বলেন একই সুরে। কোচও পাল্টা নানা অভিযোগ আনতে থাকেন সিনিয়রদের ওপর। তারা খেলার চেয়ে টিকটকে বেশি ব্যস্ত। জুনিয়রদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। সিন্ডিকেট করে খেলতে চায়- এমন সব কথা আসতে থাকে। যা তাতিয়ে দেয় পুরো দলকে। কোচকে বুঝিয়ে ভারতের বিপক্ষে একাদশ হয় অভিজ্ঞদের নিয়ে। আর পাঁচবারের সাফজয়ীদের মাঠে চরম শিক্ষা দেয় বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। ৩-১ গোলে জিতে গ্রুপ সেরা হয়। তাতে বাটলারকেও ভুল প্রমাণিত করার কাজটা করে ফেলে দল। 

অসাধারণ এক ম্যাচের পরের দিনটা তাই মেয়েদের কেটেছে ভীষণ ফুরফুরে। সাবিনা ফোনে দলের অবস্থা ব্যাখ্যা করলেন এভাবে, 'দলে প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের দারুণ সম্পর্ক। দীর্ঘদিন আমরা একসঙ্গে আছি। অভিজ্ঞদের সঙ্গে তরুণদের সম্পর্ক আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না। আমরা ওদের দারুণভাবে আগলে রাখি প্রতিটা সময়। যে কোন দাবী দাওয়ায় আমরাই ওদের হয়ে কথা বলি। ছুটিতে বাড়ি গেলে তথাকথিত সিনিয়ররা জুনিয়রদের জন্য খাবার রান্না করে নিয়ে আসি।'

টিকটক নিয়ে কোচের আপত্তির একটা জবাব অবশ্য কাল সকালেই নিজের ভেরিফায়ের ফেসবুকে দিয়েছিলেন সাবিনা। লিখেছিলেন, "আমি চাই তোরা রোজ টিকটক কর আর এমন পারফর্ম কর। অনেক অনেক ভালোবাসা তোদের জন্য।" পরে অবশ্য বিতর্কটা বাড়তে না দিতে এই পোস্ট মুছে ফেলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। এ নিয়েও একটা যুক্তি দিয়েছেন সাবিনা, 'দেখুন আমাদের প্রতিদিনের রুটিনটা ভীষণ আঁটসাটো। ভোরে উঠে নামাজ-কালাম পড়ে আমরা মাঠে যাই। নাস্তা করে একটু বিশ্রাম নিয়ে লাঞ্চ করে যাই জিম সেশনে। দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে যায়। এরপর কিছুটা সময় নিজেদের জন্য পাই। এখন কিছু মেয়ে যদি এই সময়টায় সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটায় তবে দোষের কী। ওরা তো নিজেদের দায়িত্বটা শেষ করেই করছে। আর এটা তো ওদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাছাড়া বিশ্বের অনেক বড় বড় তারকাকে দেখেছি টিকটক করতে। আমরা করলেই দোষ।' 

খেলা চলাবস্থায় কোচের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাওয়া দলীয় শৃঙ্ক্ষলা পরিপন্থি মানছেন তিনি। তবে এতটুকু না করলে যে, ভারতকে ছাড়খাড় করা যেতো না। তাই সাবিনা ফোন রাখার আগে মনে করিয়ে দিলেন একটি ডিটারজেন্টের বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল, 'দাগ থেকে যদি দারুণ কিছু হয়, তবে দাগই ভালো।'    

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত