নানা বিপদের মধ্যে আপদ ভর করার মতো চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। প্রতিদিনই ডেঙ্গু কারও না কারও প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। আক্রান্ত রোগীতে ঠাসা হাসপাতালগুলো। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একদিকে নানা সেক্টরের দাবি-দাওয়া, বায়নার উৎপীড়ন। সরকারকে ডিস্টার্ব করার নানা আয়োজন। রাজনৈতিক যন্ত্রণা ও মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের পাশাপাশি প্রাকৃতিক মুসিবত। বন্যার উপদ্রব চট্টগ্রাম-ফেনীসহ আশপাশের কয়েক জেলায়। তা সামলাতে বেশ বেগ পেতে হয় সরকারকে। এরপর ঘূর্ণিঝড় দানা/দানা হানা দেওয়ার আভাস। উপকূলীয় কয়েকটি জেলায় যৎসামান্য আঘাতের মধ্য দিয়ে তা চলে যায়। এ সবের মধ্যে ডেঙ্গুর হানা চলছে অবিরাম।
স্বাস্থ্য বিভাগ তা রোখার চেষ্টা করছে। যা করার তার প্রায় পুরোটা করতে হচ্ছে সরকার ও প্রশাসনকে। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা মাঠে নেই। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়রদের অপসারণ করা হয়। এর ছয় সপ্তাহের মাথায় সরিয়ে দেওয়া হয় কাউন্সিলরদেরও। আগস্টের শুরুতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে ও দপ্তরে অনুপস্থিত থাকায় ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র, ৩৩০ জন পৌর মেয়র ও প্রশাসক ও প্রায় সব জেলা-উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৮০ শতাংশ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৭৫ শতাংশ কাউন্সিলর এখনো অনুপস্থিত। ফলে মশক নিধন অভিযানের ওপর নজরদারি করার কেউ নেই। তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসক নিয়োগ করেছে। নাগরিক সেবা সচল রাখতে ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছে সরকার, যেখানে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা রয়েছেন। তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনগুলো বলতে গেলে অকার্যকর। ডেঙ্গুবাহী মশাদের জন্য তা যেন সুযোগ। ফাঁকা মাঠে অ্যাকশনের মতো মওকা। ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা নিধনে কার্যকর উদ্যোগ কার্যকর হতে না পারার এটি একটি বড় কারণ। দিনে দিনে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এখন যে পর্যায়ে চলে গেছে তা রোখা কঠিন।
মশক নিধন ছাড়াও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশান সনদ, নাগরিক সনদ, পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি, সামাজিক শৃঙ্খলা, রাস্তাঘাট মেরামত এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে যেকোনো সমস্যায় পড়লে নাগরিকরা ছুটে যেতেন কাউন্সিলরদের কাছে। এমনকি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অনুপস্থিতিতে অনেক কাউন্সিলর সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করেছেন। তারা সময়টাকে জনসম্পৃক্ততার একটা সুযোগ হিসেবে নিলেও মানুষ তাদের কাছে পেতে শুরু করে। কিছু উপকারও মিলতে থাকে। সরকারি কর্মকর্তারা স্থানীয় সরকারের সার্ভিস দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা অকুলান। তা আসলে সম্ভবও নয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে কখনো জনপ্রতিনিধির বিকল্প হতে পারেন না তা এসব ঘটনায় আবারও প্রমাণিত। বলার অপেক্ষা রাখে না, দুর্নীতিবাজ বা দুষ্টশ্রেণির হলেও জনপ্রতিনিধির মূল ভিত্তিই হলো জনগণ। তাদের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কটা একদম সরাসরি। এখন সেখানে এক শূন্যতা। শুধু ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণেই নয়, জনপ্রতিনিধি না থাকায় সিটি করপোরেশনগুলোতে দেখা দেওয়া হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতি কাটানোর বিকল্প ব্যবস্থা জরুরি। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তাঘাটে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকছে। কোথাও ঠিকমতো মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নাগরিক সনদসহ অন্য সেবা দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে ২০টি জোনে ২০ জন কর্মকর্তার এ দায়িত্ব পালন করার কথা। এক ঢাকার দুই সিটিতে ওয়ার্ড ১২৯টি। একেকটি জোনে দশ-বারো জন কাউন্সিলরের কাজ একজন নির্বাহী কর্মকর্তাকে দিয়ে করানো অসম্ভব।
এবার এমনিতেই পিকটাইমে মশা মারার ওষুধ ছিটানো হয়নি। প্রথমে আন্দোলনের কারণে, পরে সিটি করপোরেশনের মেয়র-কাউন্সিলরদের বাদ দেওয়ার কারণে। এছাড়া, দেশের স্বাস্থ্যনীতি ক্রমেই অভিমুখ পাল্টেছে। এখন তা চিকিৎসাকেন্দ্রিক। জনস্বাস্থ্য সেখানে উপেক্ষিত। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার কিংবা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের ভূমিকা মোটেও আশাপ্রদ নয়। ডেঙ্গু ভাইরাস থেকে মূলত দুই ধরনের সংক্রমণ হয় সাধারণ ডেঙ্গু জ্বর ও মারণাত্মক ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু সিনড্রোম শক। যদিও চটজলদি রোগ নির্ণয় এবং হাসপাতালে আপৎকালীন শুশ্রুষার মাধ্যমে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো যাচ্ছে, তবু মৃত্যু ঘটছে। এ পর্যন্ত এই ধরনের জ্বরের সঠিক চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি। মানবদেহে ডেঙ্গুর সংক্রমণ পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল। মশাকে প্রতিষেধক দিয়ে প্রি-প্রোগ্রামও করা যায় না বা ওষুধ দিয়ে রি-ফিক্সও করা যায় না। ডেঙ্গুকে জনস্বাস্থ্যের প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে, যার ব্যাপ্তি চিকিৎসাশাস্ত্র থেকে বহুগুণ বেশি। জনস্বাস্থ্যের পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে, ডেঙ্গুর অন্যতম কারণ হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ। মশক নিধনে ক্রমাগত ব্যর্থতা, ক্রমবর্ধমান বিশ্বায়ন।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতাও ডেঙ্গু বিস্তারে ভূমিকা পালন করছে। নগরায়ণের নীতি ও রূপরেখায় এবং নগর পরিচালনায় জনস্বাস্থ্যের দিকটি আমাদের দেশে অত্যন্ত অবহেলিত। যেকোনো মশাবাহিত রোগের উৎপত্তি সাধারণত শহরকেন্দ্রিক, কারণ শহরের জনবহুল, ঘিঞ্জি, অপরিষ্কার পরিবেশ মশা জন্মানো ও দ্রুত রোগ সংক্রমণের জন্য আদর্শ। ডেঙ্গু রোধেও তাই জনস্বাস্থ্যমুখী নগর-পরিকল্পনা ও পরিচালনা পদ্ধতি থাকা চাই। সেখানে বড় রকমের ব্যত্যয়। আমাদের পদ্ধতিতেই গোলমাল। এলাকা বা মহল্লাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা, বাসার ছাদ, বাড়ির আশপাশ, দুই বাড়ির সীমানায় নোংরা জায়গাগুলো পরিষ্কার করার কোনো কার্যক্রম নেই। অথচ উল্লিখিত সব স্থান, সেপটিক ট্যাংক, ঢাকা জলাধার বা নর্দমার মশার বংশনাশ ও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন না হলে ডেঙ্গুর মৃত্যুমিছিল আটকানো অসম্ভব।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ডেঙ্গু মশা সাধারণত পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে, যা খুব সহজেই শহরের বিভিন্ন স্থানে জমা হওয়া বৃষ্টির পানি বা বাড়ির আশপাশের অযত্নে পড়ে থাকা পাত্রে জমে থাকা পানিতে হতে পারে। এডিস মশা দিনের বেলায় কামড়ায় এ ধারণা পালটে গেছে। দেখা যাচ্ছে, এডিস মশা এখন দিনরাত যেকোনো সময়ই মানুষকে কামড়ায়। এজন্য জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা ও সুরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। শহরাঞ্চলের অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও যথেষ্ট নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব ডেঙ্গুর বিস্তারকে আরও জটিল করে তুলছে। জলাবদ্ধতা যেখানে মশার বংশবিস্তার ঘটে, তা নিয়ন্ত্রণে নেই। তাছাড়া সময়মতো মশা নিধন কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত না হওয়ায় এবং ডেঙ্গু সম্পর্কে সচেতনতার অভাব থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৩১৪ জন। মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৬৪ হাজার ৪৭১ জন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শিগগির ডেঙ্গুর মারাত্মক প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার পাশাপাশি বাংলাদেশেও ডেঙ্গু একটি মারাত্মক রোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২০০০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ২০১৯ সালে এই রোগের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মৃত্যুও ঘটে এ বছর। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে দেখা গেছে। আক্রান্ত দেশগুলোতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি নজরদারি। বড় শহরগুলোতেও যা দেখা যাচ্ছে না। রোগতত্ত্ব অনুযায়ী, কেস ফ্যাটালিটি রেট হলো এমন মানুষের অনুপাত, যারা একটি নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত এতে মারা গেছেন। গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এবার মধ্য আগস্ট থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী অবিরাম বাড়ছে। দেরিতে হাসপাতালে আসায় ঝুঁকি বাড়ছে। বিগত কয়েক বছরের নমুনায় প্রতি বছর জুলাই-আগস্ট মাসটা ডেঙ্গুর বিস্তারের মৌসুম। এ সময় সাধারণত প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং কখনো কখনো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যাও দেখা দেয়। দেশের বিভিন্ন আনাচে-কানাচে অলিতে গলিতে পানি জমে থাকে এ সময়। সেই পানিতে জন্ম নেয় এডিস মশার লার্ভা। উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে এডিস মশককুল ব্যাপকভাবে বংশবৃদ্ধি করে। তাদের কামড়ে একজনের কাছ থেকে আরেকজনের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু জ্বর। জ্বরের তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করে। কখনো কখনো এই ডেঙ্গুর ব্যাপকতা এমনই ছড়িয়ে পড়ে যে দেশের হাসপাতাালগুলোতে রোগী ভর্তি করার মতো সিটও খুঁজে পাওয়া যায় না। এ সময়টাতেই এবার একদিকে গণআন্দোলনের তোড়। সরকার পতন। এরপর সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের বরখাস্তকরণ। তাদের বাদ দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত মশা নিধনের কার্যক্রম পরিচালনা এবং জনগণকে ডেঙ্গু প্রতিরোধের পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা চললেও তা গতিময় নয়। পরিস্থিতি ও সময়ের ফেরে স্বাস্থ্য খাতেও চলছে বিভিন্ন অস্থিরতা। এরপরও ডেঙ্গু প্রতিরোধকে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভায় নিয়োগ দেওয়া প্রশাসকদের অগ্রাধিকারভিত্তিক কাজের নির্দেশনা দিলে কিছু ফল আসতেও পারে। এ ছাড়া আপাতত বিকল্প মিলছে না।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
