ভূপেন হাজারিকা। একাধারে একজন কবি, সঙ্গীত রচয়িতা, গায়ক, অভিনেতা, লেখক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি বিশ শতকের বিখ্যাত শিল্পীদের একজন, যার মায়াবী কণ্ঠে ফুটে উঠত গণমানুষের কথা। হাজারিকা তার গানের মাধ্যমে আসামের সমৃদ্ধ লোক ঐতিহ্যকে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ভারতের সঙ্গীত জগতের এ মুকুটহীন রাজার মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১১ সালের এ দিনে ভারতের মুম্বাইয়ে মারা যান তিনি।
জন্ম
উত্তরপূর্ব ভারতের রাজ্য আসামে ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দম্পতি নীলাকান্ত এবং শান্তিপ্রিয়া হাজারিকার ঘরে জন্ম ভূপেন হাজারিকার। ১০ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূপেন তার গানের দক্ষতা উত্তরাধিকার সূত্রে মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। যিনি তাকে লোক সংগীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
১২ বছর বয়সে অসমীয়া ভাষার ছবি ‘ইন্দ্রমালতী’র জন্য গান গেয়ে সংগীত জীবনের শুরু ভূপেন হাজারিকার। ১৩ বছর বয়সে লেখেন প্রথম গান। শৈশবেই তিনি গীতিকার আনন্দীরাম দাস, পার্বতী প্রসাদ বড়ুয়া ও কমলানন্দ ভট্টাচার্যের মাধ্যমে স্থানীয় বরগীত, গোয়ালপাড়ার গান, চা মজদুরের গান, বিহুগীতসহ গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি প্রভাবিত হন। পরে প্রখ্যাত অসমীয়া গীতিকার জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা এবং শিল্পী বিষ্ণু প্রসাদ রাভার হাত ধরেই সংগীতে পথচলা শুরু হয় ভূপেন হাজারিকার। গুয়াহাটি, ধুবরি এবং তেজপুরের উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষালাভের পর, হাজারিকা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। যেখান থেকে তিনি ১৯৪৪ সালে বিএ এবং ১৯৪৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে ১৯৫২ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন ভূপেন হাজারিকা।
সংগীতজীবন
নিউ ইয়র্কেই থাকাকালীন বিশিষ্ট নাগরিক অধিকার কর্মী পল রবসনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় হাজারিকার, যিনি তাকে বিখ্যাত গান ‘বিস্তীর্ণ দুপারের’ রচনায় প্রভাবিত করেছিলেন। হাজারিকার মহাকাব্যিক রচনাগুলোর একটি এ গান বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। গানটি মূলত রবসনের ‘ওল ম্যান রিভার, হি ডোন্ট সে নাথিং’-এর ওপর ভিত্তি করে রচিত। এটি ছাড়াও রবসনের অনেক বিখ্যাত গান ভারতীয় ভাষায় রূপান্তর করেছেন ভূপেন হাজারিকা। সংগীত জীবনে পল রবসনের ভূমিকা নিয়ে ভূপেন হাজারিকা বলেন, ‘রবসন আমার সংগীত জীবনকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছেন। সচেতনতা তৈরিতে গানকে ব্যবহার করা যায় জানলেও সমাজ পরিবর্তনেও যে ভূমিকা রাখে তা প্রথম অনুধাবন করেছি রবসনের কাছ থেকে।’
অবদান
আমেরিকা থেকে ফিরে ভূপেন হাজারিকা গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিয়োজিত হন। তবে কয়েক বছর পর চাকরি ছেড়ে চলে যান কলকাতায়। সেখানে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে নির্মাণ করেন পুরস্কারপ্রাপ্ত অসমীয়া চলচ্চিত্র শকুন্তলা সুর (১৯৬১) ও প্রতিধ্বনি (১৯৬৪)। তার উল্লেখযোগ্য পরিচালনার মধ্যে রয়েছে লতি-ঘাটি (১৯৬৬), দ্য সান শাইনস (১৯৭৪) ও মেরা ধরম মেরি মা (১৯৭৬)। এ ছাড়া সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭)-সহ অনেক অসমীয়া ও বাংলা সিনেমার জন্য সংগীত রচনা করেছেন। রুদালীর জন্য ১৯৯৩ সালে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান। এ ছাড়া তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সংগীত নাটক একাডেমির চেয়ারম্যান ছিলেন।
ভূপেন হাজারিকার মানবতা ও বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের কথা বলে। তার গানে সবসময়ই গুরুত্ব পেয়েছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। প্রথমে অসমীয়া, পরে যখন কলকাতায় এলেন বাংলা গানেও তা ফুটে উঠেছে। আসামে হাজারিকা যতটা জনপ্রিয়, ততটাই তার গানকে ভালোবাসতেন বাংলাভাষীরাও। তাই বাংলা ভাষাভাষীদের একের পর এক অসাধারণ গান উপহার দিয়েছেন তিনি।
ভূপেন হাজারিকা শুধু সমাজ পরিবর্তনের গান গেয়ে থেমে থাকেননি। তার মধ্যে ছিল প্রবল বাঙালি জাতীয়তাবোধ ও রাজনৈতিক সচেতনতা। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি গেয়েছিলেন ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’। এই গান থেকে উপার্জিত অর্থ তিনি ব্যয় করেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে। হাজারিকা বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, ‘অস্ত্র দিয়ে তো কিছু করতে পারি না। তাই মেঘালয়, শিলং, সুনামগঞ্জের বর্ডারে গান গেয়ে টাকা তুলেছি।’
ভূপেন হাজারিকার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে ‘মানুষ মানুষের জন্যে’, ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি’, ‘আমি এক যাযাবর’, ‘গঙ্গা আমার মা’, ‘প্রতিধ্বনি শুনি’, ‘বিস্তীর্ণ দুপারে’, ‘সাগর সঙ্গমে’, ‘হে দোলা হে দোলা’, ‘চোখ ছলছল করে’ অন্যতম। ২০০৬ সালে তার ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানটি বিবিসি বাংলার শ্রোতা জরিপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিশ বাংলা গানের তালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করে।
পুরস্কার
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ ১৯৭৯ সালে অল ইন্ডিয়া ক্রিটিক অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার, ১৯৮৭ সালে আসামের শঙ্করদেব পুরস্কার, ১৯৯২ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, ১৯৯৩ সালে পদ্মভূষণ, ২০০১ সালে আসামরতœ, ২০০৯ সালে সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা।
প্রথম ভারতীয় হিসেবে জাপানে এশিয়া প্যাসিফিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের পুরস্কারও অর্জন করেন তিনি। ২০১১ সালের ৫ নভেম্বর মুম্বাইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ মায়াবী কণ্ঠের এ জাদুকর। বর্ণাঢ্য জীবনের স্বীকৃতস্বরূপ গুণী এই মানুষটিকে ২০১৯ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘ভারতরত্ন’ (মরণোত্তর) পদকে সম্মানিত করা হয়।
