শৃঙ্খল মুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণ

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৪, ০২:৪৪ এএম

কখনো কখনো বহমান সময় ব্যক্তিকে নির্মাণ করে, আবার কখনো ব্যক্তিই তৈরি করে ইতিহাস। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তম যেমন সময়ের নির্মাণ, তেমনি শহীদ জিয়া নিজেই তৈরি করে গেছেন ইতিহাস। আজকের বাংলাদেশ সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা, যেখানে সময়ের সঙ্গে গড়ে উঠেছে ব্যক্তির এক অনস্বীকার্য মিথোজীবিতা।

সেনাবাহিনীর একজন মেজর যখন দ্ব্যর্থহীনভাবে নিঃশঙ্কচিত্তে নিজের এবং পরিবারের জীবনকে বিপদাপন্ন করে ঘোষণা করেন, ‘উই রিভোল্ট’ তখন ব্যক্তি হয়ে ওঠেন কালোত্তীর্ণ। যখন একজন দেশপ্রেমিকের কণ্ঠ থেকে স্বাধীনতার বার্তা শোন যায়, তা জনগণের মধ্যে ভিন্নমাত্রায় সাহস আর আস্থা জাগিয়ে প্রত্যয়ী করে তোলে। আর তখন স্বাধীনতার সংগ্রাম ও সেই ব্যক্তি হয়ে ওঠেন একে অপরের পরিপূরক। কালের স্রোতে, সময়ের প্রবহমানতায় যিনি তার সত্তাকে বিলীন করে দেন জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর স্বার্থে, তখন তিনি হয়ে ওঠেন জাতিসত্তার এক মূর্ত প্রতীক। জাতির সেই আরাধ্য অবয়বের নাম ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান’।

মেজর জিয়াকে আমাদের আরও পাঠের অবকাশ রয়ে গিয়েছে। কারণ, তাকে নিয়ে সম্পূর্ণ পাঠ এখনো হয়ে ওঠেনি কিংবা বলা যায় প্রচারবিমুখ বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াকে পাঠোদ্ধার যেমন দুরূহ, তেমনি অনতিক্রম্য তার ভাবনার পরিধি। তবুও যেটুকু পরম্পরায় আমরা যতটা জানতে পারি- আমরা এমন একজন সামরিক কর্মকর্তাকে দেখি, যিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থেকেও ক্রমশ হয়ে উঠেছিলেন জাতীয়তাবাদের বিশ্বস্ত ধারক এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন ক্রমে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা ও বাহক।

১৯৭২ সালের এপ্রিলে জেনারেল এমএজি ওসমানীর পদত্যাগের পর সেনাবাহিনীর প্রচলিত মান ও প্রথা ভেঙে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সৎ, ন্যায়পরায়ণ, বিচক্ষণ, সামরিক নেতৃত্বের সব গুণাবলিতে মহিমান্বিত, প্রশ্নাতীত দেশপ্রেমিক তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার জিয়াউর রহমানকে বঞ্চিত করে ব্রিগেডিয়ার কেএম শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান মনোনীত করা হয়। এর মাধ্যমে আসলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক সশস্ত্র বাহিনীতে রাজনীতিকরণের প্রথা চালু করা হয়। সেই বেদনা জারিত করে শত-সহস্র সৈনিক ও অফিসারের হৃদয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক নেতা থেকে ক্রমে হয়ে উঠতে থাকেন কর্তৃত্বপরায়ণ স্বৈরশাসকের মতো; এর বিপরীতে জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনা কর্মকর্তা হতে উত্তীর্ণ হতে থাকেন এক মহান নেতায়। যেন বহমান সময় এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে জায়গা করে দিতে উন্মুখ হয়ে ওঠে।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না বরং এটি ছিল ঘটনার পরম্পরা ও পরিণতি। হত্যাকা- সমর্থনযোগ্য না হলেও ওই সময়ে অনিবার্যভাবে ঘটনাটি সংঘটিত হয় যার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের ওপর চেপে বসতে থাকা অমানিশা কেটে নতুন সম্ভাবনার উন্মেষ ঘটে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর ঘটনার পর ভারতীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যে প্রতিবিপ্লবের সূচনা হয়, তার ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ কারান্তরীণ হন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। এই ঘটনায় শুধু জিয়াউর রহমান কারান্তরীণ হননি, শৃঙ্খলিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব।

৩ থেকে ৭ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বাঁকবদলের উপাখ্যান। কেননা ৩ নভেম্বর যেমন ছিল স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হরণের দিন, তেমনি ৭ নভেম্বর ছিল শৃঙ্খল মুক্তির এক মাহেন্দ্রক্ষণ। এই মহান দিনে আধুনিক ও জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশের প্রবক্তা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তির ভেতর দিয়ে মুক্ত হয় বাংলাদেশ। আর এই মুক্তির নেপথ্য কারিগর ছিল বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের অন্তর্গত স্পৃহা ও বীর সেনানীদের অভূতপূর্ব মিথস্ক্রিয়া। যার দরুন ৭ নভেম্বর ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেদীপ্যমান হয়ে আছে সিপাহি-জনতার বিপ্লব নামে।

সূচনাতেই বলেছি, ইতিহাস হলো এক পরম্পরা। সেই ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বর যুগস্রষ্টা জিয়াউর রহমানের শুরু করে যাওয়া কর্মযজ্ঞের পরম্পরা হলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। যদিও এই পরম্পরায় যতি চিহ্ন ছিলেন জেনারেল এরশাদ, আর ওই সময় তার সেমিকোলন ছিলেন সম্প্রতি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত ‘স্বৈরাচারী’ শেখ হাসিনা। তবুও গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রবল সংঘবদ্ধ প্রয়াস ১৯৯১ সালে ম্যান্ডেট দেয় আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। বেগম খালেদা জিয়া দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে নিয়ে যান ৭ নভেম্বরের স্পৃহার এক জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশ।

সময়ের প্রবহমানতায় পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, কুশিয়ার প্রবাহ করেছে বাঁকবদল। বাংলাদেশের রাজনীতি ঘোর অমানিশায় আবর্তিত হয়েছে ১/১১-এর ভেতর দিয়ে। তবুও গণতন্ত্রকামী মানুষের আকাক্সক্ষা নির্বাপিত হয়নি কখনো। কারান্তরীণ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্তির মশাল তুলে দিয়েছেন তার সুযোগ্য উত্তরসূরি সেনা সন্তান তারেক রহমানের কাছে। একদা নির্যাতিত ও কারান্তরীণ পরবর্তী সময় নির্বাসিত তারেক রহমান নিজেকে উৎসর্গ করেছেন জনগণ, দেশ ও গণতন্ত্রের মুক্তির কাণ্ডারি হয়ে।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে গত ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন স্বৈরাচারী হাসিনা। কিন্তু তারেক রহমানের যাত্রা চলমান। বন্ধুর পথে তিমির রাত্রিতে যে যাত্রা তিনি চলমান রেখেছেন, সেই যাত্রার কোনো যতিচিহ্ন নেই। ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার যে বিপ্লবী স্পৃহা ধারণ করেছিলেন তার প্রয়াত পিতা, যা লালন করেছেন তার বর্ষীয়ান মাতা, সেই অদম্য স্পৃহা লেলিহান অগ্নিশিখা হয়ে দেদীপ্যমানে দীপ্তি ছড়াচ্ছে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এক বাংলাদেশে। যে বাংলা দুর্ভেদ্য, অজেয় ও অদৃষ্টপূর্ব।

লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত